শিরোনাম
Yasin Hoque | ১২:৫০ পিএম, ২০২১-০২-০২
ইয়াছিন হক ঃ ২০০১ সাল থেকে ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরীতে ১৩ হাজার করে ২৬ হাজার সিএনজি অটোরিকশা নিবন্ধন দিয়েছিল বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ বিআরটিএ। এই সব সিএনজি অটোরিকশা নিবন্ধনের সময় মেয়াদ বা আয়ুষ্কাল নির্ধারণ করা হয়েছিল ৯ বছর। পরে মালিক ও চালকদের দাবির মুখে তিন দফায় অটোরিকশাগুলোর মেয়াদ বাড়িয়ে ১৫ বছর করা হয়। যে কারণে পরিবেশগত ক্ষতির প্রভাবমুক্ত হতে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে ইতোমধ্যে ঢাকায় নিবন্ধিত ১৩ হাজার অটোরিকশা ইতোমধ্যে স্ক্র্যাপ করে প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। চট্টগ্রামে ২০০১, ২০০২ ও ২০০৩ মডেলে প্রস্তুতকৃত এমন সাড়ে পাঁচ হাজার সিএনজি অটোরিকশা ও ২০১৮ ও ২০১৯ সালে প্রতিস্থাপন সম্পন্ন হয়। করোনার কারণে মেয়াদোত্তীর্ণ ২০০৪ মডেলের সিএনজি অটোরিকশা স্ক্র্যাপকরণ প্রায় ১০ মাস বন্ধ ছিল। গত ১৬ নভেম্বর থেকে পুনরায় স্ক্র্যাপকরণের কাজ শুরু করেছিল চট্টগ্রাম বিআরটিএ। ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে ৩৬১৯ টি পুরনো সিএনজি অটোরিকশা স্ক্র্যাপ করা হয়েছে। স্ক্র্যাপকৃত এসব অটোরিকশা মালিকদের অনুকূলে নতুন কেনা গাড়ির নিবন্ধন দিচ্ছে চট্টগ্রাম বিআরটিএ।
এদিকে স্ক্যাপ করণের পরে এই সিএনজি অটোরিকশা গুলোর বাজার মূল্য হয়ে যাচ্ছে প্রায় ১৪ থেকে ১৫ লাখ টাকা। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে চট্টগ্রামে সিএনজি অটোরিকশার শো-রুম ও ডিলার প্রতিষ্ঠান গুলো চ্যাসিসের দামের চেয়েও ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা অতিরিক্ত আদায় করছে। অথচ সাধারণ গ্রাহকের ধারনা বিআরটিএ সিএনজি স্ক্যাপে অনিয়ম দুর্নীতি করছে।
চট্টগ্রামের সিএনজি অটোরিকশার বিক্রয়কারী প্রতিষ্ঠান গুলোর মধ্যে ইমাম ডেন্টিং, জাফর অ্যান্ড কোম্পানি, রাজামিয়া অ্যান্ড সন্স, এসবি করপোরেশন, গাউসিয়া ট্রেডার্স, মেসার্স দিলু মিয়া, বিসমিল্লাহ এন্টারপ্রাইজ, মঞ্জুর অ্যান্ড কোম্পানি, শাহজালাল এন্টারপ্রাইজ এর বিরুদ্ধে চ্যাসিসের দামের ছেয়েও অতিরিক্ত টাকা আদায় করার অভিযোগ রয়েছে। মূলত যানবাহন কেনাবেচার সঙ্গে যুক্ত থাকায় ডিলার প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে বিআরটিএর সখ্যতার আছে এমন তথ্য দিয়ে সাধারণ মালিকদের বোকা বানিয়ে অতিরিক্ত টাকা আদায় করছে তারা।
নগরীর পাহাড়তলী এলাকার নুরুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তি সাম্প্রতিক সময় আগে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) লিখিত অভিযোগ করেছেন। অভিযোগপত্রে তিনি উল্লেখ করেছেন, চারটি সিএনজি অটোরিকশা (চট্টমেট্রো-থ-১২-১১৩৯, চট্টমেট্রো থ-১২-০৭৪৮, চট্টমেট্রো থ-১২-১১৩৯ ও চট্টমেট্রো থ-১২-১০৩৩) স্ক্র্যাপ করতে বিআরটিএ কার্যালয়ে যোগাযোগ করেন। এরপর দালালরা প্রতিটি অটোরিকশা ধ্বংস করার জন্য ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা দাবি করে। এসব ঘটনায় নুরুল ইসলাম চট্টগ্রাম বিআরটিএর সহকারী পরিচালক প্রকৌশলী মো. তৌহিদুল হোসেন, অফিস সহকারী মো. জামাল উদ্দিন ও অফিস পিয়ন মো. নুরুল ইসলামের নামে অভিযোগ দায়ের করেন।
