সায়েদাবাদ টার্মিনাল ইজারায় সিডিউল কারচুপির অভিযোগ

Passenger Voice    |    ০৮:০৪ পিএম, ২০২১-০৮-০৩


সায়েদাবাদ টার্মিনাল ইজারায় সিডিউল কারচুপির অভিযোগ

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) মালিকানাধীন সায়েদাবাদ আন্তঃজেলা বাস টার্মিনালের বাৎসরিক ইজারা প্রত্যাশী সব পক্ষের কাছে দরপত্র বিক্রি না করার অভিযোগ উঠেছে।

অভিযোগে বলা হয়েছে, একটি প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দিতে সংস্থাটির মহাব্যবস্থাপক (পরিবহন) কোথাও সিডিউল দেননি। এমনকি নিজের কার্যালয় থেকেও পছন্দের প্রতিষ্ঠান ছাড়া অন্য কারও কাছে সিডিউল বিক্রি করেননি। ইজারা প্রত্যাশী একজন বিষয়টি নিয়ে লিখিতভাবে মেয়র বরাবর অভিযোগও করেছেন। খবর বাংংলা ট্রিবিউন

এমন অনিয়মের কারণেই পরপর তিনবার দরপত্র আহ্বান করেও কাঙ্ক্ষিত দর না পাওয়া যায়নি। এবারও সরকার নির্ধারিত দরের কাছেও যেতে পারেনি কোনও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।

ডিএসসিসির পরিবহন বিভাগ সূত্র জানায়, গত ২৪ জুন সায়েদাবাদ আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল থেকে টার্মিনাল ফি, টয়লেট, গোসলখানা ব্যবহার (চারটি), গাড়ি ধোয়া ফি ও কুলিমজুুরি আদায় কাজের ইজারাদার নিয়োগে দরপত্র আহ্বান করে ডিএসসিসির মহাব্যবস্থাপক (পরিবহন)। এক বছরের জন্য এই কাজে ৮ কোটি টাকা দর চাওয়া হয়।

গত ১৮ জুলাই ছিল দরপত্রের সিডিউল সংগ্রহের শেষ দিন। এই সময় পর্যন্ত মাত্র দুটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাছে সিডিউল বিক্রি করা হয়। এরমধ্যে সেভেন এলেভেন ঢাকা লিমিটেডের স্বত্বাধিকারী জামাল উদ্দিন আহমেদ পাঁচ কোটি ৩৬ লাখ টাকা দিয়ে সর্বোচ্চ দরদাতা হয়েছে। আর তিন কোটি ৩৩ লাখ টাকা দিয়ে দ্বিতীয় দরদাতা হয়েছেন সাদ্দাম স্টেশনারির নিলয় মাহমুদ। এই দুটি প্রতিষ্ঠানের বাইরে অন্য কোনও প্রতিষ্ঠানের কাছে দরপত্র বিক্রি করা হয়নি।

নিয়ম অনুযায়ী ডিএসসিসির সংশ্লিষ্ট বিভাগ ছাড়াও সকল আঞ্চলিক অফিস ও বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে বিক্রির জন্য দরপত্র পাঠানোর কথা। এতে করপোরেশন দরপত্র বিক্রি থেকে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আয় করতে পারতো। সংশ্লিষ্ট দফতর সূত্র জানিয়েছে কোথাও কোনও সিডিউল পাঠানো হয়নি। আর দফতর থেকে নিজের পছন্দ অনুযায়ী এই দুটি প্রতিষ্ঠানের কাছেই কেবল দরপত্র বিক্রি করা হয়েছে।

অভিযোগ উঠেছে, বাস টার্মিনাল ইজারার সিডিউল সবার জন্য উন্মুক্ত ছিল না এবং একটি চক্রের কারণে এই দরপত্র প্রতিযোগিতাপূর্ণ হয়নি। তাই গত ২৫ জুলাই এই বিষয়টি ডিএসসিসি মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস এবং প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফরিদ আহমেদকে লিখিতভাবে জানিয়েছেন সিডিউল না পাওয়া এক ঠিকাদার। এই ঠিকাদারের অভিযোগ, পত্রিকার বিজ্ঞপ্তিতে লেখা ছিলো, এই দরপত্র সবার জন্য উন্মুক্ত। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। ওই চক্রটির বাইরে কেউ ডিএসসিসির দরপত্রে অংশ নিতে পারে না। 

