ডেস্ক রিপোর্ট | শুক্রবার, ০৯ অক্টোবর ২০২৬ | প্রিন্ট | ১৫ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে
সমুদ্রপথে পৃথিবী ঘুরে দেখার স্বপ্ন ছিল নিউজিল্যান্ডের জন এডওয়ার্ড পুদনের। সেই স্বপ্নে সঙ্গী ছিলেন স্ত্রী বেলা ও দুই ছেলে আলবার্ট এবং রালফ। ৪ সদস্যের পরিবারকে নিয়ে সমুদ্রযাত্রার জন্য কক্সবাজারে তৈরি করিয়েছিলেন বিশেষ নৌযান ‘আইল্যান্ড গার্ল’। পরিকল্পনা ছিল, নিজেদের নৌযানে চড়ে এক দেশ থেকে আরেক দেশে ঘুরে বেড়াবেন। দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রা শেষে ফিরবেন নিউজিল্যান্ডে।
কিন্তু সেই স্বপ্নযাত্রার শেষটা হলো বিষাদে। গত ২৫ আগস্ট চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার উপকূলের মধ্যবর্তী মহেশখালী চ্যানেলের মোহনায় বড় ঢেউ ও তীব্র স্রোতে ডুবে যায় ‘আইল্যান্ড গার্ল’। সাগরে পড়ে যান পরিবারের চার সদস্য। স্থানীয় জেলেদের তৎপরতায় প্রাণে বেঁচে যান জন এডওয়ার্ড, বেলা ও ছোট ছেলে রালফ। নিখোঁজ হয় বড় ছেলে ১৬ বছর বয়সী আলবার্ট। পরদিন সমিতিপাড়া উপকূল থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
ছেলেকে হারিয়ে সেই স্বপ্নের নৌযানে আর ঘরে ফেরা হলো না পরিবারের। প্রায় দেড় মাস কক্সবাজারে অবস্থানের পর আজ শুক্রবার (১০ অক্টোবর) নিউজিল্যান্ডের উদ্দেশে রওনা হচ্ছেন জন এডওয়ার্ড, বেলা ও রালফ। তবে সমুদ্রপথে নয়, ফিরছেন আকাশপথে।
সমুদ্রযাত্রার স্বপ্ন থামল যেভাবে
জন এডওয়ার্ডের পরিবারের কক্সবাজারে আসার গল্পটা অন্য রকম। ২০২৪ সালে পর্যটক ভিসায় বাংলাদেশে আসেন তিনি। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে সমুদ্রপথে পৃথিবী ঘুরে দেখার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য বেছে নেন কক্সবাজারকে। স্থানীয় কারিগরদের সহযোগিতায় শহরের এসএমপাড়া এলাকায় তৈরি হতে থাকে ‘আইল্যান্ড গার্ল’।
নাজিরারটেকের বাসিন্দা দিসরুল ইসলাম রুবেলের ভাষ্য, প্রায় দুই বছর ধরে চলে নৌযানটির নির্মাণকাজ। এতে অন্তত এক কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে বলে দাবি তার।
দীর্ঘদিন সমুদ্রে থাকার উপযোগী করে তৈরি করা হয়েছিল নৌযানটি। এতে ছিল শীতাতপনিয়ন্ত্রিত কক্ষ, ফ্রিজ ও রান্নাঘরসহ নানা সুবিধা। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে সমুদ্রপথে এক দেশ থেকে আরেক দেশে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় আয়োজন করেছিলেন জন এডওয়ার্ড।
কিন্তু স্বপ্নের সেই নৌযানই একসময় হয়ে ওঠে বিপদের কারণ। এর আগেও বৈরী আবহাওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল ‘আইল্যান্ড গার্ল’। সোনাদিয়ায় আশ্রয় নেওয়ার পর পরিবারের সদস্যদের ওপর হামলা ও মালামাল লুটের ঘটনাও ঘটেছিল। এরপর নৌযান মেরামত করে আবার সমুদ্রে নামেন তারা। শেষ পর্যন্ত ২৫ আগস্টের দুর্ঘটনায় প্রাণ হারাতে হয় আলবার্টকে।
কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট তাসনীম জাহানের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার দিন সকালে ‘আইল্যান্ড গার্ল’ নিয়ে চট্টগ্রামের উদ্দেশে রওনা হয় পরিবারটি। নাজিরারটেক থেকে কিছু দূরে মহেশখালী চ্যানেলের মোহনায় সকাল সাড়ে ৯টার দিকে বড় ঢেউ ও তীব্র স্রোতের কবলে পড়ে নৌযানটি। একপর্যায়ে চারজনই সাগরে পড়ে যান।
কাছাকাছি থাকা স্থানীয় জেলেরা দ্রুত এগিয়ে এসে জন এডওয়ার্ড, বেলা ও রালফকে উদ্ধার করেন। কিন্তু আলবার্টকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। খবর পেয়ে উদ্ধারকাজে যোগ দেয় কোস্ট গার্ড, পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস, লাইফগার্ড ও স্থানীয় জেলেরা। সাগর ও উপকূলজুড়ে শুরু হয় তল্লাশি।
পরদিন বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে সমিতিপাড়া উপকূলে একটি মরদেহ ভাসতে দেখেন স্থানীয় লোকজন। পরে সেটি আলবার্টের বলে শনাক্ত করা হয়।
