সামসুদ্দীন চৌধুরী | শনিবার, ২৮ অগাস্ট ২০২১ | প্রিন্ট | ৭ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে
চট্টগ্রাম ভিত্তিক শিল্প গ্রুপ কবির স্টিল রি-রোলিং মিলস লিমিডেটের (কেএসআরএম) সীতাকুণ্ড ভাটিয়ারী এলাকার শিপব্রেকিং ইয়ার্ড থেকে সাম্প্রতিক এমটি মেডান নামের একটি জাহাজ জব্দ করেছে বাংলাদেশ নৌ পুলিশ।
জাহাজটির মুলত মালিক ছিলেন সিঙ্গাপুরের ডায়া মেরিন (প্রাঃ) লিমিটেড। ২০২০ সালের ৫ নভেম্বর আইনি স্মারকলিপি চুক্তিতে ৮২ লাখ মার্কিন ডলারে জাহাজটি ক্রয় করেছেন কুক দ্বীপের পতাকাতে নিবন্ধিত ৯০০২২০৭ নং আইএমও অরিন এনার্জি ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড নামের মালয়েশিয়ার একটি সংস্থা। যাদের রেজিষ্ট্রেশন নং-এলএল ১৪৫১৪। আইনগতভাবে সকল প্রক্রিয়া শেষে সংস্থাটি ডায়া মেরিন (প্রাঃ) লিমিটেড এর সিঙ্গাপুরের আরএইচবি ব্যাংকের ০০০০১৭৬১০২৫১২০০ নং অ্যাকাউন্টে আরএইচবি মালয়েশিয়া কুয়ালালামপুর শাখা থেকে ২০ লাখ মার্কিন ডলার ও স্থানান্তরিত করেছে অরিন এনার্জি ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড।
শর্তানোযায়ী একই মাসের ১৫ নভেম্বর মালয়েশিয়ার লিংগি বন্দরে জাহাজি সংস্থাটি কাছে হস্তান্তরের কথা ছিল। তবে টাকা পরিশোধ করে জালিয়াতির শিকার হয় সংস্থাটি।
অরিন এনার্জি ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড এর নির্বাহী পরিচালক ডন লয়েড বাদি হয়ে সিঙ্গাপুর পুলিশের কাছে মামলা দায়ের করে। আন্তর্জাতিক মামলা নং- orin/medan/210521. মামলার সকল কপি প্রতিবেদকের হাতে আসলে পর্যালোচনা করে দেখা যায়।
অরিন এনার্জি ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড এর ২০ লাখ মার্কিন ডলার টাকা মেরে দিতে সিঙ্গাপুরের ইউএন নিবন্ধিত সংস্থা ডায়া মেরিন (প্রাঃ) লিমিটেড ও পানামা সিটির পানামানিয়াম কর্পোরেশনের একটি প্রতিষ্ঠান দয়ানুয়ান হোল্ডিংস কর্পোরেশন এই জালিয়াতির আশ্রয় নেয়। এবং তারা জাহাজটি স্ক্রাপিংয়ের জন্য বাংলাদেশের শিল্প গ্রুপ কেএসআরএম এর কাছে হস্তান্তর করে।
M.T. MEDAN জাহাজটির নাম পরিবর্তন করে M.T. MED করেন তারা এবং জাল কাগজপত্র তৈরি করে জাহাজটি বাংলাদেশে নিয়ে আসে কেএসআরএম। মেসার্স কবির স্টিল লিমিটেড বাংলাদেশ সরকারের মার্কেন্টাইল মেরিন অফিসকে ভুল তথ্য দিয়ে জাহাজটি স্ক্রাপিং এর জন্য বিচিং অনুমতির আবেদন করে চলতি বছরের ২০ জুন। একই দিনে ১৮.১৭.১৫০০.১০৫.৯৯.০০৩.২১ নং স্বারক সংক্রান্ত বিচিং অনুমতি দেয় মার্কেন্টাইল মেরিন অফিসের প্রিন্সিপাল অফিসার। এর আগে ১৬ জুন ৩৬.০০.০০০০.০৬১.১৬.১২২.২১-৪৭৮ নং স্বারকে জাহাজটিকে সমুদ্রে যাওয়ার অনুমতি দেয় শিল্প মন্ত্রণালয়।
অবৈধ ভাবে মেসার্স কবির স্টিল লিমিটেড কে জাহাজটি প্রদানের জন্য ১৬ নভেম্বর অরিন এনার্জি ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডকে জাহাজ মেরামত ও ক্রু পরিবর্তনের জন্য ইন্দোনেশিয়ায় বন্দরে অবস্থান করার মিথ্যা তথ্য দেয় ডায়া মেরিন (প্রাঃ) লিমিটেড। এদিকে আফ্রিকার পোলাও গিয়ে এমটি মেডান জাহাজটি অবৈধ ভাবে পানামার দায়ান হোল্ডিংস লিমিটেড মালিকানা পরিবর্তন করে কেএসআরএম কে হস্তান্তর করেন। সিঙ্গাপুর ইন্টারন্যাশনাল আরবিট্রেশন সেন্টারের মামলায় পানামার দায়ান হোল্ডিংস লিমিডেটকেও আসামি করা হয়।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, চোরাই জাহাজ বাংলাদেশ এ স্ক্রাপিং এর জন্য এনে বিশ্বে বাংলাদেশের সুনাম ক্ষুণ্ন ও দেশ থেকে শিপিং ব্যাবসা ব্যবসা ধ্বংস করতে আন্তর্জাতিক চক্রান্তে লিপ্ত হয়েছে কেএসআরএম।
