শিরোনাম
Passenger Voice | ১২:০১ পিএম, ২০২১-০৩-০৬
যাতায়াত সহজ হওয়ায় ও মধ্যবিত্তের সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে গত কয়েক বছরে দেশের বাজারে মোটরসাইকেলের চাহিদা বেড়েছে। প্রতি বছরই এ সংখ্যা বাড়তির দিকে রয়েছে। ফলে মোটরসাইকেল নিবন্ধন থেকে সরকারের রাজস্বের পরিমাণও বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) তথ্য বলছে, গত ১০ বছরে মোটরসাইকেল নিবন্ধন থেকে সরকারের আয় এসেছে ১ হাজার ৩০৭ কোটি ৪০ লাখ টাকা। ৩১ লাখ ৯২ হাজার ৫১১টি মোটরসাইকেল নিবন্ধন থেকে এ আয় করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
বিআরটিএর তথ্য বলছে, গত পাঁচ বছরে গড়ে প্রতি বছর প্রায় চার লাখ মোটরসাইকেল নিবন্ধন হয়েছে। আর গত ১০ বছরে দেশে নিবন্ধিত গাড়ির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৬ লাখ ৪৯ হাজার ৮৮৬। এরমধ্যে মোটরসাইকেলের সংখ্যাই শতকরা ৬৮ দশমিক ৬৫ শতাংশ। ওই সময়ের মোট গাড়ি নিবন্ধন থেকে বিআরটিএর আয় হয়েছে ১০ হাজার ৫ কোটি ৪৭১ লাখ ৫৮ হাজার টাকা।
গত ১০ বছরের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২০১৬ সালে ৩ লাখ ১৫ হাজার ৮৯টি মোটরসাইকেল নিবন্ধন থেকে ২০৮ কোটি ১৩ লাখ ৩১ হাজার ৬১৩ টাকা আয় করেছে বিআরটিএ। ২০১৭ সালে ৩ লাখ ২৫ হাজার ৮৭৬টির বিপরীতে ১৮৫ কোটি ৮৭ লাখ ৫৮ হাজার ১৯৭ টাকা, ২০১৮ সালে ৩ লাখ ৯৩ হাজার ৫৪৫টির বিপরীতে ২৩২ কোটি ৫৮ লাখ ২৭ হাজার ৮৫৫, ২০১৯ সালে ৪ লাখ ১৪ হাজার ৫২টির বিপরীতে ২৫৩ কোটি ৬১ লাখ ৯৪ হাজার ৯৯৯ ও সর্বশেষ ২০২০ সালে ৩ লাখ ১১ হাজার ১৬টি মোটরসাইকেল থেকে ২১০ কোটি ১৯ লাখ ৮৯ হাজার ৭৫১ টাকা আয় হয়েছে। আর চলতি বছরের প্রথম দুই মাসেই নিবন্ধিত মোটরসাইকেলের সংখ্যা ৬৫ হাজার ছাড়িয়ে গেছে।
অন্যদিকে দেশে মোটরসাইকেলের চাহিদা বৃদ্ধি পেলেও ফি বেশি মনে হওয়ায় অনেকেই নিবন্ধন করতে চান না। এতে করে একদিকে সরকার যেমন রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। অন্যদিকে সড়কে বিশৃঙ্খলার ঘটনাও বাড়ছে, যা কখনো দুর্ঘটনায় পরিণত হচ্ছে। এ অবস্থায় সড়কপথে শৃঙ্খলা ফেরানো এবং রাজস্ব বৃদ্ধির লক্ষ্যে সম্প্রতি মোটরসাইকেলের নিবন্ধন ফি কমিয়ে অর্ধেকে নামিয়ে এনেছে বিআরটিএ।
গত ১৯ ফেব্রুয়ারি থেকে বিআরটিএ নতুন এই ফি কার্যকর করেছে। এর ফলে আগে ১০০ সিসি মোটরসাইকেল নিবন্ধন করতে ৪ হাজার ২০০ টাকা এবং ১০০ সিসির উপরের জন্য ৫ হাজার ৬০০ টাকা প্রয়োজন হতো। এখন সেটি যথাক্রমে ২ হাজার ২০০ টাকা ও ৩ হাজার টাকায় করা হয়েছে।
মোটরসাইকেল নিবন্ধন ফি কমানোর যৌক্তিকতা সম্পর্কে বিআরটিএর পরিচালক (নিবন্ধন শাখা) প্রকৌশলী শীতাংশু শেখর বিশ্বাস বলেন, পার্শ্ববর্তী দেশের তুলনায় আমাদের দেশের মোটরসাইকেল নিবন্ধন ফি তুলনামূলক বেশি। ফলে অনেকেই ফির কথা বিবেচনা করে নিবন্ধন করে না। নিবন্ধন ফি কমানোর মূল উদ্দেশ্য হলো, যাতে আরো বেশি গাড়ি নিবন্ধনের আওতায় আসে।
গ্রাহকরাও মনে করছেন, বিআরটিএর এ উদ্যোগের ফলে সড়কে শৃঙ্খলা যেমন ফিরবে, তেমনি রাজস্ব আয়ের পরিমাণও বাড়বে। তাদেরই একজন গাজীপুর জেলার স্থানীয় বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম দীর্ঘ ১০ বছর ধরে মোটরসাইকেল চালাচ্ছেন। তার মতে, মোটরসাইকেল ফি বেশি হওয়ার কারণে অনেকেই নিবন্ধন না করে মোটরসাইকেল চালায়। ফি কমানোর ফলে এ প্রবণতা কমে আসবে।
মোটরসাইকেলের নিবন্ধন ফি কমানোর ফলে রাজস্ব কমে যাবে কিনা এমন প্রশ্নের উত্তরে বিআরটিএর মিরপুর শাখার সহকারী পরিচালক (নিবন্ধন শাখা) প্রকৌশলী মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, বিআরটিএর মূল কাজ হলো সড়কের শৃঙ্খলা বজায় রাখা। তাই রাজস্বের চেয়ে শৃঙ্খলার প্রতি আমরা গুরুত্ব দিই বেশি। তাছাড়া নিবন্ধন ফি কমানোর ফলে বেশি গাড়ি নিবন্ধিত হবে। এতে করে রাজস্বের পরিমাণ আগের চেয়ে আরো বাড়বে।
