|

Advertise with us

ব্যাংকে টাকা রেখেও লাভ নেই, মূল্যস্ফীতি খেয়ে ফেলছে আমানতকারীর মুনাফা

ডেস্ক রিপোর্ট   |   শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬   |   প্রিন্ট   |   ১৫ বার পঠিত   |   পড়ুন মিনিটে

ব্যাংকে টাকা রেখেও লাভ নেই, মূল্যস্ফীতি খেয়ে ফেলছে আমানতকারীর মুনাফা

ব্যাংকে টাকা রেখে যে সুদ মিলছে, তাতে মূল্যস্ফীতির চাপ সামলানোই কঠিন হয়ে পড়েছে আমানতকারীদের। নিত্যপণ্যের দাম ও জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়তে থাকলেও দেশের কয়েকটি শীর্ষ বাণিজ্যিক ব্যাংক এক বছর মেয়াদি স্থায়ী আমানতের সুদের হার কমিয়ে সাড়ে ৭ শতাংশে নামিয়ে এনেছে। অথচ গত সেপ্টেম্বরে দেশে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ। অর্থাৎ ব্যাংকে টাকা রেখে যে সুদ পাওয়া যাচ্ছে, তা মূল্যস্ফীতির হারের চেয়েও কম। কর ও অন্যান্য চার্জ বাদ দিলে আমানতকারীর প্রকৃত আয় আরও কমে যাচ্ছে।

এতে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়ছেন অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি, প্রবীণ নাগরিক এবং ব্যাংকের সুদের ওপর নির্ভর করে সংসার চালানো পরিবারগুলো। তাদের জন্য আমানত থেকে পাওয়া সুদ দিয়ে বাড়তি ব্যয় মেটানো কঠিন হয়ে উঠছে। শুধু তাই নয়, সুদ পেলেও মূল্যস্ফীতির কারণে সঞ্চিত অর্থের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমে যাচ্ছে।

ব্যাংকগুলো বলছে, আমানত বাড়লেও বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা কম। ফলে তাদের হাতে বিপুল পরিমাণ অর্থ উদ্বৃত্ত থাকছে। এই পরিস্থিতিতে বেশি সুদ দিয়ে নতুন আমানত সংগ্রহের প্রয়োজন কমে যাওয়ায় সুদের হার কমানো হচ্ছে।

মূল্যস্ফীতির চেয়ে কম সুদ

ব্যাংকারদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত দুই মাসে কয়েকটি বড় ব্যাংক দুই দফায় মেয়াদি আমানতের সুদের হার কমিয়েছে। ব্যাংকভেদে সুদহার কমানোর পরিমাণ ৫০ থেকে ১০০ বেসিস পয়েন্ট। গত জুলাইয়ে এক বছর মেয়াদি আমানতে যেখানে ৯ থেকে ১০ দশমিক ১৫ শতাংশ পর্যন্ত সুদ পাওয়া যেতো, আগস্টে তা কমে ৮ দশমিক ৫ থেকে ৯ শতাংশে নেমে আসে। সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকটি ব্যাংকে এই হার আরও কমে সাড়ে ৭ থেকে ৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

বর্তমানে ব্র্যাক ব্যাংক ও ডাচ-বাংলা ব্যাংক এক বছর মেয়াদি স্থায়ী আমানতে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ সুদ দিচ্ছে। প্রাইম ব্যাংকে এই হার ৭ দশমিক ৭৫ শতাংশ এবং সিটি ব্যাংকে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ বলে জানিয়েছেন ব্যাংকাররা।

এর অর্থ, কোনও গ্রাহক ১০ লাখ টাকা এক বছরের জন্য ৭ দশমিক ৫ শতাংশ সুদে জমা রাখলে— বছর শেষে তার মোট সুদ আয় হবে ৭৫ হাজার টাকা। কিন্তু একই সময়ে মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ থাকলে পণ্য ও সেবার দাম বাড়ার সঙ্গে তাল মিলিয়ে এই আয় দিয়ে সঞ্চিত অর্থের ক্রয়ক্ষমতা ধরে রাখা সম্ভব হয় না। এর সঙ্গে উৎসে কর, আবগারি শুল্ক ও প্রযোজ্য অন্যান্য চার্জ যুক্ত হলে হাতে পাওয়া অর্থ আরও কমে যায়।

অর্থাৎ ব্যাংকে রাখা টাকার অঙ্ক বাড়লেও— সেই টাকা দিয়ে আগের তুলনায় কম পণ্য ও সেবা কেনা সম্ভব হতে পারে। এটাই আমানতকারীদের জন্য প্রকৃত আয় কমে যাওয়ার মূল সমস্যা।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘‘সুদের হার কমে যাওয়ায় সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা চাপে পড়বেন। কারণ, তারা ব্যাংকে আমানত রেখে যে সুদ পান, তা দিয়েই অনেক সময় সংসারের ব্যয় মেটান। বর্তমানে মূল্যস্ফীতি বেশি থাকায় সুদের হার কমে যাওয়া তাদের জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করবে।’’

