| বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | প্রিন্ট | ৩৮ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে
ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে থার্ড টার্মিনাল চালু হলে যাত্রী ব্যবস্থাপনা ও উড়োজাহাজ পরিচালনার সক্ষমতা বাড়বে।
একই সঙ্গে বাড়বে ফ্লাইটের চাপ। কিন্তু একটি মাত্র রানওয়ে ও সীমিত পার্কিং সক্ষমতার কারণে নতুন টার্মিনালের বাড়তি সুবিধা পুরোপুরি কাজে লাগানো নিয়ে তৈরি হয়েছে শঙ্কা। বর্তমানে রানওয়ে ব্যস্ত থাকায় উড্ডয়নের আগে ৩০-৪০ মিনিট এবং অবতরণের আগে ২০-৩০ মিনিট পর্যন্ত উড়োজাহাজকে অপেক্ষা করতে হচ্ছে। টার্মিনাল চালুর পর ফ্লাইট সংখ্যা বাড়লে এ সংকট আরো তীব্র হতে পারে। সেক্ষেত্রে শাহজালাল বিমানবন্দরকে আঞ্চলিক এভিয়েশন হাব হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগও বাধার মুখে পড়তে পারে। একই সঙ্গে নতুন টার্মিনাল হলেও উড়োজাহাজ পার্কিং সুবিধায় এ অঞ্চলের অন্য বিমানবন্দরগুলোর তুলনায় অনেকটাই পিছিয়ে থাকছে ঢাকা।
ভারতের ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর (দিল্লি) কর্তৃপক্ষের তথ্য বলছে, সেখানে ২১০টি ফিজিক্যাল বে রয়েছে। পাশাপাশি ‘মাল্টিপল অ্যাপ্রন র্যাম্প সিস্টেম’-এর দুটি কোড-সি স্ট্যান্ডসহ মোট স্ট্যান্ডের সংখ্যা ২৪০। সিঙ্গাপুরের চাঙ্গি বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, সেখানে ১১১টি কন্টাক্ট ও ৭৮টি রিমোট স্ট্যান্ড রয়েছে। সম্প্রসারণকাজ শেষ হলে এ সংখ্যা ২০০ ছাড়িয়ে যাবে। অন্যদিকে ১২০টি পার্কিং বে থাকার পরও থাইল্যান্ডের সুবর্ণভূমি বিমানবন্দরে উড়োজাহাজ পার্কিংয়ের ওপর চাপ রয়েছে। বড় উড়োজাহাজের নির্ধারিত স্ট্যান্ড ও অ্যাপ্রন সংস্কারসহ বিভিন্ন কারণে সেখানে পার্কিং ব্যবস্থাপনায় চ্যালেঞ্জ তৈরি হচ্ছে। এর বিপরীতে শাহজালাল বিমানবন্দরে বর্তমানে উড়োজাহাজ পার্কিং বে রয়েছে ২১টি। থার্ড টার্মিনাল চালু হলে আরো ৩৭টি পার্কিং বে যুক্ত হবে। সব মিলিয়ে পার্কিং বের সংখ্যা হবে ৫৮।
জাতীয় পতাকাবাহী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস ২০৩৫ সালের মধ্যে বহরে উড়োজাহাজের সংখ্যা ৪৭টিতে উন্নীত করার পরিকল্পনা নিয়েছে। এরই মধ্যে বোয়িংয়ের সঙ্গে ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি করেছে বিমান। প্রথম উড়োজাহাজটি ২০৩১ সালের নভেম্বরে এবং বাকিগুলো ২০৩৫ সালের অক্টোবরের মধ্যে আসার কথা। এয়ারবাসও বিমানকে ১০টি উড়োজাহাজের প্রস্তাব দিয়েছে, যা সংস্থাটি বর্তমানে মূল্যায়ন করছে।
পরিকল্পনাধীন এসব উড়োজাহাজ বহরে যুক্ত হওয়ার পর ঢাকায় সেগুলো পার্কিংয়ে কোনো সমস্যা হবে না বলে জানিয়েছেন বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কাইজার সোহেল আহমেদ। তিনি বলেন, ‘নতুন উড়োজাহাজগুলোর হ্যাঙ্গার ও পার্কিংয়ের জন্য আমাদের এখানে পর্যাপ্ত জায়গা রয়েছে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে আরো হ্যাঙ্গার তৈরি ও কারিগরি সক্ষমতা বৃদ্ধির পরিকল্পনাও আমাদের রয়েছে।’
