|

Advertise with us

সাত মাস ধরে এলএনজি সরবরাহ বন্ধ রেখেছে এক্সিলারেট এনার্জি

ডেস্ক রিপোর্ট   |   সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬   |   প্রিন্ট   |   ১৯ বার পঠিত   |   পড়ুন মিনিটে

সাত মাস ধরে এলএনজি সরবরাহ বন্ধ রেখেছে এক্সিলারেট এনার্জি

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত ও হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বিঘ্নের কারণে বাংলাদেশে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহ বন্ধ রেখেছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠান এক্সিলারেট এনার্জি। গত মার্চের শুরু থেকে সরবরাহ বন্ধ রাখা কম্পানিটি সর্বশেষ এ মেয়াদ বাড়িয়ে নভেম্বর পর্যন্ত নির্ধারণ করেছে।

এতে দেশের চলমান গ্যাসসংকট মোকাবেলায় এলএনজি সরবরাহ নিশ্চিত করার প্রচেষ্টা আরো চাপে পড়েছে।
বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ করপোরেশনের (পেট্রোবাংলা) ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এক্সিলারেট এনার্জি মার্চের শুরুতে ফোর্স মেজর ঘোষণা করে সরবরাহ বন্ধ করে দেয়। এরপর কয়েক দফায় এর মেয়াদ বাড়িয়েছে মার্কিন প্রতিষ্ঠানটি, যার সর্বশেষ সময়সীমা নভেম্বর পর্যন্ত।’

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে বাংলাদেশে এলএনজি সরবরাহের জন্য পেট্রোবাংলার সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি বিক্রয় ও ক্রয় চুক্তি (এসপিএ) রয়েছে এক্সিলারেট এনার্জির।

২০২৩ সালের ৮ নভেম্বর দুই পক্ষের মধ্যে এ চুক্তি সই হয়। চুক্তি অনুযায়ী, ২০২৬ সাল থেকে ১৫ বছর বাংলাদেশে এলএনজি সরবরাহ করার কথা কম্পানিটির।
পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা জানান, চুক্তি অনুযায়ী ২০২৬ ও ২০২৭ সালে প্রতিবছর ১২টি করে এলএনজি কার্গো সরবরাহের কথা। ২০২৮ থেকে ২০৪০ সাল পর্যন্ত প্রতিবছর সরবরাহের পরিমাণ হবে ১৬টি কার্গো।

চুক্তিতে এলএনজির দাম নির্ধারণের পদ্ধতিও উল্লেখ রয়েছে। এতে ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের তিন মাসের গড় দামের ১৩.৩৫ শতাংশের সঙ্গে প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিটের (এমএমবিটিইউ) জন্য ০.৩০ ডলার নির্দিষ্ট প্রিমিয়াম যোগ করে দাম নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে।

দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন কমছে, বাড়ছে আমদানিনির্ভরতা : দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে কমে যাওয়ায় জ্বালানি নিরাপত্তায় আমদানিনির্ভরতা বাড়ছে। গত ছয় বছরে জাতীয় গ্রিডে দেশীয় কূপ থেকে গ্যাসের সরবরাহ কমেছে প্রায় ৩৪ শতাংশ। বিপরীতে ঘাটতি পূরণে আমদানীকৃত এলএনজির সরবরাহ বেড়েছে প্রায় ৪৩ শতাংশ।

বর্তমানে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা মোট গ্যাসের প্রায় ৩৮ শতাংশই আসছে এলএনজি থেকে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আশঙ্কা, দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো না গেলে ২০৩০ সালের মধ্যে মোট গ্যাস সরবরাহে এলএনজির অংশ ৬০ থেকে ৭০ শতাংশে পৌঁছতে পারে। তখন উচ্চমূল্যের এলএনজি আমদানির ব্যয় সামাল দেওয়া কঠিন হবে। এতে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়ার পাশাপাশি বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি ও শিল্প খাতের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

পেট্রোবাংলার গ্যাস সরবরাহের তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০২০ সালের ১ অক্টোবর দেশীয় কূপ থেকে দৈনিক দুই হাজার ৪৪৭ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়েছিল। চলতি বছরের ১ অক্টোবর তা কমে দাঁড়ায় এক হাজার ৬২০ মিলিয়ন ঘনফুটে। বিপরীতে, এ সময়ে এলএনজি সরবরাহ ৭০২ মিলিয়ন ঘনফুট থেকে বেড়ে এক হাজার তিন মিলিয়ন ঘনফুট হয়েছে। এতে ছয় বছরের ব্যবধানে এলএনজি সরবরাহ বেড়েছে প্রায় ৪৩ শতাংশ। ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ বাড়ার পাশাপাশি সরকারের ভর্তুকির বোঝাও ভারী হচ্ছে।