তিনি বলেন, ‘‘বাজারভিত্তিক অর্থনীতিতে সুদের হার চাহিদা ও জোগানের ওপর নির্ভর করে। যেসব ব্যাংকের তারল্য পরিস্থিতি ভালো, তাদের নতুন আমানতের চাহিদা কম থাকায় সুদের হার কমানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে।’’

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কামাল মুজেরী বলেন, ‘‘যেসব ব্যাংকের প্রতি মানুষের আস্থা বেশি, সেসব ব্যাংকে আমানত বাড়লে সুদের হার কমানো স্বাভাবিক। বাজারভিত্তিক ব্যবস্থায় এটি প্রচলিত চর্চা। এর ফলে ব্যাংকঋণের সুদ কমার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে—যা ব্যবসায়ীদের জন্য ইতিবাচক। তবে আমানতকারীদের কম সুদ পাওয়ার বিষয়টি তাদের জন্য সমস্যা তৈরি করবে।’’

ব্যাংকে আমানত বাড়ছে, ঋণের চাহিদা কম

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের আগস্ট শেষে ব্যাংক খাতে মোট তারল্যের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭ লাখ ৮১ হাজার ২১৪ কোটি টাকা। এর বিপরীতে বিধিবদ্ধ ন্যূনতম তারল্য সংরক্ষণের প্রয়োজন ছিল ৩ লাখ ৩৯ হাজার ২৬০ কোটি টাকা। সে হিসাবে ব্যাংক খাতে উদ্বৃত্ত তারল্যের পরিমাণ প্রায় ৪ লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকা।

এত বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতে থাকলেও ব্যাংকগুলো তা ঋণ হিসেবে বিতরণ করতে পারছে না। বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ ও ব্যবসা সম্প্রসারণের গতি দুর্বল থাকায় ঋণের চাহিদা কম। ফলে ব্যাংকের হাতে জমা হওয়া অর্থের বড় অংশ অলস পড়ে থাকছে অথবা সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ করা হচ্ছে।

ব্যাংকারদের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম আট মাসে ব্যাংক খাতে গড় আমানত প্রবৃদ্ধি ছিল ১১ দশমিক ৯৬ শতাংশ। তবে কয়েকটি শীর্ষ ব্যাংকে আমানত বেড়েছে ১৫ থেকে ২২ শতাংশ পর্যন্ত। সংকটে থাকা ব্যাংক থেকে টাকা সরিয়ে তুলনামূলক নির্ভরযোগ্য ব্যাংকে জমা রাখছেন অনেক গ্রাহক। ফলে এসব ব্যাংকের আমানত আরও বাড়ছে।

ব্যাংক এশিয়ার ব্যবস্থাপনা পরিচালক সোহেল আর কে হুসেইন জানিয়েছেন, তাদের ব্যাংকের ঋণ-আমানত অনুপাত প্রায় ৬০ শতাংশ। অর্থাৎ আমানতের তুলনায় ঋণ বিতরণের পরিমাণ কম থাকায় ব্যাংকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ উদ্বৃত্ত রয়েছে।

অন্যদিকে, ব্যাংকারদের তথ্য অনুযায়ী, ছয় মাসের বেশি সময় ধরে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশের নিচে রয়েছে। ব্যবসায়ীরা নতুন বিনিয়োগে আগ্রহী না হওয়া, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং ঋণের উচ্চ সুদ এ পরিস্থিতির অন্যতম কারণ।

উদ্বৃত্ত অর্থের চাপ কমাতে সুদ কমাচ্ছে ব্যাংক

ব্যাংকের জন্য আমানত একটি দায়। গ্রাহকের কাছ থেকে টাকা নিয়ে তা ঋণ বা বিনিয়োগে ব্যবহার করে আয় করতে হয়। কিন্তু আমানতের অর্থ ঋণ হিসেবে বিতরণ করা না গেলে ব্যাংককে একদিকে গ্রাহকের সুদ পরিশোধ করতে হয়, অন্যদিকে সেই অর্থ থেকে প্রত্যাশিত আয় আসে না। এতে তহবিল ব্যবস্থাপনার খরচ বাড়ে।

এই পরিস্থিতিতে আমানতের সুদের হার কমিয়ে ব্যয় নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে ব্যাংকগুলো। দীর্ঘমেয়াদি আমানতের ক্ষেত্রে সুদ কমানোর প্রবণতাও দেখা যাচ্ছে। কিছু ব্যাংক এখন তিন থেকে ছয় মাস মেয়াদি আমানত সংগ্রহে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। কারণ, ভবিষ্যতে সুদের হার কোনদিকে যাবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।

