| মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | প্রিন্ট | ১৮ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে
জ্বালানি তেলের দাম বাড়লেই বাসভাড়া বাড়ানোর দাবি ওঠে, কখনো কখনো ভাড়া বাড়েও। এটিই দেশের গণপরিবহনে বিশেষ করে বাসের ক্ষেত্রে যেন নিয়মিত চিত্র। এবারও এর ব্যতিক্রম হয়নি। ২০ সেপ্টেম্বর রাতে ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রোল ও অকটেনের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়িয়েছে সরকার। দাম বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গেই দাবি উঠেছে গণপরিবহনে ভাড়া বাড়ানোর। আবার সরকার বাসভাড়া বাড়ানোর ঘোষণা না দিলেও এরই মধ্যে কোথাও কোথাও বাড়তি ভাড়া আদায় করা হচ্ছে।
সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) থেকেই জ্বালানি তেলের নতুন দাম কার্যকর হয়েছে। এর মধ্যেই বাসভাড়া পুনর্নির্ধারণের দাবি জানিয়ে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি। এ দাবিতে সোমবার সন্ধ্যায় বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) সঙ্গে বৈঠকও করেছে তারা। বৈঠকে দূরপাল্লার বাস ও মহানগরের বাসে কিলোমিটারপ্রতি ২০ পয়সা ভাড়া বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।
ওই প্রস্তাবের তথ্যমতে, বাস মালিকদের প্রস্তাব অনুযায়ী আন্তঃজেলা বাসের ভাড়া কিলোমিটারপ্রতি ২ টাকা ২৩ পয়সা থেকে বেড়ে ২ টাকা ৪৩ পয়সা এবং নগর বাসের ভাড়া ২ টাকা ৫৩ পয়সা থেকে বেড়ে ২ টাকা ৭৩ পয়সা হবে।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাস পরিচালনার ব্যয়ের অন্যতম বড় উপাদান জ্বালানি। ফলে ডিজেলের দাম বাড়লে বাসের পরিচালন ব্যয় বাড়বে—এটি স্বাভাবিক। কিন্তু একটি বাসের মোট ব্যয় শুধু ডিজেলের ওপর নির্ভর করে না। চালক-শ্রমিকের বেতন, মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ, টায়ার-টিউব, যন্ত্রাংশ, ফিটনেস, কর, বিমা, টার্মিনাল ও ব্যবস্থাপনা ব্যয়সহ নানা খরচ রয়েছে। ভাড়া নির্ধারণে এসব বিষয়ও মাথায় রাখতে হয়। আর প্রতিবারই তেলের দাম বাড়লে তা বিবেচনায় রাখে বিআরটিএ।
যদিও ওই পরিস্থিতি সামাল দিতে জ্বালানি তেলের দাম কমানোর দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি। সংগঠনটির সংশ্লিষ্টরা জানান, বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম এখন নিম্নমুখী। এ অবস্থায় জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো অযৌক্তিক। সরকারের উচিত, তেলের দাম না বাড়িয়ে জ্বালানি খাতে ভর্তুকি দেওয়া।
এবার বাসভাড়া বেশি বাড়ানোর প্রস্তাব
গত এপ্রিলেও জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়। তখন ডিজেলের দাম ১৫ টাকা বাড়িয়ে ১১৫ টাকা করা হয়। এরপর ২৩ এপ্রিল বাসভাড়া কিলোমিটারপ্রতি ১১ পয়সা বাড়ানো হয়। তখন ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরে ভাড়া ২ টাকা ৪২ পয়সা থেকে ২ টাকা ৫৩ পয়সা এবং দূরপাল্লার বাসে ২ টাকা ১২ পয়সা থেকে ২ টাকা ২৩ পয়সা করা হয়। অর্থাৎ তখন ডিজেলের দাম ১৫ টাকা বাড়লেও ভাড়া বেড়েছিল কিলোমিটারে ১১ পয়সা।
