শিরোনাম
মাইজগাঁওয়ে বগি লাইনচ্যুত
Passenger Voice | ১১:২৬ এএম, ২০২১-০২-০৬
দুর্ঘটনা যেন থামছেই ঢাকা-সিলেট রেলরুটে। একের পর এক দুর্ঘটনার কারণে নিরাপদ এ বাহনটি যাত্রীদের কাছে আতঙ্কে পরিণত হচ্ছে। সব শেষ গত বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জের মাইজগাঁওয়ে তেলবাহী একটি ট্রেনের সাতটি বগি লাইনচ্যুত হয়। এরপর থেকে বন্ধ হয়ে যায় সিলেটের সঙ্গে রেল যোগাযোগ। গতকাল সন্ধ্যায় এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত বগিগুলো উদ্ধার করে রেল যোগাযোগ স্বাভাবিক করা সম্ভব হয়নি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সিলেট-ঢাকা রেলপথে যেসব দুর্ঘটনা ঘটছে তার অধিকাংশই সিলেট-আখাউড়া সেকশনে। জরাজীর্ণ রেললাইন, পুরনো ইঞ্জিন ও বগি, উঁচুনিচু পাহাড়ি এলাকা দিয়ে যাওয়া রেলপথ, রেলকর্মীদের দায়িত্বে অবহেলাসহ বিভিন্ন কারণে এ দুর্ঘটনা ঘটছে।
সিলেট-আখাউড়া রেলপথের দৈর্ঘ্য ১৭৯ কিলোমিটার। জরাজীর্ণ হয়ে পড়া এ সেকশনে রয়েছে ১৩টি মহাঝুঁকিপূর্ণ সেতু। রেলওয়ের ভাষায় যা ‘ডেড স্টপ’। এছাড়া ট্রেন লাইনও ত্রুটিপূর্ণ। এসবের সঙ্গে রয়েছে ট্রেনের পুরনো ইঞ্জিন আর বগি। এসব মিলিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে সিলেট-আখাউড়া রেলপথে ট্রেন ভ্রমণ।
করোনা সংক্রমণের কারণে গত বছরের ২৪ মার্চ থেকে ১৫ আগস্ট পর্যন্ত প্রায় পাঁচ মাস সিলেট-আখাাউড়া রুটে রেল চলাচল বন্ধ ছিল। ১৬ আগস্ট থেকে সীমিত আকারে ট্রেন চলাচল শুরু হয়। এরপর থেকে এখন পর্যন্ত সাড়ে পাঁচ মাসে এ রুটে অন্তত নয়টি দুর্ঘটনা ঘটেছে।
এর মধ্যে গত ৬ নম্বেভর মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে ও ৭ ডিসেম্বর হবিগঞ্জের মাধবপুরে বড় ধরনের দুটি দুর্ঘটনা ঘটে। এ দুই স্থানে তেলবাহী ট্রেনের বগি লাইনচ্যুত হয়ে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। এসব দুর্ঘটনায় দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকে সিলেটের সঙ্গে সারা দেশের রেল যোগাযোগ।
রেলওয়ের কর্মকর্তারা জানান, সিলেট-কুলাউড়া-আখাউড়া সেকশনে আগে ট্রেন চলত ৭০-৮০ কিলোমিটার গতিতে। এখন সে গতি অর্ধেকে অর্থাৎ ৪০ কিলোমিটারে নেমে এসেছে। রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলীয় জোনের তথ্যমতে, আখাউড়া-সিলেট রেলপথে পারাবত, জয়ন্তিকা, পাহাড়িকা, উদয়ন, উপবন ও কালনি এক্সপ্রেস ট্রেনে প্রতিদিন ১২-১৫ হাজার যাত্রী সিলেট-ঢাকা এবং সিলেট-চট্টগ্রাম যাতায়াত করেন।
সিলেট-আখাউড়া রেল সেকশনের মোগলাবাজার থেকে মাইজগাঁও পর্যন্ত ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ জায়গায় স্লিপারের নাট-বল্টু খুলে গেছে। আবার কোথাও নাট-বল্টু ঢিলে থাকায় রেললাইন নড়বড়ে হয়ে আছে। রেলের দুই স্লিপারের মাঝখানে নেই পর্যাপ্ত পাথর।
এ সেকশনের সেতুগুলোর অবস্থা আরো নাজুক। রেলওয়ের প্রকৌশল বিভাগের তথ্যমতে, নির্মাণের ৫০-৫৫ বছর পরই সেতুর মেয়াদ শেষ হয়ে যায়। অথচ এ রুটের ৯০ শতাংশ সেতুর বয়সই ৭০ বছর পেরিয়েছে। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ এ রকম ১৩টি স্পটকে ‘ডেড স্টপ’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
