নিজস্ব প্রতিবেদক | বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর ২০২৬ | প্রিন্ট | ৭৪ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে
দেশের ভঙ্গুর, বিশৃঙ্খল পরিবহন ব্যবস্থাকে সুস্থতায় ফেরাতে এবং চালকদের দক্ষতা উন্নয়ণে মানসম্মত প্রশিক্ষণ প্রদান, সড়ক দুর্ঘটনা রোধে বিআরটিএর দৃশ্যমান কার্যক্রম গ্রহণে পরিচালক(ইঞ্জিঃ) পদে কর্মকর্তাদের চলতি দায়িত্ব প্রদানের বিষয়টি নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে।
একদিকে আইন বলছে সাময়িকভাবে কোন সরকারী কর্মচারীকে তাহার মূল পদের/গ্রেডের সম পদের/ সম গ্রেডের কিংবা ক্ষেত্রমতে নিম্ন পদে নিজ দায়িত্বের অতিরিক্ত অন্য কোনো শূণ্য পদে অতিরিক্ত দায়িত্ব প্রদান করা যাবে। তবে মূল পদের পরবর্তী উচ্চতর কোনো প্রকৃত শূণ্য পদের দায়িত্ব পালন করতে চলতি দায়িত্ব প্রদান করতে হয়। চলতি দায়িত্ব প্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারী তাহার পূর্ববর্তী পদের দায়িত্ব হস্তান্তর করিয়া চলতি দায়িত্বের পদে যোগদান করবেন।
অন্যদিকে বিআরটিএর কতিপয় দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তারা নিজ দায়িত্বের অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসাবে পরবর্তী উচ্চতর কোনো প্রকৃত শূণ্য পদের দায়িত্ব গ্রহণ করে দেশের বিভিন্ন সার্কেলে অনিয়ম, দুর্নীতি, ঘুষ বাণিজ্য ও দালাল চক্র নিয়ন্ত্রণসহ অবৈধ মোটরযানের নিবন্ধন প্রদানের ক্ষেত্র তৈরি করে। শূণ্য পদের সুযোগ নিয়ে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালনের নজির সবচেয়ে বেশি বিআরটিএর দুর্নীতির বরপুত্র সাবেক চেয়ারম্যান মশিউর রহমানের আমলে। সেসময়ে সংস্থাটির বেশ কিছু মোটরযান পরিদর্শক নিজ দায়িত্বের অতিরিক্ত হিসাবে একই সার্কেলের সহকারী পরিচালক(ইঞ্জিঃ) এর দায়িত্ব নিয়ে এমন অপকর্ম চালাতো। সাবেক মোটরযান পরিদর্শক আইয়ুব আনসারি, আব্দুর জলিলের সেই দুর্নীতিগ্রস্থ তথ্য-উপাত্ত বর্তমান চেয়ারম্যান হাবিবুর রহমানের অজানা নয়। এছাড়াও মেকানিক্যাল এসিস্ট্যান্ট পদে যোগদান করে মোটরযান পরিদর্শকের অতিরিক্ত দায়িত্ব নিয়ে ঢাকা জেলা সার্কেলের বর্তমান মোটরযান পরিদর্শক জাফর হাসানের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের সাক্ষর জাল করে, ভুয়া নথিপত্র তৈরি করে জাল ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদানের তথ্যটিও অবগত আছেন বিআরটিএর এই বর্তমান চেয়ারম্যান। তবুও পরিচালক (ইঞ্জিঃ) এর গুররুত্বপূর্ণ পদে জুনিয়র কর্মকর্তাদের অতিরিক্ত দায়িত্ব দিয়ে সেবা প্রার্থীদের সাথে রসিকতা করছেন তিনি।
