জাপানি বিনিয়োগ: পাঁচ বড় বিনিয়োগ প্রস্তাব স্থবির

Passenger Voice    |    ১০:৫৫ এএম, ২০২১-০৭-০৫


জাপানি বিনিয়োগ: পাঁচ বড় বিনিয়োগ প্রস্তাব স্থবির

সরকারি-বেসরকারি অংশীদারি (পিপিপি) পদ্ধতিতে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে জাপান চার বছর আগে এ দেশে পাঁচটি প্রকল্পে এক হাজার কোটি মার্কিন ডলার বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছিল। বাংলাদেশি মুদ্রায় ওই বিনিয়োগ প্রস্তাবের আকার ৮৫ হাজার কোটি টাকার মতো (প্রতি ডলার ৮৫ টাকা ধরে)। কিন্তু এখনো এসব প্রকল্পের কাজে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি হয়নি। পাঁচটি প্রকল্পেই বর্তমানে প্রাথমিক সমীক্ষার কাজ চলছে। তবে প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের কাজ কবে নাগাদ পুরোদমে শুরু হবে, তা-ও বলতে পারছেন না সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

অন্যদিকে করোনার মধ্যেও জাপান সরকারেরই অর্থায়নে দেশে মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্র, মেট্রোরেল (লাইন ৬), যমুনা নদীর ওপর রেলসেতুসহ অন্তত ৪০টি প্রকল্পের কাজ পুরোদমে এগিয়ে চলছে। নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে জাপানি বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি অর্থনৈতিক অঞ্চলের উন্নয়নকাজও থেমে নেই। অথচ থমকে আছে পিপিপি ভিত্তিতে বাস্তবায়নের জন্য প্রস্তাবিত পাঁচটি প্রকল্প। এর মধ্যে একটি প্রকল্পে বিনিয়োগ করা থেকে জাপানের পিছিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। খবরঃ প্রথম আলো।

জাপান দুই দেশের সরকারি পর্যায়ে পিপিপি পদ্ধতিতে বাস্তবায়নের জন্য ২০১৭ সালের জুনে ওই পাঁচ প্রকল্পে বিনিয়োগের বিষয়ে বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রস্তাব দেয়। প্রকল্পগুলো হচ্ছে গাবতলী থেকে কাঁচপুরের চিটাগাং রোড পর্যন্ত মেট্রোরেল (লাইন ২) নির্মাণ; চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত ১৩৬ কিলোমিটার দুই লেন সড়ককে চার লেনে উন্নীতকরণ; ঢাকা আউটার রিং সড়ক নির্মাণ; কমলাপুর রেলস্টেশনে একটি মাল্টি মডেল হাব স্থাপন এবং ঢাকা বিমানবন্দর রেলওয়ে স্টেশনে একটি মাল্টি মডেল হাব নির্মাণ।

সরকারি প্রকল্পে জাপানি বিনিয়োগের পথ মসৃণ হলে পিপিপি পদ্ধতিতে কাজ কেন এগোচ্ছে না তা প্রথম আলোর পক্ষ থেকে জানতে চাওয়া হয়েছিল পিপিপি কার্যালয়ের সাবেক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) আলকামা সিদ্দিকীর কাছে। জবাবে তিনি বলেন, পিপিপি মডেলে প্রকল্প বাস্তবায়নের নিয়মনীতি ও এর গতি-প্রকৃতি পুরোপুরি আলাদা। সরকারি বিনিয়োগ তুলনামূলক সহজ। কিন্তু পিপিপি প্রকল্পে অনেক কিছু দেখা হয়। টাকা বিনিয়োগ করা ঠিক হবে কি না কিংবা এই বিনিয়োগে লাভ উঠে আসবে কি না, এসব কিছু দেখা হয়। সে জন্য পিপিপি প্রকল্পে এত দেরি হয়। তা ছাড়া বাংলাদেশে পিপিপি পদ্ধতি নতুন। এসব কারণে জাপানের পিপিপিভিত্তিক বিনিয়োগ প্রস্তাবে কাঙ্ক্ষিত সফলতা মেলেনি।

পিপিপি পদ্ধতিতে প্রকল্প বাস্তবায়নে সমস্যার কথা তুলে ধরেন সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা। তাঁরা জানান, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে গিয়ে অনেক সময় অপচয় হয়। সরকারের এক সংস্থার সঙ্গে আরেক সংস্থার সমন্বয়হীনতাও স্পষ্ট। পাশাপাশি সরকারি কর্মকর্তাদের গাফিলতিও রয়েছে।

জাপান-বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (জেবিসিসিআই) সাধারণ সম্পাদক তারেক রাফি ভূঁইয়া বলেন, বাংলাদেশের জন্য এই পাঁচটি প্রকল্প অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু কোথাও না কোথাও কোনো সমস্যা হচ্ছে। এখন পর্যন্ত কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি না হওয়া দুঃখজনক।

প্রস্তাবিত পাঁচ প্রকল্প
মেট্রোরেল (লাইন ২)