কক্সবাজার সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শেখ মোহাম্মদ আলী জানান, মরদেহ উদ্ধারের পর আইনগত প্রক্রিয়া ও ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করা হয়। পরে পুলিশের উপস্থিতিতে কক্সবাজারের একটি শ্মশানে আলবার্টের শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়। এক্ষেত্রে নিউজিল্যান্ডের দূতাবাস ও পরিবারের অনুমতি নেওয়া হয়েছিল।
দেড় মাসের আশ্রয়, এবার দেশে ফেরা
নৌকাডুবির পর থেকে জন এডওয়ার্ড, বেলা ও রালফ কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে ছিলেন। তাদের রাখা হয়েছিল বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের মোটেল শৈবালে। নিরাপত্তার জন্য সেখানে পুলিশও মোতায়েন ছিল।
কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের পর্যটন সেলের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মাহমুদুর রহমান জানান, পরিবারের তিন সদস্যের দেশে ফেরার প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষ হয়েছে। সবকিছু ঠিক থাকলে শুক্রবার তারা নিউজিল্যান্ডের উদ্দেশে রওনা হবেন।
নৌকাডুবির সময় পরিবারের সদস্যদের পাসপোর্টসহ প্রয়োজনীয় কিছু নথি হারিয়ে যায়। ফলে দেশে ফেরার ব্যবস্থা করাও সহজ ছিল না। তাসনীম জাহান জানান, বাংলাদেশে নিউজিল্যান্ডের কোনো দূতাবাস না থাকায় শ্রীলঙ্কায় অবস্থিত নিউজিল্যান্ডের দূতাবাসের সঙ্গে অনলাইন ও ভার্চ্যুয়াল যোগাযোগের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
নৌকাডুবির পর উদ্ধার করা পরিবারের সদস্যদের প্রথমে কোস্ট গার্ডের কক্সবাজার স্টেশনে নেওয়া হয়েছিল। পরে তাঁদের দেখভালের দায়িত্ব নেয় জেলা প্রশাসন। ক্ষতিগ্রস্ত নৌযানটি এখনো কোস্ট গার্ডের হেফাজতে রয়েছে। নৌযান থেকে উদ্ধার করা কিছু জিনিসপত্র পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
আগেও বিপদে পড়েছিল পরিবারটি
পরিবারটির সমুদ্রযাত্রা নিয়ে আগে থেকেই উদ্বেগ ছিল বলে জানিয়েছে কোস্ট গার্ড। কোস্ট গার্ড পূর্ব জোনের গণমাধ্যম কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজনের ভাষ্য, নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকি বিবেচনায় পরিবারটিকে সমুদ্রযাত্রা থেকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছিল। গত ১ মার্চ তাদের প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা নির্দেশনাও দেওয়া হয়।
কোস্ট গার্ডের এই কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, এপ্রিল মাসে বৈরী আবহাওয়ার মধ্যে মহেশখালী চ্যানেল অতিক্রমের সময় ‘আইল্যান্ড গার্ল’ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরে পরিবারটি সোনাদিয়ায় আশ্রয় নিলে রাতে দুর্বৃত্তরা তাদের ওপর হামলা চালায়। এ সময় অর্থ, মুঠোফোন, পাসপোর্ট, পোশাকসহ বিভিন্ন মালামাল লুট করা হয়।
১০ এপ্রিল কোস্টগার্ড পরিবারটিকে উদ্ধার করে। অভিযান চালিয়ে অধিকাংশ মালামালও উদ্ধার করা হয়। পরে নৌযানটি ডকইয়ার্ডে নিয়ে মেরামত করা হয়েছিল।
বাঁকখালীতে পড়ে আছে ‘আইল্যান্ড গার্ল’
নৌযানটির নির্মাণপদ্ধতি সম্পর্কে স্থানীয় জেলে আবদুর রহমান বলেন, দুটি কাঠের নৌযান জোড়া দিয়ে ‘আইল্যান্ড গার্ল’ তৈরি করা হয়েছিল। বড় ঢেউয়ের ধাক্কায় সংযোগস্থল বিচ্ছিন্ন হয়ে একটি অংশ দ্রুত ডুবে যায়। কয়েক মিনিটের মধ্যে অন্য অংশটিও তলিয়ে যায়।
নুনিয়াছড়ার বিআইডব্লিউটিএ জেটির বিপরীতে বাঁকখালী নদীতে এখনো ডুবন্ত অবস্থায় পড়ে আছে ‘আইল্যান্ড গার্ল’। যে নৌযানকে ঘিরে জন এডওয়ার্ডের পরিবারের বিশ্বভ্রমণের পরিকল্পনা ছিল, সেটি এখন তাঁদের কাছে এক অপূর্ণ স্বপ্নের স্মারক।
একসময় ৪ জনকে নিয়ে পৃথিবী ঘুরে দেখার যে স্বপ্ন শুরু হয়েছিল কক্সবাজারে, তার শেষ স্মৃতি হয়ে রইল বাঁকখালী নদীতে পড়ে থাকা ‘আইল্যান্ড গার্ল’।