আরও পড়ুন: ৬ বিভাগে শূণ্য বিআরটিএর পরিচালক (ইঞ্জিঃ) পদ, যোগ্যতা থাকলেও মিলছে না চলতি দায়িত্ব
বিআরটিএর প্রশাসন শাখার তথ্য বলছে, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের ২০২২ সালের ১২ই মে নং- ৩৫.০০.০০০০.০২০.০১৫.০১৫. ১৮(অংশ)২২৮ নং স্মারকে বিআরটিএর রাজস্ব খাতের অস্থায়ীভাবে বিভাগীয় অফিসের জন্য ৪র্থ গ্রেডের পরিচালক(ইঞ্জিঃ) এর ৮টি পদ সৃজন করা হয়।
সেই সময়ে পদোন্নতি যোগ্য কোনো উপপরিচালক (ইঞ্জিঃ) না থাকায় এবং পরিচালক (ইঞ্জিঃ) পদে একাধিক পদোন্নতিপপ্রাপ্ত কর্মকর্তা না থাকায় প্রশাসনিক প্রয়োজনে ও বিআরটিএর কার্যক্রম সুষ্ঠভাবে পরিচালনার স্বার্থে জনপপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের শাখা (বিবি-১) এর ৫ ফেব্ররুয়ারি ১৯৯২ তারিখের নং- সম(বিধি-১)/এস-১১/৯২-৩০(১৫০) এর মাধ্যমে ৭ জন উপপরিচালক(ইঞ্জিঃ)কে চলতি দায়িত্ব প্রদান করা হয়েছে।
বিআরটিএর উপপরিচালক (ইঞ্জিঃ)গণের মধ্য হতে জ্যেষ্ঠতা ও কর্ম দক্ষতার ভিত্তিতে গ্রেডেশন অনুযায়ী তাদের এসব দায়িত্ব দেওয়া হয়। দায়িত্ব প্রদানের পূর্বে বিআরটিএর তৎকালীন চেয়ারম্যান নুর মোহাম্মদ মজুমদার ২০২২ সালের ২৩শে মে নং- ৩৫.০৩.০০০০.০০১.১২.০০৮.১৩-৮৩৪ সংখ্যক স্মারকে সড়ক পরিবহন মহাসড়ক বিভাগের সচিব বরাবরে এসব কর্মকর্তাদের অতিরিক্ত দায়িত্ব ও চলতি দায়িত্ব প্রদানের বিষয়ে মতামত গ্রহণের জন্য পত্র প্রেরণ করেন। বিআরটিএর সংস্থাপন শাখার ২০২২ সালের ২৯মে তারিখের নং-৩৫.০০.০০০০.০২০.০৪.০১৮.২২-২৫৭ সংখ্যক স্মারকে সহকারী সচিব মোঃ জসিম উদ্দিন স্বাক্ষরিত এক পত্রে বিআরটিএ কর্তৃক একাধিক কর্মকর্তাকে চলতি দায়িত্ব প্রদানের নজির রয়েছে মর্মে বিআরটিএর চেয়ারম্যানকে পত্র প্রেরণ করা হয়। পরবর্তীতে ২০২২ সালের ৮ জুন নং-৩৫.০৩.০০০০.০০১.১২.০০৮.১৩-৯৬৪ সংখ্যক স্মারকে ৭ উপপরিচালক(ইঞ্জিঃ)কে পরিচালক(ইঞ্জিঃ) পদে চলতি দায়িত্ব প্রদান করে কর্তৃপক্ষ।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্র মতে, ২০২৩ সালের ১৮ই এপ্রিল নং-০৫.০০.০০০০.১৭০.১১.০১৭.