গাবতলী থেকে শুরু হয়ে বছিলা-মোহাম্মদপুর, জিগাতলা, সায়েন্স ল্যাবরেটরি, নিউমার্কেট-আজিমপুর, ঢাকা মেডিকেল, গোলাপ শাহ মাজার-বঙ্গভবন-মতিঝিল, আরামবাগ ও কমলাপুর হয়ে কাঁচপুরের চিটাগাং রোড পর্যন্ত ২৪ কিলোমিটার দীর্ঘ মেট্রোরেল হওয়ার কথা। সরকারের অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি ২০১৮ সালের ৮ নভেম্বরে এই প্রস্তাব অনুমোদন করেছে। এটি বাস্তবায়নে প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা। বাস্তবায়িত হলে এই রুটে প্রতি ট্রিপে প্রায় ২৫ হাজার যাত্রী চলাচল করতে পারবে।

ঢাকা মাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের (ডিএমটিসিএল) তথ্য অনুযায়ী, এই প্রকল্প নিয়ে এখন প্রাথমিক সমীক্ষার কাজ চলছে। সমীক্ষার কাজটি করছে মারুবিনি করপোরেশন।

পিপিপি পদ্ধতিতে প্রকল্পে দেরি হওয়া নিয়ে কথা হয় এই প্রকল্পের পরিচালক আবদুল বাকীর সঙ্গে। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, বাংলাদেশ পিপিপির মাধ্যমে প্রকল্প বাস্তবায়নে এখনো যথেষ্ট সক্ষম হয়নি। এখানে পিপিপি সম্পর্কে ধারণাও কম। এই পদ্ধতিতে প্রকল্প বাস্তবায়ন কঠিন। যারা কাজ করবে, তাদের জন্য এটা কতটা লাভজনক, সেটি নিশ্চিত না হয়ে কেউ বিনিয়োগ করতে আসবে না। তবে এই প্রকল্পে অর্থ লগ্নি করতে এখন জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগী সংস্থাকে (জাইকা) আনার চেষ্টা চলছে বলে জানা গেছে।

চট্টগ্রাম-কক্সবাজার সড়ক চার লেন করা
চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত ১৩৬ কিলোমিটার সড়ককে দুই লেন থেকে চার লেনে উন্নীতকরণে আগ্রহ রয়েছে জাপানের। এই প্রস্তাব ২০১৮ সালে অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে অনুমোদন পেয়েছে। এই প্রকল্পেও প্রাথমিক সমীক্ষার কাজ চলছে। সমীক্ষার কাজটি করছে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)। এ বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে সমীক্ষা প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। প্রকল্পটির প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছে ১৫ হাজার কোটি টাকা। কর্মকর্তারা বলছেন, করোনার কারণে সমীক্ষার কাজে সমস্যা হচ্ছে। তাই নির্ধারিত সময়ে সমীক্ষা হচ্ছে না।

ঢাকা আউটার রিং সড়ক
এই প্রকল্পের উদ্দেশ্য হলো, সাভারের হেমায়েতপুর থেকে কালাকান্দি, মদনপুর, বাইপাইল, গাজীপুর হয়ে আবার হেমায়েতপুর পর্যন্ত ১৩০ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণ। এই প্রকল্পের প্রাথমিক খরচ ধরা হয়েছে ২০ হাজার কোটি টাকা। আউটার রিং সড়কটি বাস্তবায়নের কাজ শেষ হলে ঢাকার ভেতরে থাকা বাস টার্মিনালগুলোকে বাইরে রিং রোডের কাছাকাছি স্থানান্তর করা যাবে। এ জন্য গাবতলী, সায়েদাবাদ ও মহাখালীর পরিবর্তে ঢাকার চারপাশে ছয়টি নতুন বাস টার্মিনাল নির্মাণ করতে হবে। এতে ঢাকার ভেতর দিয়ে দূরপাল্লার বাস চলাচল কমবে। তথ্য বলছে, এই প্রকল্পের প্রাথমিক সমীক্ষার কাজই এখনো শুরু হয়নি। প্রস্তাবটি অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভার কমিটিতে অনুমোদন পেয়েছে ২০১৯ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর।

কমলাপুরে মাল্টি মডেল হাব
টোকিও রেলস্টেশনের আদলে কমলাপুর রেলস্টেশনে একটি মাল্টি মডেল হাব নির্মাণের এই প্রস্তাব দেয় জাপান, যেখানে প্রয়োজনীয় সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা থাকবে। কাজটি করতে ১৮টি প্রতিষ্ঠান আগ্রহ দেখিয়েছে। তার মধ্য থেকে পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা করা হয়েছে। পাঁচ প্রতিষ্ঠানকে এখনো আরএফপি (রিকোয়েস্ট ফর প্রপোজাল) দেওয়া হয়নি।

বিমানবন্দর রেলওয়ে স্টেশনে মাল্টি মডেল হাব
ঢাকা বিমানবন্দর রেলওয়ে স্টেশনে মাল্টি মডেল হাব নির্মাণ প্রকল্পের প্রাথমিক সমীক্ষার কাজ এখনো শুরু হয়নি। এখানে জমি পাওয়া নিয়েও জটিলতা আছে।