| রবিবার, ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | প্রিন্ট | ১৪ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে
রোহিঙ্গা সংকট যেন অন্য কোনো বৈশ্বিক রাজনৈতিক সংঘাত বা সংকটের আড়ালে চাপা পড়ে না যায়, সে বিষয়ে আন্তর্জাতিক সংস্থা ও জাতিসংঘের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, রোহিঙ্গা ইস্যুটি জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক নজরদারি ও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে সক্রিয় রাখতে হবে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জোরালো সহযোগিতা ও কার্যকর কূটনৈতিক উদ্যোগের মাধ্যমে বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের দ্রুত মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে হবে।
আজ রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর ইস্কাটন গার্ডেন রোডে বিআইআইএসএস মিলনায়তনে ‘দ্য রোহিঙ্গা ক্রাইসিস: ইমার্জিং চ্যালেঞ্জেস অ্যান্ড রিফার্মিং রেসপন্স স্ট্রাটেজিস’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসব কথা বলেন। রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে এ গোলটেবিল আলোচনা আয়োজন করে ইন্সটিটিউট ফর গ্লোবাল কো-অপারেশন ফাউন্ডেশন। সকাল ১১টা থেকে আলোচনা শুরু হয়ে শেষ হয় দুপুর দেড়টায়।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘রোহিঙ্গা ইস্যুটি যেন জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক রাডারে সর্বদা সক্রিয় থাকে এবং অন্য কোনো বৈশ্বিক রাজনৈতিক সংঘাত বা সংকটের আড়ালে চাপা পড়ে না যায়।’
এ সংকটের দ্রুত ও টেকসই রাজনৈতিক সমাধানে বিশ্ব সম্প্রদায়, জাতিসংঘ এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর জোরালো সহযোগিতা প্রয়োজন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আশাবাদ প্রকাশ করে বলেন, টেকসই আন্তর্জাতিক অংশগ্রহণ, জাতীয় ঐক্য ও শক্তিশালী নিরাপত্তা কাঠামোর সমন্বয়ে বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের দ্রুত ও মর্যাদাপূর্ণভাবে নিজ মাতৃভূমিতে প্রত্যাবাসনে সক্ষম হবে।
আন্তর্জাতিক মহলের সহযোগিতায় বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত মিয়ানমারের নাগরিকদের (এফডিএমএন) মর্যাদাপূর্ণভাবে নিজ দেশে প্রত্যাবাসনের উদ্যোগ দ্রুত কার্যকর করার আহ্বান জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আন্তর্জাতিক সংস্থা ও জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআরের প্রতিনিধিসহ সংশ্লিষ্ট সবার আলোচনার মাধ্যমে এ বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। এর মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত, বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া প্রায় ১৫ লাখ জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত মিয়ানমারের নাগরিককে মর্যাদাপূর্ণভাবে তাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানো।
আন্তর্জাতিক মহলের সহযোগিতা ও অব্যাহত সমর্থন প্রয়োজন উল্লেখ করে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে রোহিঙ্গা ইস্যুটি যেন সবসময় গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনায় থাকে। অন্য কোনো ইস্যুর আড়ালে পড়ে রোহিঙ্গা সংকট যেন চাপা না পড়ে, সে বিষয়েও সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি আহ্বান জানানো হয়।
জাতিসংঘের প্রতিনিধির উদ্দেশে তিনি বলেন, রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে বিষয়টিকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আরও গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরতে হবে। একই সঙ্গে দেশে ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মানবাধিকার নিয়ে কাজ করা সংস্থাগুলো রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সম্মানের সঙ্গে দ্রুত নিজ দেশে প্রত্যাবাসনের ব্যবস্থা করার আহ্বান।
বক্তব্যে আরও বলা হয়, এ সংকট সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহযোগিতা সবচেয়ে বেশি জরুরি। বিশেষ করে বিশ্বের প্রভাবশালী দেশগুলোর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক সংস্থা ও জাতিসংঘের সহায়তায় এসব দেশ রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
অতীতের সাফল্য ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা তুলে ধরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ সরকারের নেতৃত্ব এবং অতীতের ঐতিহাসিক সাফল্যের ওপর ভিত্তি করে বর্তমান রাজনৈতিক সরকার রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে আশাবাদী। অতীতে ১৯৭৮ সালে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে এবং পরবর্তীতে ১৯৯২ সালে প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বাংলাদেশ সফলভাবে মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করেছিল। রাজনৈতিক সদিচ্ছা, কার্যকর কূটনীতি এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা থাকলে যে প্রত্যাবাসন সম্ভব—অতীতের অভিজ্ঞতা সেটিরই প্রমাণ দেয়। বর্তমান সরকার সেই অভিজ্ঞতার আলোকেই দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের লক্ষ্যে কাজ করছে।
রোহিঙ্গা সংক্রান্ত সার্বিক বিষয় পরিচালনার জন্য প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি নেতৃত্বে একটি ‘জাতীয় কৌশল প্রণয়ন কমিটি’ গঠন করা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত মিয়ানমার নাগরিকদের আইনশৃঙ্খলা, নিরাপত্তা এবং সার্বিক বিষয় দেখভালের জন্য আরেকটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি কাজ করছে। বেসামরিক প্রশাসন, নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা সংস্থাগুলোর যৌথ অংশগ্রহণের মাধ্যমে একটি সমন্বিত জাতীয় কৌশল গড়ে তোলা হচ্ছে।
প্রধান অতিথি বলেন, ২০১৭ সাল থেকে বাংলাদেশ সরকারি হিসেবে প্রায় ১২ লাখ (বেসরকারি হিসাবে প্রায় ১৫ লাখ) বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাকে মানবিক আশ্রয়, খাদ্য, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষা ও সুরক্ষা দিয়ে আসছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে এই আশ্রয় দেওয়ার ফলে স্থানীয় ও আঞ্চলিক নিরাপত্তায় নতুন নতুন হুমকি দেখা দিচ্ছে। ক্যাম্পগুলোতে মানব পাচার, মাদক ব্যবসা, জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সক্রিয়তা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এসব অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড কেবল ক্যাম্পের ভেতরেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা আশেপাশের স্থানীয় জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতাকেও মারাত্মক ঝুঁকিতে ফেলছে।
অনুষ্ঠানে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়-সংক্রান্ত প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসন বিষয়ক উপদেষ্টা মো. ইসমাইল জবিউল্লাহ ‘গেস্ট অব অনার’ হিসেবে বক্তব্য দেন। তিনি রোহিঙ্গা ইস্যুতে প্রশাসনিক সমন্বয়ের গুরুত্ব তুলে ধরেন। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম। গোলটেবিল আলোচনায় অংশ নেন জাতিসংঘ ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধি, নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞ, কূটনীতিক, শিক্ষাবিদ, মানবিক সহায়তাকর্মীরা।