| রবিবার, ০৪ অক্টোবর ২০২৬ | প্রিন্ট | ২৯ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে
দেশে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে বেসরকারি পর্যায়ে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি ও বিতরণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। বেসরকারি পর্যায়ে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির খসড়া নীতিমালা তৈরির নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।
কিন্তু বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) অনাগ্রহ ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় শুরুতেই থমকে গেছে খসড়া নীতিমালা প্রণয়নের প্রক্রিয়া।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ বিপিসিকে চার দিনের মধ্যে বেসরকারি জ্বালানি আমদানি নীতিমালার খসড়া তৈরি করে জমা দেওয়ার কথা বললেও প্রায় দুই মাসেও নীতিমালা তৈরি করতে পারেনি সরকারি সংস্থাটি।
ফলে দেশের জ্বালানির চাহিদা মেটানো, রিজার্ভের ওপর চাপ কমানো এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতে সরকারের করা পরিকল্পনা বাস্তবায়ন নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। জ্বালানি তেলের একক ক্রেতা ও বিক্রেতা হচ্ছে বিপিসি।
সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে চুক্তির মাধ্যমে অপরিশোধিত তেলের পুরোটা আমদানি করা হয়। এছাড়াও পরিশোধিত জ্বালানি তেল সাতটি দেশ থেকে আমদানি করা হয়।
বিভিন্ন দেশের সরকারি-বেসরকারি কোম্পানি নির্দিষ্ট চুক্তি ও দরপত্রের মাধ্যমে চাহিদা অনুযায়ী তেল সরবরাহ করে বিপিসিকে।
ইরান যুদ্ধ শুরু হলে দেশে সরাসরি এর প্রভাব পড়ে। যুদ্ধ শুরুর পরপরই হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যায় এবং পরে বাব আল-মান্দেব প্রণালি দিয়ে তেলবাহী জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়ে। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের জ্বালানির ডিপোগুলোতে ব্যাপক ক্ষতির কারণে জ্বালানি তেল আমদানি অনিশ্চিত হয়ে যায়। জ্বালানি তেলের সংকটও দেখা দেয় দেশে। সরকারের ব্যাপক কূটনৈতিক তৎপরতায় পরিস্থিতি উন্নতি হলেও এখনো শঙ্কা কাটেনি। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের মতো জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতে দেশেও বেসরকারি পর্যায়ে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির সুযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার।
গত ৬ আগস্ট জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ থেকে বিপিসির চেয়ারম্যানকে ‘বেসরকারি পর্যায়ে পরিশোধিত জ্বালানি আমদানি, সংরক্ষণ, পরিবহন, বিতরণ ও বিপণন নীতিমালা, ২০২৬’ এর খসড়া তৈরির নির্দেশনা দিয়ে চিঠি পাঠানো হয়।
চিঠিতে বলা হয়, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে বেসরকারি পর্যায়ে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি, সংরক্ষণ, পরিবহন, বিতরণ ও বিপণণের জন্য একটি নীতিমালা করা প্রয়োজন। এজন্য চিঠিতে ১০ আগস্টের মধ্যে খসড়া জমা দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়, কিন্তু খসড়া নীতিমালা তৈরির নির্দিষ্ট সময়ের প্রায় দুই মাস হতে চললেও তা জমা দিতে পারেনি বিপিসি। ফলে নীতিমালা তৈরি এবং বেসরকারি পর্যায়ে জ্বালানি আমদানি ও বিতরণের সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি এখনো থমকে আছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, ২০১৪ সালেও বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জন্য ফার্নেস অয়েল আমদানির বিরোধিতা করেছিল বিপিসি। পরবর্তীতে সরকারের চাপে বাধ্য হয়ে অনুমতি দেওয়ার ফলে বর্তমান গ্যাস সংকটের মধ্যেও তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো চালানো সম্ভব হচ্ছে এবং লোডশেডিং কম হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, এবারও বিপিসি এ বিষয়ে নিষ্ক্রিয় রয়েছে কারণ, বেসরকারি খাত যুক্ত হলে বিপিসির তেল আমদানির পুরোনো সিন্ডিকেট ভেঙে পড়বে। নিজেদের স্বার্থেই বিপিসির কর্মকর্তারা বেসরকারি পর্যায়ে প্রতিযোগিতায় যেতে চান না।