এবার ডিজেলের দাম আরও ২০ টাকা বেড়েছে। সেই তুলনায় কিলোমিটারে ২০ পয়সা ভাড়া বাড়ানোর প্রস্তাব এসেছে। অর্থাৎ জ্বালানির দাম বৃদ্ধির সঙ্গে ভাড়া বৃদ্ধির একটি সরাসরি সম্পর্ক ধরে হিসাব করা হচ্ছে।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির অতিরিক্ত মহাসচিব এ এস এম আহমেদ খোকন জাগো নিউজকে বলেন, ‘জ্বালানির দাম প্রতি লিটারে ১ টাকা বাড়লে বাসভাড়া কিলোমিটারে ১ পয়সা বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছি আমরা। সে হিসাবে লিটারে ২০ টাকা বাড়লে কিলোমিটারে ২০ পয়সা ভাড়া বাড়বে।’
তিনি বলেন, ‘জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে পরিবহন পরিচালনা খরচ বেড়ে যায়। এর সঙ্গে ভাড়া সমন্বয় করা না হলে মালিকদের লোকশান গুনতে হয়। তাই পরিবহন মালিক সমিতি যৌক্তিক ভাড়া বাড়ানোর দাবি জানিয়েছে। আজ মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) সরকার ভাড়ার বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করতে পারে।’
মালিকদের দাবি ও বিআরটিএ’র প্রস্তাব
এবারের বৈঠকের আগে পরিবহন মালিকদের পক্ষ থেকে আরও বেশি ভাড়া বাড়ানোর দাবি ছিল। সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানা গেছে, মালিকপক্ষ কিলোমিটারপ্রতি অন্তত ৪০ পয়সা বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত বিআরটিএ’র ভাড়া সমন্বয় কমিটি অর্ধেক ২০ পয়সা বাড়ানোর সুপারিশ করেছে। বিআরটিএ’র এই সুপারিশ আজ মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। আজ বিকেল বা আগামীকাল বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) প্রজ্ঞাপন জারি করতে পারে সরকার।
যদিও সরকারের প্রজ্ঞাপনের আগেই গতকাল (২১ সেপ্টেম্বর) থেকে রাজধানীর বিভিন্ন রুটে নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে ৫ থেকে ২০ টাকা বেশি নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। যাত্রীদের অভিযোগ, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাসভাড়া বাড়িয়ে দিয়েছেন পরিবহন শ্রমিকেরা। গতকাল সোমবার থেকেই প্রায় সব বাসে একই নিয়মে ভাড়া নেওয়া হচ্ছে। এ নিয়ে পরিবহন শ্রমিকদের সঙ্গে যাত্রীদের বাগবিতণ্ডা হচ্ছে। জ্বালানির সঙ্গে সমন্বয় করে দ্রুত একটি যৌক্তিকভাড়া নির্ধারণ করতে হবে।
ডেমরার স্টাফ কোয়ার্টার থেকে মিরপুর-১০ এ চলাচল করে আলিফ পরিবহন। গতকাল সোমবার সন্ধ্যায় এই রুটের যাত্রীদের কাছ থেকে ১০ টাকা করে বেশি ভাড়া নিতে দেখা গেছে।