বেসরকারি খাতের ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনস ২০২৭ সালের মধ্যে বোয়িং থেকে ২১টি উড়োজাহাজ ভাড়ায় আনার ঘোষণা দিয়েছে। বর্তমানে এয়ারলাইনসটির বহরে ২৫টি উড়োজাহাজ রয়েছে। ঢাকাকে প্রধান হাব হিসেবে ব্যবহার করছে ইউএস-বাংলা। এছাড়া নভোএয়ার এবং এয়ার অ্যাস্ট্রার ফ্লাইটগুলোও শাহজালাল বিমানবন্দরকেন্দ্রিক। অন্যদিকে ঢাকায় বর্তমানে প্রায় ৩০টি বিদেশী এয়ারলাইনস নিয়মিত যাত্রী ও কার্গো ফ্লাইট পরিচালনা করছে।
সব মিলিয়ে বর্তমানে শাহজালালে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৩০০ উড়োজাহাজ উড্ডয়ন ও অবতরণ করে। জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, শাহজালালে দৈনিক উড়োজাহাজ চলাচল ২০২৫ সালে ৩৮১টি, ২০৩০ সালে ৪৫১টি এবং ২০৩৫ সালে ৫৪৮টিতে দাঁড়াতে পারে।
এমন প্রেক্ষাপটে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পার্কিং সক্ষমতা উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, থার্ড টার্মিনাল অ্যাপ্রনে ৩৭টি উড়োজাহাজ রাখার ব্যবস্থা থাকলেও এটিকে পুরো বিমানবন্দরের উড়োজাহাজ পরিচালনার সক্ষমতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বাস্তবে কতটি উড়োজাহাজ পরিচালনা করা যাবে, তা রানওয়ে, ট্যাক্সিওয়ে, অ্যাপ্রন, পার্কিং ও উড়োজাহাজের টার্নঅ্যারাউন্ড সময়ের ওপর নির্ভর করবে।
এ বিমানবন্দরের রানওয়ের সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি পার্কিং সংকট মোকাবেলায় ব্যবস্থাপনার ওপরও জোর দেয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন এয়ারএশিয়া ও কুয়েত এয়ারলাইনসের জেনারেল সেলস এজেন্ট প্রতিষ্ঠান টোটাল এয়ার সার্ভিসেস লিমিটেডের (টাস গ্রুপ) চেয়ারম্যান কেএম মজিবুল হক। তিনি বলেন, ‘অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও উড়োজাহাজের টার্নঅ্যারাউন্ড টাইম কমিয়ে বিমানবন্দরের সক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব। আধুনিক গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং ও স্লট ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যবর্তী ভৌগোলিক সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে ঢাকাকে শক্তিশালী ট্রানজিট সেন্টারে রূপান্তর করা সম্ভব। পাশাপাশি রাতে অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটগুলো চট্টগ্রাম বা সিলেটে পার্কিংয়ের ব্যবস্থা করলে ঢাকার পার্কিং সংকট অনেকটাই দূর হবে।’
তিনি আরো বলেন, ‘থার্ড টার্মিনাল পুরোপুরি চালু হলে শাহজালালের বার্ষিক যাত্রী পরিবহন সক্ষমতা ২ কোটি ২০ লাখে পৌঁছাবে, যার অন্তত ১ কোটি ৫০ লাখ যাত্রী বর্তমান রানওয়ে দিয়েই দক্ষ ব্যবস্থাপনায় পরিবহন করা সম্ভব। তবে আগামী ১০ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে বর্তমান রানওয়ের কার্যকারিতা শেষ হয়ে আসবে। তাই দীর্ঘমেয়াদে নতুন একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নির্মাণের পরিকল্পনা এখন থেকেই নেয়া জরুরি।’
দিনের বেলা শাহজালাল বিমানবন্দরের রানওয়ের ব্যস্ততা আরো বেড়ে যায়। আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ রুটে ফ্লাইট পরিচালনাকারী একাধিক এয়ারলাইনস কর্মকর্তার তথ্য অনুযায়ী, একটি ফ্লাইট গেট ছাড়ার পর উড্ডয়ন পর্যন্ত গড়ে ৩০-৪০ মিনিট সময় লাগছে। অন্যদিকে ‘অ্যারাইভাল কনজেশনের’ কারণে অবতরণের আগে উড়োজাহাজকে গড়ে ২০-৩০ মিনিট অতিরিক্ত সময় আকাশে থাকতে হচ্ছে। এতে যাত্রীদের বিড়ম্বনার পাশাপাশি এয়ারলাইনসগুলোর পরিচালন ব্যয়ও বাড়ছে।