অভিযোগ রয়েছে, বিগত সরকারের আমলে বিপিসির মাধ্যমে জ্বালানি তেল সরবরাহের প্রায় ৮০ শতাংশই এক ব্যক্তির নিয়ন্ত্রণে ছিল। বিপিসিতে ১১টি তালিকাভুক্ত কোম্পানির মধ্যে ৬টিরই স্থানীয় এজেন্ট তার প্রতিষ্ঠান।
জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, হরমুজ প্রণালি ঘিরে সংকটের সময় বিপিসির মজুত সক্ষমতার দুর্বলতা দৃশ্যমান হয়েছিল। এ ছাড়া সরকারি প্রতিষ্ঠানে বিপুল বিনিয়োগের প্রয়োজন থাকায় বিপিসির পক্ষে এককভাবে পর্যাপ্ত মজুত গড়ে তোলা কঠিন। এখানে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের যুক্ত করা গেলে সরকারের ওপর আর্থিক চাপ কমবে, কর্মসংস্থান বাড়বে। এলপিজি নিয়ে সরকার কোনো আর্থিক চাপ নেই। এমনকি যুদ্ধের মধ্যে এলপিজির সরবরাহ ব্যবস্থায় কোনো সংকট হয়নি।
বেসরকারি জ্বালানি আমদানি নীতিমালা তৈরি বর্তমানে কোন পর্যায়ে আছে জানতে চাইলে জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের (অপারেশন অনুবিভাগ) যুগ্মসচিব মনির হোসেন চৌধুরী এ বিষয়ে বলেন, বেসরকারি জ্বালানি আমদানি নীতিমালা তৈরি এখনো কোন পর্যায়ে নাই, এটা আমার এখনো শুরু করতে পারি নাই। আমরা খসড়া তৈরির জন্য বিপিসিকে দিয়েছি, ওইখান থেকে আমাদের কাছে এখনো আসে নাই, আসলে আমরা জানাতে পারবো।
কবে নাগাদ বেসরকারি জ্বালানি আমদানি নীতিমালা প্রস্তুত হতে পারে জানতে চাইলে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের চেয়ারম্যান (অতিরিক্ত সচিব) ড. মো. রফিকুল ইসলাম বাংলানিউজকে বলেন, বেসরকারি জ্বালানি আমদানি নীতিমালার তৈরির কাজ চলমান রয়েছে, আমরা পরীক্ষা নিরীক্ষা করে দেখছি, কাজ শেষ হলে আমরা মন্ত্রণালয়ে জমা দেব।
জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বলেন, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে বেসরকারি পর্যায়ে জ্বালানি আমদানি, সংরক্ষণ, পরিবহন এবং বিক্রয় নীতিমালা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। সে জন্য বিপিসিকে একটি খসড়া নীতিমালা তৈরি করে জমা দেওয়ার জন্য সময় বেঁধে দেওয়া হয়। কিন্তু এখনো তাদের কাছ থেকে খসড়া নীতিমালা পাওয়া যায়নি।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বেসরকারি পর্যায়ে জ্বালানি তেল আমদানির অনুমতি দিলে প্রতিযোগিতা বাড়বে। দেশে বিনিয়োগ হবে, রিজার্ভের ওপর চাপ কমবে। শক্তিশালী অর্থনীতির জন্য বেসরকারি বিনিয়োগের কোনো বিকল্প নেই। জ্বালানি তেল আমদানিতে বেসরকারি খাতকে সুযোগ দেওয়া দরকার। এতে সরকারের ওপর চাপ কমবে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন বলেন, বর্তমানে বিপিসির পরিধি এতটা বড় হয়ে গেছে যে, তাদের একার পক্ষে সব সেবা সঠিকভাবে দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। এতে দুর্নীতির সুযোগ তৈরি হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে সুনির্দিষ্ট বিশ্লেষণের মাধ্যমে বেসরকারি খাতকে যুক্ত করা যেতে পারে।
তিনি আরও বলেন, প্রতিযোগিতা তৈরি বা নিজেদের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ কমার ভয়ে বিপিসি হয়তো ইতস্তত করছে। এর আগে বিদ্যুৎ খাতেও (পিডিবি) বেসরকারি খাতকে আনার সময় একই ধরনের গড়িমসি করেছিল। ভারত যদি ঝুঁকি সামলে সফল হতে পারে, তাহলে বাংলাদেশেও এটি চেষ্টা করে দেখা যেতে পারে।
দক্ষিণ এশিয়ার ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কায় বেসরকারি খাতে জ্বালানি তেল আমদানির অনুমতি রয়েছে। ভারতে পেট্রোলিয়াম আমদানিতে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ অত্যন্ত শক্তিশালী।
জ্বালানি বিভাগের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বেসরকারি পর্যায়ে জ্বালানি তেল আমদানি ও বিতরণে বেসরকারি খাত যুক্ত হলে সরকারের ওপর থেকে ভর্তুকির চাপ কমবে এবং এটি নীতিগতভাবে ভালো সিদ্ধান্ত হতে পারে। তবে আগে একটা স্পষ্ট নীতিমালা, সঠিক গাইডলাইন থাকা দরকার। সূত্র বাংলানিউজ