এ রেলপথের একটি স্টেশনের সহকারী স্টেশন ম্যানেজার সজিব কুমার মালাকার বলেন, স্টপ হিসেবে চিহ্নিত করা সেতুর আগে ট্রেন থেমে যাবে, পরে পাঁচ কিলোমিটার গতিতে চলা শুরু করবে। সিলেট থেকে মোগলাবাজার স্টেশন পর্যন্ত ১৫ কিলোমিটারের মধ্যে আটটি এবং মোগলাবাজার থেকে আখাউড়া পর্যন্ত ১৬৪ কিলোমিটারের মধ্যে পাঁচটি সেতু ‘ডেড স্টপ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
রেলওয়ের বিভাগীয় আঞ্চলিক ব্যবস্থাপক (ডিআরএম) সাদিকুর রহমান বলেন, সিলেট থেকে আখাউড়া পর্যন্ত রেলপথ জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। এছাড়া পাহাড় ও টিলাভূমির ভেতর দিয়ে অনেকটা পথ ট্রেন চলাচল করে। ফলে এখানে দুর্ঘটনা বেশি ঘটে।
পুরনো রেলপথটি সংস্কার করে বিদ্যমান মিটার গেজ রেললাইনকে ডুয়েল গেজে রূপান্তর করার একটি প্রকল্প চার বছর আগে গ্রহণ করে রেল মন্ত্রণালয়। তবে এখন পর্যন্ত এ প্রকল্পের কাজ শুরু হয়নি। গত বছর একটি দুর্ঘটনার পর পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও সিলেট-১ আসনের সংসদ সদস্য ড. এ কে আব্দুল মোমেন সিলেট-আখাউড়া রেলপথ ডুয়েল গেজে রূপান্তরের কাজ দ্রুত সম্পন্নের তাগিদ দিয়ে রেল মন্ত্রণালয়ে ডিও লেটার প্রদান করেন। এর পরও কাজ শুরু হয়নি।
এদিকে বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১২টায় সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জের মাইজগাঁওয়ে তেলবাহী একটি ট্রেনের সাতটি বগি লাইনচ্যুত হয়ে পড়ে। এরপর থেকে সিলেটের সঙ্গে সারা দেশের রেল যোগাযোগ বন্ধ। ট্রেনের বগি লাইনচ্যুত হওয়ায় প্রায় ৮০০ মিটার রেললাইন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। রেললাইন সংস্কার করে বগি উদ্ধারের পর সচল হবে রেল যোগযোগ। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে উদ্ধারকাজ শেষ নাও হতে পারে, এমনটিও জানিয়েছেন রেলওয়ের একাধিক কর্মী।
সিলেট রেলস্টেশনের ব্যবস্থাপক খলিলুর রহমান বলেন, রেলওয়ের ছয়টি ইউনিটের ২০০ জন কর্মী লাইনচ্যুত বগিগুলো উদ্ধারে কাজ করছেন। উদ্ধারকারী ট্রেনও সকাল থেকে কাজ করছে। তবে যে জায়গায় ট্রেন লাইনচ্যুত হয়েছে সেখানে একটি সেতু রয়েছে। এ সেতুর কারণে উদ্ধারকাজে কিছুটা সময় লাগছে। সেতুটি যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, এজন্য সতর্কতার সঙ্গে কাজ করতে হচ্ছে। দুর্ঘটনার কারণ খতিয়ে দেখতে পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। রেলের বিভাগীয় পরিবহন কর্মকর্তা খাইরুল কবরিকে প্রধান করে গঠিত কমিটিকে তিনদিনের মধ্যে রিপোর্ট দিতে বলা হয়েছে।
দুর্ঘটনার কারণে গতকাল সিলেট থেকে পাহাড়িকা ও জয়ন্তিকা এক্সপ্রেস ছেড়ে যায়নি। ঢাকা থেকে আসা আন্তঃনগর উপবন এক্সপ্রেস কুলাউড়ায় ও চট্টগ্রাম থেকে ছেড়ে আসা উদয়ন এক্সপ্রেস শ্রীমঙ্গলে আটকা পড়ে।
মাইজগাঁওয়ের গুতিগাঁও এলাকার ট্রেনের সাতটি বগি লাইনচ্যুত হওয়ার পর বগিগুলো থেকে জ্বালানি তেল ছড়িয়ে পড়তে থাকে। তেল ছড়িয়ে পড়ে রেললাইনের পার্শ্ববর্তী জমি, সড়ক এমনকি পুকুরেও। বালতি-জগসহ নানা আসবাবপত্র নিয়ে এসব তেল সংগ্রহে রাত থেকেই ভিড় করে স্থানীয় বাসিন্দারা।
সিলেট রেলওয়ে পুলিশ সুপার শেখ শরীফুল ইসলাম জানান, ছড়িয়ে পড়া তেল সংগ্রহে অনেক মানুষ ভিড় করেছে। তাদের সরাতে পুলিশকে হিমশিম খেতে হচ্ছে। দুর্ঘটনা এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত 2019 - 2026 PassengerVoice | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Developed By Muktodhara Technology Limited.
পাবলিক মতামত