এমন প্রেক্ষাপটে রানওয়ের সীমাবদ্ধতা কমাতে বিদ্যমান অবকাঠামোর সর্বোচ্চ ব্যবহারের ওপর জোর দিয়েছেন বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর সাবেক উইং কমান্ডার ও এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ এটিএম নজরুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘রানওয়ে কনজেশন আসছে, এটা সত্য। হঠাৎ করে নতুন একটি বিমানবন্দর বা রানওয়ে তৈরি করা সম্ভব নয়। কিন্তু বিদ্যমান রানওয়েটিকে কীভাবে আরো স্মার্টভাবে ব্যবহার করা যায়, সেই পরিকল্পনাও তো দেখতে পাচ্ছি না। এখন যে সক্ষমতা আছে, তার চেয়ে আরো ২০ থেকে ২৫ শতাংশ সক্ষমতা কীভাবে বাড়ানো যায়, সেটাও চিন্তা করতে হবে।’
বাড়তি চাপ সামলাতে একটি বিকল্প রানওয়ে নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)। তবে এটি স্বাধীন রানওয়ে হবে না; বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা হবে। থার্ড টার্মিনাল চালু হওয়ার পর এর নির্মাণকাজ শুরুর পরিকল্পনা রয়েছে। উদ্যোগটি এখনো পরিকল্পনাধীন এবং বাস্তবায়নে কয়েক বছর সময় লাগতে পারে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
এটিএম নজরুল ইসলাম মনে করেন, শাহজালালকে আঞ্চলিক এভিয়েশন হাব করতে শুধু অবকাঠামো তৈরি যথেষ্ট নয়। তার মতে, সরকারের কাজ অবকাঠামো তৈরি করা, আর হাব গড়ে তোলার দায়িত্ব এয়ারলাইনসগুলোর। বিভিন্ন আঞ্চলিক গন্তব্য থেকে যাত্রী এনে বাংলাদেশকে ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে ব্যবহার করে দূরবর্তী গন্তব্যে নেয়ার সক্ষমতা এয়ারলাইনসগুলোকে তৈরি করতে হবে। এজন্য উপযোগী বহর, রুট পরিকল্পনা, বিপণন, বাণিজ্যিক ও পরিচালন কৌশল প্রয়োজন। পাশাপাশি ট্রানজিট যাত্রীদের স্বাচ্ছন্দ্যে অবস্থান, ইমিগ্রেশন ও প্রয়োজনে অন-অ্যারাইভাল ভিসার মতো সুবিধাও নিশ্চিত করতে হবে।
এদিকে থার্ড টার্মিনালের ভবন নির্মাণ শেষ হলেও এর সঙ্গে যুক্ত কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ এখনো বাকি রয়েছে বলে গতকাল জাতীয় সংসদে জানিয়েছেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত। এসব কাজ শেষ করে টার্মিনাল চালু করতে আরো ৯০২ কোটি টাকা প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন তিনি। অর্থ বরাদ্দের জন্য পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।
সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য সুলতানা আহমেদের প্রশ্নের জবাবে বিমানমন্ত্রী জানান, টার্মিনাল ভবন নির্মাণ করা হলেও কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ শেষ হয়নি এবং আনা যন্ত্রপাতির সমন্বয়ের কাজও বাকি রয়েছে। জাইকার অর্থায়নে নির্মিত এ প্রকল্পের ঋণের একটি কিস্তি হিসেবে বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর প্রায় ১ হাজার ১০০ কোটি টাকা পরিশোধ করেছে। দ্রুত টার্মিনাল চালু না হলে প্রায় ২ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ অব্যবহৃত পড়ে থাকবে।
তিনি আরো বলেন, ‘থার্ড টার্মিনালের “অপারেশনাল রেডিনেস অ্যান্ড এয়ারপোর্ট ট্রান্সফার” (ওআরএটি) কার্যক্রমের প্রায় ৫৭ শতাংশ শেষ হয়েছে। বাকি কাজ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ করার চেষ্টা চলছে।
সূত্র বণিক বার্তা