ওই রুটে নিয়মিত যাতায়াত করেন মিরপুর-১০ এর বাসিন্দা হাবিব রাসেল। তিনি বলেন, ‘ডেমরা স্টাফ কোয়ার্টার থেকে মিরপুর-১০ দূরত্ব আনুমানিক ১৫ কিলোমিটার। বর্তমান সরকারি হারে ভাড়া হওয়ার কথা প্রায় ৩৮ টাকা। কিন্তু আগ থেকেই তারা ৪০ টাকা ভাড়া নিচ্ছে। আর সোমবার জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় এখন ৫০ টাকা করে ভাড়া নিচ্ছে। কেউ প্রতিবাদ করলে বাগবিতণ্ডা হচ্ছে। অথচ বিআরটিএ এখনো কোনো বাসের ভাড়া নির্ধারণ করে দেয়নি।’
আলিফ পরিবহনের চালক ফারুক মিয়া বলেন, ‘তেলের দাম বাড়ায় গাড়ির খরচ বাড়ছে। ভাড়া ৫-১০ টাকা বেশি না নিলে খাবো কী? তবে স্বল্প দূরত্বের সর্বনিন্ম ভাড়া ১০ টাকাই রাখা হচ্ছে। শুধু দূরের যাত্রী যারা তাদের ভাড়া কিছুটা বাড়ছে।’
নারায়ণগঞ্জের সাইনবোর্ড থেকে ঢাকার উত্তরা (আব্দুল্লাহপুর) রুটে চলাচল করে ইকবাল এন্টারপ্রাইজের এসি বাস। এ বাসে গতকাল থেকে ভাড়া ১০ থেকে ২০ টাকা বেড়েছে। অর্থাৎ, বাড্ডা লিংকরোড কাউন্টার থেকে উত্তরা পর্যন্ত আগে ৯০ টাকা ভাড়া ছিল; কিন্তু গতকাল থেকে ১১০ টাকা করে নিতে দেখা গেছে। যদিও বিআরটিএ এসি বাসের ভাড়া নির্ধারণ করে দেয় না। এসি বাসের মালিকেরাই নিজেদের মতো ভাড়া বাড়িয়ে নিচ্ছেন।
উত্তরা হাউজ বিল্ডিংয়ে ইকবাল পরিবহনের টিকিট বিক্রি করেন শাকিব। তিনি জানান, তার কোম্পানি গতকাল সব গন্তব্যে ২০ টাকা করে ভাড়া বাড়ানোর নির্দেশনা দিয়েছে। শুধু নতুন বাজার থেকে উত্তরা বা সাইনবোর্ড পর্যন্ত ১০ টাকা করে ভাড়া বাড়ানো হয়েছে। সে অনুযায়ী আমরা যাত্রীদের থেকে ভাড়া বেশি নিচ্ছি।
পরে ইকবাল এন্টারপ্রাইজের অফিসের মোবাইল নম্বরে একাধিকবার কল দিলেও তারা রিসিভ করেনি। এছাড়া বিআরটিএ’র চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হাবীবুর রহমানের মুঠোফোনে কল দিলেও তিনি রিসিভ করেননি।
জানতে চাইলে ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির দপ্তর সম্পাদক কাজী জোবায়ের মাসুদ জাগো নিউজকে বলেন, ‘বাসভাড়া বাড়ানোর বিষয়ে এখনো বিআরটিএ থেকে কোনো নির্দেশনা পাইনি। এর বাইরে যাত্রীদের কাছ থেকে বেশি ভাড়া নেওয়ার সুযোগ নেই। আমরা বিষয়টি খোঁজ নিচ্ছি।’
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, ‘সংকট মোকাবিলায় দেশের মানুষের পাশে দাঁড়ানোর পরিবর্তে দায়িত্ব গ্রহণের ৭ মাসের মাথায় ২ দফা জ্বালানির দাম বাড়িয়েছে নতুন সরকার। এ কারণে যাতায়াত, যোগাযোগ, পণ্য ও যাত্রী পরিবহনসহ শিল্প উৎপাদনে ভাড়া ও মূল্য উসকে দিয়েছে। এমন গণবিরোধী সিদ্ধান্ত থেকে ফেরত এসে জরুরি ভিত্তিতে জ্বালানি তেলের বর্ধিতমূল্য প্রত্যাহার করে পূর্বের মূল্য বহাল রাখতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘সরকার জনস্বার্থে কোথাও ব্যবসা করবে, কোথাও ভর্তুকি দেবে- এটাই বাস্তবতা। দেশের চরম আর্থিক সংকটের এই মুহূর্তে জ্বালানি খাতে ভর্তুকি দিয়ে দেশের অর্থনীতি সচল রাখা, মূল্যস্ফীতি কমানোর মধ্যদিয়ে দেশের সংকটাপন্ন জনগণের পাশে থাকা সরকারের দায়িত্ব।’ সূত্র জাগো নিউজ