ডেস্ক রিপোর্ট | শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬ | প্রিন্ট | ১৩ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে
ভারত থেকে আমদানি করা চালের নমুনায় সম্ভাব্য ক্যানসার সৃষ্টিকারী বিষাক্ত উপাদান আফলাটক্সিনের উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে। এ ঘটনায় অধিকতর পরীক্ষার জন্য চালানের বাকি ৯ হাজার ৫০০ টন চালের বিতরণ সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে খাদ্য অধিদপ্তর।
বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. কাজী শিরীন আক্তার জাহান সংবাদমাধ্যমকে বলেন, দীর্ঘদিন সংরক্ষিত থাকলে চালে আফলাটক্সিন তৈরি হতে পারে। নমুনায় যে পরিমাণ আফলাটক্সিন পাওয়া গেছে, তা সহনীয় মাত্রার মধ্যেই রয়েছে। তবে সহনীয় মাত্রা ছাড়িয়ে গেলে এটি স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
গত ১৭ আগস্ট চট্টগ্রামের হালিশহর ও দেওয়ানহাট সেন্ট্রাল স্টোরেজ ডিপো (সিএসডি) থেকে চালের নমুনা সংগ্রহ করেন ব্রির তিন সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল। পরীক্ষায় হালিশহর এবং ঢাকার একটি সরকারি গুদামের চালের নমুনায় আফলাটক্সিনের উপস্থিতি পাওয়া যায়। এরপর ওই চালানের বাকি ৯ হাজার ৫০০ টন চাল বিতরণ বন্ধের সিদ্ধান্ত নেয় খাদ্য অধিদপ্তর।
হালিশহর সিএসডির ব্যবস্থাপক মাহমুদ হাসান জানান, খাদ্য কর্মকর্তারা এই চালের লট দুবার পরীক্ষা করেছেন। ডিপো কর্তৃপক্ষকে চাল বিতরণ বন্ধ রাখার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। তবে পরীক্ষার আনুষ্ঠানিক ফলাফল এখনো ডিপোতে পৌঁছায়নি।
চট্টগ্রাম খাদ্য বিভাগের চলাচল ও সংরক্ষণ নিয়ন্ত্রক রেজওয়ান সাকিবও চাল বিতরণ বন্ধ রাখার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে প্রতি টন ৩৫৩ দশমিক ১১ ডলার দরে ৫০ হাজার টন চাল আমদানির চুক্তি করে সরকার। সিঙ্গাপুরভিত্তিক প্রতিষ্ঠান অ্যাগ্রোকর্প ইন্টারন্যাশনাল এই চাল সরবরাহ করে।
চুক্তির আওতায় প্রায় ১০ হাজার ৮৭৮ টন চাল নিয়ে এমভি এইচটি পাইওনিয়ার জাহাজটি গত ২১ জুলাই চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছায়। পরদিন খাদ্য কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য গবেষণাগারে পাঠানো হয়। প্রাথমিক পরীক্ষার প্রতিবেদনে চাল মানুষের খাওয়ার উপযোগী বলে ঘোষণা করা হয়। এরপর ২৪ ও ২৫ জুলাই চাল খালাসের অনুমতি দেয় কর্তৃপক্ষ।
খালাসের পর চাল ঢাকা, চট্টগ্রাম ও গাজীপুরের সরকারি গুদামে পাঠানো হয়। তবে পরে গুদাম কর্মকর্তারা চালের একাংশের মান নিয়ে উদ্বেগ জানান। তাদের অভিযোগ, কিছু চাল অত্যন্ত নিম্নমানের এবং খাওয়ার প্রায় অনুপযোগী।
এ কারণে বন্দর থেকেই প্রায় ১ হাজার ৩৭৮ টন চাল জাহাজে ফেরত পাঠানো হয়। বাকি ৯ হাজার ৫০০ টন চাল গ্রহণ করা হয়েছিল। পরে খাদ্য অধিদপ্তর অধিকতর পরীক্ষার উদ্যোগ নেয়। পরীক্ষা শেষ না হওয়া পর্যন্ত চাল বিতরণ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এম জসিম উদ্দিন খান।
চালে আফলাটক্সিন পাওয়ার দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান অ্যাগ্রোকর্প ইন্টারন্যাশনাল। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, বাংলাদেশের খাদ্য কর্মকর্তা ও সরবরাহকারীর যৌথভাবে সংগ্রহ করা নমুনা ভারতের একটি পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করা হয়েছিল। ওই পরীক্ষায় চাল চুক্তির শর্ত পূরণ করেছে বলে জানানো হয়।
এক ইমেইলে প্রতিষ্ঠানটি আরও দাবি করে, ব্রিতে পরীক্ষা করা সিলগালা যৌথ নমুনায় কোনো আফলাটক্সিন পাওয়া যায়নি বলে তাদের জানানো হয়েছিল। নিজেদের দাবির পক্ষে সংযুক্ত এসজিএস প্রতিবেদনের পাঁচ ও ছয় নম্বর পৃষ্ঠার কথাও উল্লেখ করেছে তারা।
সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের ভাষ্য, চালের মান নিশ্চিত করতে তারা যথাযথ কার্যপ্রণালি অনুসরণ করেছে। চাল বিতরণ স্থগিতের আগে এ বিষয়ে কোনো অভিযোগও পায়নি তারা।
অন্যদিকে, সরবরাহকারীর শিপিং এজেন্ট সেভেন সিজ শিপিং লাইনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলী আকবর অভিযোগ করেছেন, একটি স্বার্থান্বেষী মহল আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সুনাম ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা করছে।
তিনি বলেন, এমন পরিস্থিতি চলতে থাকলে আন্তর্জাতিক সরবরাহকারীরা বাংলাদেশে খাদ্যশস্য সরবরাহে আগ্রহ হারাতে পারেন, যা দেশকে বিপাকে ফেলবে।
খাদ্য অধিদপ্তর ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের পরস্পরবিরোধী বক্তব্যে চালের নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষার প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে প্রাথমিকভাবে সংগ্রহ করা নমুনা পুরো চালানের মান যথাযথভাবে তুলে ধরেছিল কি না, তা নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চালের নমুনায় আফলাটক্সিনের সুনির্দিষ্ট মাত্রা এখনো প্রকাশ করেনি কর্তৃপক্ষ। চিহ্নিত চালের বিষয়ে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে, কিংবা অন্য গুদামগুলোতে আরও পরীক্ষা চালানো হবে কি না, সে বিষয়েও স্পষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এম জসিম উদ্দিন খানের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।