ডায়া মেরিন এর জাহাজ নিয়ে কেএসআরএম গ্রুপের তথ্য লুকোচুরি করায় আন্তর্জাতিকভাবে দেশের ভাবমূর্তি প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।
সূত্র বলছে, গত ৩০ জুন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল এর ৪৪৪২ নং স্বারক মূলে এমটি মেডান জাহাজটি অবস্থান ও জাহাজটি আটক করার জন্য নৌ পুলিশ কে নির্দেশনা দেয় আদালত। একই সাথে সুপ্রিম কোর্টের সহকারী রেজিস্ট্রার কাজী আরাফাত উদ্দিন কে জাহাজটি বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে সর্বাত্মক সহযোগিতা করার নির্দেশ দেয়া হয়। নির্দেশনা অনুযায়ী গত ৪ জুলাই নৌ পুলিশের চট্টগ্রাম অঞ্চলের পুলিশ সুপার নৌ পুঃ চঃ অঃ/অপরাধ/২০২১/১৪৭৫ নং স্বারক মূলে চট্টগ্রাম সীতাকুণ্ড কুমিরা নৌ পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জকে নির্দেশনা দেয়।
গত ৯ জুলাই জাহাজটির অবস্থান নিশ্চিত হয়ে নৌ পুলিশের একটি টিম সীতাকুণ্ড এলাকায় কেএসআরএম এর খাজা শিপব্রেকিং ইয়ার্ডে অভিযন চালিয়ে এমটি মেডান জাহাজটি জব্দ করে। বর্তমানে জাহাজটি ভাটিয়ারী ইউনিয়ন পরিষদ তত্বাবধানে গ্রাম পুলিশের পাহারায় রাখা হয়েছে।
নৌ-অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, এমটি মেডন জাহাজটি গত ৩ জুন বাংলাদেশে জলসীমায় পৌঁছায়। এরপর মার্কেন্টাইল মেরিন অফিসের প্রিন্সিপাল অফিসার ক্যাপ্টেন গিয়াস উদ্দিন ২০ জুন জাহাজটি স্ক্রাপিং এর জন্য বিচিং অনুমতি দিলেও পরবর্তীতে তা বাতিল করে কেএসআরএম এর প্রতারণার বিষয়টি উল্লেখ করে শিপিং মাস্টারকে চিঠি দেন। চিঠিতে তিনি অনাপত্তি সনদ বাতিল করার অনুরোধ করে। এমনকি চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেন অবৈধ জাহাজ বাংলাদেশে প্রবেশে করায় বহির্বিশ্বে দেশের সুনাম ক্ষুণ্ন হয়েছে।
নৌ-পুলিশের চট্টগ্রাম অঞ্চলের পুলিশ সুপার মো. মোমিনুল ইসলাম প্যাসেঞ্জার ভয়েসকে বলেন, আদালতের অ্যারেস্ট ওয়ারেন্ট পেয়ে আমরা জাহাজটি ৯ জুলাই কেএসআরএম এর খাজা শিপব্রেকিং ইয়ার্ড থেকে জব্দ করে ভাটিয়ারী ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান নাজিম উদ্দিনের জিম্মায় দেওয়া হয়েছে। এবং কেএসআরএম কে আদালতের পরবর্তী নির্দেশনা না আসা পর্যন্ত এই জাহাজের সকল কার্য বন্ধ রাখার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
মেসার্স কবির স্টিল লিমিটেড এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মেহেরুল করিম প্যাসেঞ্জার ভয়েসকে বলেন, আমরা যে জাহাজটি কিনেছি সেটা M.T. MED জাহাজ, আদালতে মামলা চলছে M.T. MEDAN জাহাজ নিয়ে, আমাদের বিষয়ে কোন মামলা হয়নি। M.T. MED জাহাজটি মালিক কে ছিলেন, কোন প্রতিষ্ঠান থেকে জাহাজটি কেএসআরএম কিনেছে প্রতিবেদকের এমন প্রশ্নে তিনি জাহাজটি মালিকের কোন তথ্য দিতে রাজি হয়নি। তবে এই শীর্ষ কর্মকর্তা স্বীকার করেছে যে দায়া মেরিন (প্রাঃ) লিমিটেড থেকে কেএসআরএম কোন জাহাজ কিনেনি। ওই প্রতিষ্ঠানকেও ছিনেন না তিনি। এছাড়া মার্কেন্টাইল মেরিন অফিস যে বিচিং অনুমতি দিয়েছে সে আদেশটি বহাল রয়েছে এটি বাতিল হয়নি। তবে সাময়িক স্থগিত করেছে বলে স্বীকার করেন মেহেরুল করিম।