এদিকে মোটরসাইকেলসহ সব ধরনের গাড়ির নিবন্ধন সহজ করার লক্ষ্যে বিআরটিএ থেকে নিবন্ধনের দায়িত্ব এখন শোরুমের ওপর দেয়া হয়েছে। গাড়ি কেনার সময় শোরুম থেকেই অনলাইনের মাধ্যমে গাড়ি নিবন্ধনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হয়। এতে করে বিআরএটিএর ওপরও চাপ কমে আসছে বলে জানান প্রকৌশলী মো. রফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, প্রতিদিন একেকটি কেন্দ্রে এক-দেড় হাজার গাড়ি নিবন্ধনের চাপ এখন আর নেই। অনলাইন প্রক্রিয়ায় গ্রাহকরা গাড়ি কেনার সঙ্গে সঙ্গেই ভোগান্তিহীন নিবন্ধন করতে পারছেন।
নিবন্ধন ফি কমানোর বিআরএটিএর এ উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে মোটরসাইকেল বিক্রির প্রতিষ্ঠানগুলো। এ বিষয়ে বাংলাদেশ হোন্ডা প্রাইভেট লিমিটেডের মার্কেটিং অ্যান্ড প্রমোশনের বিভাগীয় প্রধান মো. গিয়াস উদ্দিন সজীব বলেন, আমাদের দেশের অধিকাংশ মোটরসাইকেল ক্রেতাই ধার-দেনা করে মোটরসাইকেল কেনেন। নিবন্ধনের জন্য অতিরিক্ত ১৫-২০ হাজার টাকা খরচ করা তাদের পক্ষে কষ্টকর। এক জরিপে দেখা গেছে, উচ্চ ফির কারণে ৬০ শতাংশ মোটরসাইকেল ক্রেতা নিবন্ধনে আগ্রহী হন না।
তবে নিবন্ধন ফির সঙ্গে রোড ট্যাক্স ফিও কমানো দরকার বলে মনে করেন বাংলাদেশ হোন্ডা প্রাইভেট লিমিটেডের এ কর্মকর্তা। তিনি বলেন, পার্শ্ববর্তী দেশের তুলনায় আমাদের দেশে মোটরসাইকেলের আনুষঙ্গিক ফি এখনো অনেক বেশি। বর্তমানে ১০০ সিসির নিচের মোটরসাইকেল দুই বছরের জন্য নিবন্ধন করতে রোড পারমিট এবং অন্যান্য ফিসহ মোট ১৮ হাজার ২৯ টাকা ও ১০০ সিসির বেশি মোটরসাইকেলের জন্য মোট খরচ হবে ১৯ হাজার ৩৫২ টাকা। পুরো প্যাকেজটি ৩-৪ হাজার টাকার মধ্যে আনতে পারলে ৯০ শতাংশের বেশি মোটরসাইকেল রেজিস্ট্রেশনের আওতায় আসবে।
একই ধরনের কথা জানালেন বাংলাদেশ মোটরসাইকেল অ্যাসেম্বেলার্স অ্যান্ড ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিমামা) সাধারণ সম্পাদক বিপ্লব কুমার রয়। তিনি বলেন, নিবন্ধন ফির পাশাপাশি আনুষঙ্গিক অন্যান্য ফিও কমানো জরুরি। এশিয়ার অন্যান্য দেশে পুরো নিবন্ধন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে মোটরসাইকেলের মূল্যের মাত্র ৪ শতাংশ খরচ হয়। কিন্তু আমাদের দেশের নিবন্ধন করতে বাইকের মূল্যের ১২ থেকে ১৫ শতাংশ টাকা গুনতে হয়।
এদিকে সড়কে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা না করেই মোটরসাইকেল নিবন্ধন ফি কমানো ইতিবাচক নয় বলে মনে করেছেন দুর্ঘটনা গবেষকরা। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সড়ক ও দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের (এআরআই) পরিচালক ড. মো. হাদিউজ্জামান বলেন, বাংলাদেশের সড়ক অবকাঠামোর বিশ্লেষণে মোটরবাইকের পরিমাণ অনেক বেশি। এক গবেষণায় দেখা গেছে, এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে বেশি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা ঘটে বাংলাদেশে। এমন পরিস্থিতিতে মোটরসাইকেলের মতো ঝুঁকিপূর্ণ যান কেনার ব্যাপারে উৎসাহিত করার আগে এটি নিয়ন্ত্রণের দিকে সরকারকে নজর দিতে হবে। সূত্র: বণিক বার্তা
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত 2019 - 2026 PassengerVoice | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Developed By Muktodhara Technology Limited.
পাবলিক মতামত