| মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | প্রিন্ট | ২৫ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে
নৈতিক স্খলনের অভিযোগে সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে দল থেকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত জানিয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য জাতীয় সংসদের স্পিকার ও নির্বাচন কমিশনকে চিঠি দিয়েছিল জামায়াতে ইসলামী। কিন্তু তাঁর সংসদ সদস্যপদ শূন্য ঘোষণার বিষয়ে স্পিকার বা কমিশনকে কিছু বলেনি জামায়াত। এই অবস্থায় স্পিকার যদি নির্বাচন কমিশনকে বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য চিঠি না দেয়, তাহলে তাঁর সদস্যপদ হারাতে হবে না।
সংসদ সচিবালয় সূত্র বলছে, জামায়াত যদি গাজী নজরুলের সংসদ সদস্যপদ শূন্য ঘোষণার আবেদন করে, তাহলে বিষয়টি নিষ্পত্তি ও শুনানির জন্য ইসিতে পাঠাবেন স্পিকার। জামায়াত এ ধরনের কোনো উদ্যোগ না থাকলে স্পিকার আপাতত ইসিতে চিঠি পাঠাবেন না।
রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে ন্যাম ভবনে গাজী নজরুলের ফ্ল্যাট থেকে গত রোববার তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম খাতুনের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় মরিয়মের বাবার করা আত্মহত্যার প্ররোচনার মামলায় গতকাল সোমবার নজরুল ও তাঁর প্রথম স্ত্রীকে রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ। এরপর নজরুলের সংসদ সদস্যপদের কী হবে, সেই আলোচনা আবার সামনে এসেছে।
গাজী নজরুল ইসলাম জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী হিসেবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সাতক্ষীরা-৪ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। গত জুলাইতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর সঙ্গে মরিয়মের ব্যক্তিগত মুহূর্তের একাধিক ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। তবে পরে গাজী নজরুলের পক্ষ থেকে মরিয়মকে তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী বলে জানানো হয়।
ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর এ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়। এরপর জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে জানানো হয়, দলের পক্ষ থেকে তদন্তে গাজী নজরুলের নৈতিক স্খলনের প্রমাণ মিলেছে। এই অপরাধে তাঁকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। এই তথ্য জানিয়ে গত ২৩ জুলাই জাতীয় সংসদের স্পিকার ও নির্বাচন কমিশনকে চিঠি দিয়েছিল জামায়াত।
তবে শুধু ওই চিঠির কারণে গাজী নজরুলের সংসদ সদস্যপদ শূন্য হবে না বলে মনে করেন সংসদবিষয়ক গবেষক অধ্যাপক নিজাম উদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, সংসদ সচিবালয় যদি নির্বাচন কমিশনকে না বলে, তাহলে বিষয়টি অমীমাংসিত থেকে যাবে।
সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাজনৈতিক দলের প্রার্থী হিসেবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর দল থেকে পদত্যাগ করলে বা সংসদে দলের বিপক্ষে ভোট দিলে তাঁর আসন শূন্য হবে। আর সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদে বলা আছে, ৭০ অনুচ্ছেদ অনুসারে কোনো সংসদ সদস্যের আসন শূন্য হবে কি না, সে সম্পর্কে কোনো বিতর্ক দেখা দিলে শুনানি ও নিষ্পত্তির জন্য প্রশ্নটি নির্বাচন কমিশনের কাছে পাঠানো হবে, এ ক্ষেত্রে কমিশনের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হবে।
নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ গতকাল সাংবাদিকদের জানান, গাজী নজরুলের বিষয়ে এখনো সংসদ থেকে কোনো চিঠি পাননি তাঁরা, চিঠি পেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবেন।
সংসদ সচিবালয় সূত্র জানায়, জামায়াতের চিঠিতে গাজী নজরুলকে দল থেকে বহিষ্কারের বিষয়টি অবহিত করা হয়েছিল। একই সঙ্গে তাঁর বিরুদ্ধে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হলেও সদস্যপদ খারিজ করার বিষয়ে কিছু বলা হয়নি। ফলে স্পিকারের কার্যালয় এ বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না।
জানতে চাইলে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও হুইপ রফিকুল ইসলাম খান আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘আমরা আমাদের কাজ করেছি। বাকিটা স্পিকার ও সরকারের দায়িত্ব।’
জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি বলেন, দল থেকে বহিষ্কারের পরেও সংবিধানের ৭০(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সদস্য পদ যাবে না। পদত্যাগ ও নৈতিক স্খলনজনিত অপরাধে কমপক্ষে দুই বছর সাজা হলে সদস্যপদ শূন্য হবে। এর বাইরে সদস্যপদ যাওয়ার পথ নেই।
দল বহিষ্কার করলেও সংবিধান অনুযায়ী গাজী নজরুলের সংসদ সদস্যপদ শূন্য হবে না বলে জানিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ড. শরীফ ভূঁইয়া।
অষ্টম জাতীয় সংসদের সদস্য আবু হেনাকে বিএনপি বহিষ্কার করলেও তিনি সংসদের বাকি মেয়াদ স্বতন্ত্র সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। দশম জাতীয় সংসদের সদস্য আবদুল লতিফ সিদ্দিকীকে আওয়ামী লীগ প্রাথমিক সদস্যপদসহ বহিষ্কার করে তাঁর আসন শূন্য করতে স্পিকারকে চিঠি দেয়। এরপর স্পিকার বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য ইসিকে চিঠি দেন। ইসি লতিফ সিদ্দিকীকে শুনানিতে ডাকলে তিনি আদালতে রিট করেন। রিট খারিজের পর সংসদে পদত্যাগের ঘোষণা দিয়ে স্পিকারের কাছে নিজেই পদত্যাগপত্র জমা দেন। এরপর তাঁর আসন শূন্য হয়।
এর আগে ১৯৯৮ সালে বিএনপির তৎকালীন সংসদ সদস্য হাসিবুর রহমান স্বপন দলত্যাগ না করে আওয়ামী লীগের মন্ত্রিসভার উপমন্ত্রী হয়েছিলেন। পরে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে স্পিকার হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীকে চিঠি দিয়েছিল বিএনপি। কিন্তু স্পিকার নিষ্পত্তির জন্য ইসিতে চিঠি দেননি। স্পিকারের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আদালতে যায় দলটি। পরে আদালতের নির্দেশে শুনানির জন্য ইসিতে পাঠানো হয়েছিল বিষয়টি। শুনানি শেষে তাঁর আসন শূন্য ঘোষণা করা হয়।