জানা গেছে, এরই মধ্যে সরকার নির্ধারিত দরের চেয়ে আড়াই কোটি টাকা কমে সেভেন এলেভেন ঢাকা লিমিটেডকে বাস টার্মিনালটি ইজারা দেওয়ার প্রস্ততি নেওয়া হচ্ছে। ইতিমধ্যে তারা ফাইল মেয়রের দফতরে পাঠিয়ে দিয়েছে। মেয়র অনুমোদন দিলে বাকি কাজ সম্পন্ন করা হবে। তবে আইন অনুযায়ী স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় নির্ধারিত ওই দরের চেয়ে কম দরে কার্যাদেশ দেওয়ার সুযোগ নেই। কারণ, বাস টার্মিনাল সার্ভে করেই ওই দর নির্ধারণ করা হয়েছে। আইন অনুযায়ী সরকার নির্ধারিত দর অনুযায়ী কম দারে টার্মিনাল ইজারা দেওয়ার সুযোগ নেই। দিতে হলেও ঊর্ধ্বতন মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন লাগবে।

ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফরিদ আহমেদ বলেন, সায়দাবাদ বাস টার্মিনাল পরপর তিনবার দরপত্র আহ্বান করেও সরকার নির্ধারিত দর পাওয়া যায়নি। এখন আইন অনুযায়ী করণীয় ঠিক করতে মেয়র দফতরে ফাইল পাঠানো হয়েছে। তিনি সিদ্ধান্ত নিবেন, কী করা যায়। অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, বিষয়টি খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

গত ২৪ জুন প্রকাশিত ওই দরপত্র অনুযায়ী সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল ইজারার সিডিউল ঢাকা বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়, ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, ডিএসসিসির হিসাব বিভাগ, পরিবহন বিভাগসহ সব আঞ্চলিক কার্যালয় থেকে বিক্রি করার কথা। কিন্তু ডিএসসিসির পরিবহন বিভাগ তার কোনটিতেই সিডিউল পাঠায়নি বলে জানা গেছে।

সিডিউল বিক্রি নিয়ে কারচুপির অভিযোগে মেয়রকে চিঠি

বাস টার্মিনাল ইজারার সিডিউল না পেয়ে গত ২৫ জুলাই ডিএসসিসি মেয়র ও প্রধান নির্বাহী বরাবর লিখিত অভিযোগ করেছেন এইচ এইচ এন্টারপ্রাইজের মালিক মনির হোসেন। তিনি বলেন, গত ১৮ জুলাই দরপত্র সংগ্রহ করার জন্য সংশ্লিষ্ট সব জায়গায় যাই। কিন্তু কোথাও সিডিউল পাইনি। পরিবহন বিভাগে সিডিউলের জন্য গেলে 'উপরের নির্দেশ' ছাড়া সিডিউল বিক্রি করা যাবে না বলে জানান। উপরের নির্দেশ বলতে তিনি কি বোঝাতে চেয়েছেন তা জানতে চাইলে তিনি জরুরি মিটিং আছে বলে নিজ কক্ষ থেকে বেড়িয়ে যান। সারা দিন অপেক্ষা করেও আর তার দেখা পাওয়া যায়নি।

ঢাকা জেলা প্রশাসনের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) ইলিয়াস মেহেদী বলেন, তার জানা মতে সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল ইজারার সিডিউল তাদের অফিসে দেওয়া হয়নি। একই বিষয়ে জানতে চাইলে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি ডিএসসিসির অঞ্চল-৫ এর আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ সাখাওয়াত হোসেন সরকার।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ডিএসসিসির দুজন কর্মকর্তা ও তিনজন ঠিকাদার জানান, নিজ দফতরে সব সিডিউল জমা রেখেছিলেন পরিবহন বিভাগের মহাব্যবস্থাপক বিপুল চন্দ্র বিশ্বাস। তিনি সিন্ডিকেট করে শুধু তার পছন্দের ওই দুটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে সিডিউল দিয়েছেন। অন্যান্য ঠিকাদারেরা সিডিউল চাইলে তাদের দিব, দিচ্ছি বলে সময় পার করছেন তিনি। এই দরপত্র নিয়ে মোটা অংকের টাকা লেনদেন অভিযোগও করেন তারা।

এসব অভিযোগ অস্বীকার করে পরিবহন বিভাগের মহাব্যবস্থাপক বিপুল চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, সংশ্লিষ্ট সব জায়গায় সিডিউল দেওয়া হয়েছে। যারা বলছে, সিডিউল পায়নি, তারা খোঁজই নেয়নি।

তার দপ্তর থেকে কেনো সবার জন্য সিডিউল বিক্রি উন্মুক্ত ছিল না, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, 'সিডিউল নিতে হলে আগে সিডিউল মূল্য বাবদ নির্ধারিত অর্থ ব্যাংক চালানের মাধ্যমে মেয়র বরাবর জমা দিতে হবে। কিন্তু অন্য ঠিকাদারেরা তা করেননি। তাই তাদের সিডিউল দেওয়া হয়নি। 

যদিও ঠিকাদারদের অভিযোগ ডিএসসিসির উন্মুক্ত দরপত্র বিজ্ঞপ্তির নিয়ম অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে সিডিউল সংগ্রহ করে ব্যাংক চালানের মাধ্যমে অর্থ পরিশোধ করে টেন্ডার ড্রপ করা হয়।