এলএনজি আমদানিতে ব্যয় পৌনে তিন লাখ কোটি টাকা : দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন কমে যাওয়ার প্রভাব পড়ছে এলএনজি আমদানিতে। পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮-১৯ থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত আট অর্থবছরে এলএনজি আমদানিতে ব্যয় হয়েছে প্রায় দুই লাখ ৭৭ হাজার ৪৫২ কোটি টাকা। একই সময়ে এলএনজিতে সরকারকে ভর্তুকি দিতে হয়েছে ৫১ হাজার ৩৬৬ কোটি টাকা।

যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে আন্তর্জাতিক বাজারেও এলএনজির দাম বেড়েছে। চলতি বছরের শুরুতে প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজি ১০ থেকে ১২ ডলারে কেনা হলেও সেপ্টেম্বরে দাম বেড়ে প্রায় ৩০ ডলারে উঠেছিল। অর্থাৎ কয়েক মাসের ব্যবধানে দাম বেড়েছিল প্রায় তিন গুণ।

কাতার থেকে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় এলএনজি সরবরাহ বন্ধ থাকায় স্পট মার্কেটের ওপর বাংলাদেশের নির্ভরতা বেড়েছে। এতে চলতি অর্থবছরের প্রথম আড়াই মাসেই এলএনজি খাতে ভর্তুকি দিতে হয়েছে ১০ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। অথচ পুরো বছরের জন্য বরাদ্দ ছিল সাড়ে ছয় হাজার কোটি টাকা। এর বাইরে গত সাড়ে ছয় মাসে নির্ধারিত ভর্তুকির বাইরে পেট্রোবাংলার অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে আরো ১৭ হাজার ৪০০ কোটি টাকা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এলএনজি আমদানিতে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয়ের ফলে দেশের রিজার্ভের ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্প খাতে গ্যাস সরবরাহ অব্যাহত রাখতে সরকারকে বড় অঙ্কের ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম বাড়লে এই চাপ আরো তীব্র হয়।

চাহিদার তুলনায় গ্যাসের ঘাটতি দেড় হাজার মিলিয়ন ঘনফুটের বেশি : বর্তমানে দেশে গ্যাসের মোট চাহিদা চার হাজার মিলিয়ন ঘনফুটের বেশি। গত সোমবার জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হয়েছে দুই হাজার ৫৫৩ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। এর মধ্যে এলএনজি থেকে এসেছে ৯৬০ মিলিয়ন ঘনফুট। অর্থাৎ মোট সরবরাহের প্রায় ৩৮ শতাংশই আমদানীকৃত গ্যাস।

বিপুল ব্যয়ে এলএনজি আমদানি ও হাজার হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দেওয়ার পরও দেশে প্রতিদিন দেড় হাজার মিলিয়ন ঘনফুটের বেশি গ্যাসের ঘাটতি থাকছে। এতে শিল্প, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও আবাসিক খাতে জ্বালানিসংকট দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে।

আশঙ্কা করা হচ্ছে, দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো না গেলে ২০৩০ সালের মধ্যে এলএনজির ওপর নির্ভরতা ৬০ থেকে ৭০ শতাংশে পৌঁছতে পারে। তখন আমদানির এই ব্যয় সামাল দেওয়া বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত কঠিন হবে।

দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে জোর দেওয়ার তাগিদ : অর্থনীতিবিদ ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্বল্প ও মধ্যম মেয়াদে এলএনজি প্রয়োজনীয় হলেও দীর্ঘ মেয়াদে এটি জ্বালানিসংকটের স্থায়ী সমাধান নয়। আমদানিনির্ভরতা কমাতে নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান, স্থল ও সমুদ্রে দ্রুত অনুসন্ধান কার্যক্রম জোরদার, বিদ্যমান ক্ষেত্র থেকে উৎপাদন বাড়ানো এবং জ্বালানির দক্ষ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।

তাঁদের মতে, দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন না বাড়লে ভবিষ্যতে এলএনজি আমদানির ব্যয় আরো বাড়বে। এতে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ, বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, শিল্প খাতের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা হ্রাস এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, দেশে ২০১৮ সালে প্রথমবারের মতো বাণিজ্যিকভাবে এলএনজি আমদানি শুরু হয়। তখন দেশীয় গ্যাসের ঘাটতি পূরণে এটি ছিল পরিপূরক ব্যবস্থা। কিন্তু কয়েক বছরের ব্যবধানে এলএনজি জাতীয় জ্বালানি ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান ভরসায় পরিণত হয়েছে। দেশীয় উৎপাদন কমতে থাকায় প্রতিবছর বাড়ছে এলএনজি আমদানি এবং সেই সঙ্গে বাড়ছে সরকারের ভর্তুকির বোঝা।

Advertise with us
Advertise with us
সাত মাস ধরে এলএনজি সরবরাহ...
সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬
পদ্মা নদী থেকে অবৈধ বালু...
সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬
আরও
Advertise with us

ফলো করুন Passenger Voice-এর খবর

Editor and Publisher
SAMSUDDIN CHOWDHURY
Dhaka Office
  • 26 Delwar Complex, Tikatuli, Wari, Bangladesh.
Chittagong Office
  • 35 Kadam Mobarak By-Lane, Jashim Bhaban (4th Floor), Momin Road, Chittagong.
Contact