২১-৯৭ সংখ্যক স্মারকের নতুন বিধি মোতাবেক বিআরটিএর জ্যেষ্ঠতার তালিকা অনুযায়ী উপপরিচালক(ইঞ্জিঃ) সুব্রত কুমার দেবনাথ, এ এস এম কামররুল হাসান, সুবীর কুমার সাহা, মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম, মোঃ ইব্রাহিম খলিল, মোঃ সানাউল হক ও স্বদেশ কুমার দাশকে পরিচালক(ইঞ্জিঃ) পদে চলতি দায়িত্ব প্রদানে আইনি কোনো বাঁধা নেই। তবে চলতি দায়িত্ব প্রদানের পূর্বে এসকল কর্মকর্তার জ্যেষ্ঠতা, কর্মদক্ষতা ও সন্তোষজনক চাকুরির ভিত্তিতে পদোন্নতি যোগ্যতা বিবেচনা করতে হবে। তাদের মধ্যে কোনো কর্মকর্তার সন্তোষজনক সার্ভিস রেকর্ড না থাকিলে অথবা উক্ত পদে শিক্ষানবিশ কাল পূর্ণ না হইলে ও চাকরিতে উক্ত পদে স্থায়ী না হলে এমনকি এই সাতজন কর্মকর্তার মধ্যে কোনো উপপরিচালক (ইঞ্জিঃ) এর বিভাগীয় /ফৌজদারি মামলার কার্যধারা চলমান থাকলে জ্যেষ্ঠতার তালকা অনুযায়ী কাজী মোঃ মোরসালিন, তোহিদুল হোসেনকে পরিচালক(ইঞ্জিঃ) পদে চলতি দায়িত্ব প্রদান করতে পারবে।
উক্ত প্রজ্ঞাপনের ১০নং কলামে উল্লেখ আছে চলতি দায়িত্বকে পদোন্নতি হিসাবে দাবি করা যাবে না। একইসাথে পদবীর ব্যবহারের ক্ষেত্রে পরিচালক(ইঞ্জিঃ)(চলতি দায়িত্ব) শব্দদ্বয় যোগ করতে হবে। উক্ত নীতিমালা মেনে সাতজন উপপরিচালক(ইঞ্জিঃ)কে পরিচালক(ইঞ্জিঃ) এর অতিরিক্ত দায়িত্ব প্রদান করা হলে দেশের ৬টি বিভাগীয় পরিচালক(ইঞ্জিঃ) এর কার্যালয় পদশূণ্য থাকবে না বলে মনে করেন পরিবহন বিশেষজ্ঞরা।একইসাথে বিআরটিএর সবচেয়ে দায়িত্বশীল পদ প্রশিক্ষণ শাখার পরিচালক(ইঞ্জিঃ) পদটিও অভিভাবক শূণ্য থাকবে না।
পরিবহন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সড়ক দুর্ঘটনারোধে কেবলমাত্র আহত-নিহতদের ক্ষতিপূরণের চেক বিতরণ করাই শুধু বিআরটিএর কাজ নয়। সড়কে নিরাপত্তা নিশ্চিত, চালকের প্রশিক্ষণ, সুপারভাইজার লাইসেন্স এবং প্রশিক্ষণ প্রদান, সড়ক দুর্ঘটনা রোধে দক্ষ চালক তৈরি, ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদানের ক্ষেত্রে সঠিক নিয়মের যথাযথ প্রয়োগ, গৎবাঁধা নিয়ম থেকে বেরিয়ে এসে চালক এবং সহকারীদের সড়ক দুর্ঘটনারোধে ও আক্রান্তদের দ্রুত চিকিৎসা সেবা সংস্ক্রান্ত মানসম্মত প্রশিক্ষণ প্রদান করাও বিআরটিএর প্রধান উদ্দেশ্য হওয়া উচিত। এছাড়াও ২০১৮ সালের ২রা অক্টোবর বাংলাদেশ সরকারের প্রকাশিত গেজেট অনুযায়ী পদায়ন ও বদলির ক্ষেত্রে রাজস্ব আদায়, কর্মপরিসর, অবকাঠামোগত অবস্থা, শিক্ষা ও চিকিৎসা সংক্রান্ত সুবিধাদি বিবেচনায় বদলি ও পদায়ন করা দরকার।