একই সঙ্গে সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডের সুদের হার কমে আসায় ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ থেকে আয়ের সম্ভাবনাও প্রভাবিত হচ্ছে। সাধারণত সরকারি সিকিউরিটিজের সুদের হার ব্যাংকিং খাতের অন্যান্য সুদের হারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক হিসেবে কাজ করে। সরকারি বিল-বন্ডে বিনিয়োগের বিপরীতে আয় কমলে ব্যাংকগুলো আমানতের সুদের হারও সমন্বয় করতে পারে।

তবে সব ব্যাংকে একই চিত্র নেই। কিছু দুর্বল ব্যাংক এখনও আমানত সংগ্রহে তুলনামূলক বেশি সুদ দিচ্ছে। এতে ব্যাংক খাতে আমানতের সুদহারে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য তৈরি হয়েছে। বেশি সুদের প্রস্তাব দেখেই আমানত রাখার সিদ্ধান্ত না নিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের আর্থিক অবস্থা ও আমানতের নিরাপত্তাও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

সুদ কমলে ঋণগ্রহীতারা কি সুবিধা পাবেন?

ব্যাংকগুলোর যুক্তি, আমানতের সুদ কমলে তহবিল সংগ্রহের ব্যয় কমবে। এতে ভবিষ্যতে ঋণের সুদ কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে আমানতের সুদ কমলেই ঋণের সুদ একই হারে কমবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। ঋণের সুদ নির্ভর করে ব্যাংকের তহবিল ব্যয়, পরিচালন ব্যয়, ঝুঁকি এবং বাজার পরিস্থিতির ওপর।

বাংলাদেশ ব্যাংকও বিনিয়োগ ও ঋণপ্রবাহ বাড়াতে নীতি সুদহার ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে সাড়ে ৯ শতাংশ করেছে। তবে বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা দুর্বল থাকায় ব্যাংক খাতে উদ্বৃত্ত তারল্য কমছে না।

অর্থনীতিবিদদের মতে, ঋণের চাহিদা বাড়াতে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা জরুরি। ব্যবসায়ীরা নতুন কারখানা স্থাপন, উৎপাদন বাড়ানো ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে এগিয়ে এলে ব্যাংকের উদ্বৃত্ত অর্থ উৎপাদনশীল খাতে ব্যবহারের সুযোগ বাড়বে। তাতে ব্যাংকের আয় বাড়ার পাশাপাশি অর্থনীতিতেও গতি ফিরতে পারে।

সঞ্চয়কারীদের সামনে কী বিকল্প?

ড. মুস্তফা কামাল মুজেরী মনে করেন, আমানতকারীরা চাইলে সঞ্চয়পত্র বা পুঁজিবাজারের মতো বিকল্প বিনিয়োগের মাধ্যম বিবেচনা করতে পারেন। তবে পুঁজিবাজারে মুনাফার সম্ভাবনার পাশাপাশি লোকসানের ঝুঁকিও রয়েছে। তাই শুধু বেশি আয়ের আশায় ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগে অর্থ সরিয়ে নেওয়া উচিত নয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, আমানতকারীদের জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সঞ্চয়ের নিরাপত্তা বজায় রেখে মূল্যস্ফীতির ক্ষতি যতটা সম্ভব কমানো। বিশেষ করে যারা নিয়মিত সুদের আয় দিয়ে সংসার চালান, তাদের ব্যয় ও আয় নতুন করে হিসাব করতে হচ্ছে।

সব মিলিয়ে ব্যাংক খাতে আমানত বাড়লেও ঋণের চাহিদা দুর্বল থাকায় সুদের হার কমানোর প্রবণতা তৈরি হয়েছে। এতে ভবিষ্যতে ঋণগ্রহীতারা কিছুটা সুবিধা পেতে পারেন। কিন্তু মূল্যস্ফীতির চেয়ে কম সুদ পাওয়ায় আমানতকারীদের প্রকৃত আয় কমছে। নিত্যপণ্যের বাড়তি দামের সঙ্গে যখন সংসারের ব্যয় সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন মানুষ, তখন ব্যাংকে সঞ্চিত অর্থের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়া তাদের আর্থিক অনিশ্চয়তা আরও বাড়িয়ে তুলছে। সূত্র বাংলা ট্রিবিউন

Advertise with us
Advertise with us
ব্যাংকে টাকা রেখেও লাভ নেই,...
শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬
বিভিন্ন দেশের কারাগারে সাড়ে ৭...
শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬
৬৬০৮ কোটি টাকায় পুলিশের জন্য...
শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬
আরও
Advertise with us

ফলো করুন Passenger Voice-এর খবর

Editor and Publisher
SAMSUDDIN CHOWDHURY
Dhaka Office
  • 26 Delwar Complex, Tikatuli, Wari, Bangladesh.
Chittagong Office
  • 35 Kadam Mobarak By-Lane, Jashim Bhaban (4th Floor), Momin Road, Chittagong.
Contact