| বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | প্রিন্ট | ১৮ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে
নীতিমালা লঙ্ঘন করে সোনালী ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দেওয়া বাড়তি দুই উৎসাহ বোনাসের অর্থ ফেরত নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। ২০২৩ সালের পারফরম্যান্সের জন্য নিয়মিত ৩টির বাইরে আরও দুটি বোনাস দেওয়া হয়েছিল। এর পরিমাণ প্রায় ১১৬ কোটি টাকা।
দেড় বছর আগে অর্থ ফেরতের নির্দেশ দেওয়া হলেও এখনো তা আদায় করতে পারেনি ব্যাংক কর্তৃপক্ষ।
গত ১১ সেপ্টেম্বর সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) শওকত আলী খানকে এ বিষয়ে চিঠি দিয়েছে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। এতে ২০২৩ সালের পারফরম্যান্সের জন্য ৫টি উৎসাহ বোনাস দেওয়ার বিষয়ে অসম্মতি জানিয়ে নীতিমালাবহির্ভূতভাবে দেওয়া বাড়তি দুই বোনাসের অর্থ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছ থেকে আদায় করে সমন্বয়ের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সোনালী ব্যাংক সূত্র গণমাধ্যমকে জানিয়েছে, ব্যাংকটিতে প্রায় ২১ হাজার ৫০০ কর্মকর্তা-কর্মচারী বোনাস পেয়েছেন। নিয়মিত ৩টির পাশাপাশি তাদের আরও দুটি উৎসাহ বোনাস দেওয়া হয়। প্রতিটি বোনাসের অর্থ সাধারণত এক মাসের মূল বেতনের সমান।
ব্যাংকটির একজন শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তা জানান, একটি বোনাসের পরিমাণ প্রায় ৬০ কোটি টাকা। সেই হিসাবে বাড়তি দুই বোনাসের মোট অর্থ প্রায় ১১৬ কোটি টাকা।
এর আগে ২০২৫ সালের ২৭ মার্চও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ সোনালী ব্যাংকের এমডিকে চিঠি দিয়ে নীতিমালাবহির্ভূতভাবে দেওয়া বাড়তি দুই বোনাসের অর্থ ফেরত নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল। তবে ওই নির্দেশের পরও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছ থেকে অর্থ আদায় করে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেওয়ার ব্যবস্থা করেনি ব্যাংক কর্তৃপক্ষ।
আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, ২০২৩ ও ২০২৫ সালের কোনো নীতিমালাতেই সোনালী ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ৫টি উৎসাহ বোনাস নেওয়ার সুযোগ ছিল না। অথচ ২০২৩ সালের পারফরম্যান্সের জন্য তাদের ৫টি বোনাস দেওয়া হয়েছে।
ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দুই দিন পর ৭ আগস্ট সোনালী ব্যাংকের তৎকালীন এমডি ও সিইও আফজাল করিমকে অবরুদ্ধ করে একশ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারী। তাদের দাবি ছিল, বছরে ৫টি উৎসাহ বোনাস দিতে হবে। তবে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের নির্দেশনা অনুযায়ী তিনটির বেশি বোনাস দেওয়ার সুযোগ ছিল না।
বোনাসের দাবিতে আন্দোলনের একপর্যায়ে ২০ আগস্ট পদত্যাগ করতে বাধ্য হন ব্যাংকটির তৎকালীন চেয়ারম্যান জিয়াউল হাসান সিদ্দিকী। এর আগে তার নেতৃত্বাধীন পরিচালনা পর্ষদ চাপের মুখে নীতিমালাবহির্ভূতভাবে ৫টি উৎসাহ বোনাস অনুমোদন করে। এ নিয়ে নিরীক্ষা আপত্তিও ওঠে। বাংলাদেশ ব্যাংকও এই বোনাস দেওয়ার বিষয়ে সম্মতি দেয়নি।
বোনাস দেওয়ার পর সোনালী ব্যাংক তা অনুমোদনের জন্য আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে আবেদন করে এবং নীতিমালা লঙ্ঘনের জন্য ক্ষমাও চায়। তবে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ নিজেদের নীতিমালা লঙ্ঘন করে ৫টি বোনাস অনুমোদন করেনি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শনেও বিষয়টি উঠে আসে। ২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বরভিত্তিক একটি পরিদর্শন প্রতিবেদন তৈরির পর ২০২৫ সালের ১১ মার্চ সোনালী ব্যাংকের এমডিকে চিঠি দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এতে বলা হয়, ২০২৩ সালের জন্য ৫টি উৎসাহ বোনাস বাবদ ২৯০ কোটি টাকা পরিশোধ করেছে সোনালী ব্যাংক। একই সঙ্গে ২০২৪ সালের জন্য ৪০০ কোটি টাকা সংস্থান রাখা হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানায়, সোনালী ব্যাংকের নিজস্ব উৎসাহ বোনাস নীতিমালাতেও ৩টির বেশি বোনাস দেওয়ার সুযোগ নেই। এরপরও ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট অনুষ্ঠিত ব্যাংকের ৮৭০তম পর্ষদ সভায় ৫টি বোনাস দেওয়ার প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের চিঠি অনুযায়ী, ওই অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল শর্তসাপেক্ষে। ভবিষ্যতে কোনো ধরনের নিরীক্ষা বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ থেকে আপত্তি উঠলে বাড়তি অর্থ ফেরত দিতে হবে—এমন শর্তে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছ থেকে ব্যক্তিগত অঙ্গীকারনামাও নেওয়া হয়েছিল।
এ বিষয়ে সোনালী ব্যাংকের এমডি ও সিইও শওকত আলী খান গণমাধ্যমকে বলেন, ‘৫ বোনাসের সিদ্ধান্তটি আমি এ ব্যাংকে যোগ দেওয়ার আগেই নেওয়া হয়েছে। যেকোনোভাবেই হোক, টাকা যেহেতু পরিশোধ করা হয়ে গেছে, সেহেতু আমরা সরকারকে তা মেনে নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছি। নতুন করে আবার একই অনুরোধ জানাব।’
এদিকে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে উৎসাহ বোনাস দেওয়ার ক্ষেত্রে নতুন নিয়ম চালু করেছে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। ২০২৫ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর জারি করা নতুন নির্দেশিকায় রাষ্ট্রমালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংক, তফসিলি বিশেষায়িত ব্যাংক, অ-তফসিলি বিশেষায়িত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের উৎসাহ বোনাস দেওয়ার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সূচকে মূল্যায়ন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
ফলে সোনালী, অগ্রণীসহ ছয় রাষ্ট্রমালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বোনাস দেওয়ার আগে ৫টি সূচক মূল্যায়ন করতে হবে। এগুলো হলো চলতি মূলধনের ওপর নিট মুনাফার হার, আমানতের পরিমাণ বৃদ্ধির হার, ঋণ ও অগ্রিমের পরিমাণ বৃদ্ধির হার, শ্রেণিকৃত ঋণ থেকে নগদ ও সমন্বয়ের মাধ্যমে আদায়ের হার এবং অবলোপনকৃত ঋণ থেকে নগদ আদায়ের হার।
তথ্যসূত্র: প্রথম আলো