তবে স্ক্যাপ করণ শেষে আজ মঙ্গলবার নুরুল ইসলামের সাথে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, আমার চট্টমেট্রো-থ-১২-০৪৬৫, চট্টমেট্রো-থ-১২-০৭৪৮, চট্টমেট্রো-থ-১২-১১৩৯, চট্টমেট্রো-থ-১১-১০৩৩ নং গাড়ি স্ক্যাপ করতে আমার কাছ থেকে বিআরটিএ কোন ঘুষ গ্রহন করেনি। তবে দালালরা আমার কাছে ১ লক্ষ ৪০ হাজার টাকা ছেয়েছিল। আমি কাউকে টাকা প্রদান করিনি। বিআরটিএ কোন কর্মকর্তা তার কাছ থেকে ঘুষ চাওয়া বা নিয়েছে কিনা এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, বিআরটিএর কোন কর্মকর্তা আমার কাছে টাকা চাইনি। দালাল চেয়েছিল টাকা।
এই বিষয়ে বিআরটিএর চট্টমেট্রো সার্কেলের সহকারী পরিচালক তৌহিদুল হোসেন বলেন, বিআরটিএ সিএনজি অটোরিকশা স্ক্যাপ করণ কার্যক্রমের আহবায়ক উপ-পরিচালক মহোদয় তারিখ ভিক্তিতে গাড়ির নম্বর উল্লেখ করে চট্টগ্রামের বহুল জনপ্রিয় দৈনিক আজাদী, পূর্বকোণ ও পূর্বদেশ পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে থাকে। বিআরটিএর কর্মকর্তাগণ কোন সিএনজি অটোরিকশা মালিকের সাথে ব্যক্তিগত ভাবে যোগাযোগ করেনা। সিএনজি অটোরিকশার ৯ ডিলারের বিষয়ে যে অভিযোগ তার সাথে বিআরটিএ কোন ভাবে সম্পৃক্ত না।
এদিকে চট্টগ্রাম বিআরটিএতে সিএনজি অটোরিকশা স্ক্যাপ করণ কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর থেকে চট্টগ্রাম আন্তঃজেলা সিএনজি চোর সিন্ডিকেটের তৎপরতা বেড়ে যায়। তাঁরা বিভিন্ন ভাবে চুরি করা সিএনজি অটোরিকশা স্ক্যাপ করে নিজের নামে করিয়ে নিতে চেষ্টা করছিল। এমনকি কর্মকর্তাদের জিম্মি করতে ও এমন সরকারের এই উন্নয়ন কর্মযজ্ঞে বাঁধা প্রদান করতে বিভিন্ন সরকারী বেসরকারি দপ্ততে বিভিন্ন বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়ে বিভিন্ন অভিযোগ ও দায়ের করেছিল বলে অভিযোগ করে গত ১০ ডিসেম্বর সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব ও বিআরটিএর চেয়ারম্যানের কাছে যৌথ স্বাক্ষরিত খোদ চিঠি পাঠিয়েছে শতাধিক সিএনজি অটোরিকশার মালিক।
তবে বিআরটিএর চেয়ারম্যানের দিক নির্দেশনায় চট্টগ্রাম বিআরটিএ কর্মকর্তাদের দক্ষতায় আন্তঃজেলা চোর সিন্ডিকেট কোন ধরনের গাড়ি মালিক সেজে স্ক্যাপ কার্যক্রম করে গাড়ি হাতিয়ে নিতে পারেনি।
এদিকে অটোরিকশা ভাঙ্গা শেষে বিআরটিএ এলাকার একটি রাজনৈতিক সিন্ডিকেট করেছে ব্যাপক অনিয়ম। চালক ও মালিকদের অভিযোগ, ধ্বংসপ্রাপ্ত একটি অটোরিকশার ওজন অন্তত ৫০০ কেজি। বর্তমান বাজারমূল্যে পুরনো লোহার দামের হিসাবে ধ্বংস করা অটোরিকশাটির দাম অন্তত ১৫-২০ হাজার টাকা হওয়ার কথা। কিন্তু বিআরটিএ প্রাঙ্গণেই স্থানীয় সাবেক ছাত্রনেতা নুরুল আবছার, তার সহযোগী হিসেবে রয়েছে সাবেক কাউন্সিলর তৌফিক চেধুরীর চাচাতো ভাই পরিচয়দানকারী মোহাম্মদ আলী, মোহাম্মদ মনসুর ও আব্দুল মান্নান, হাটহাজারী বিএনপি নেতা খসরু হত্যা মামলার আসামী মোঃ মোস্তফাসহ সিন্ডিকেটটি এক-দেড় হাজার টাকায় এসব অটোরিকশা জোর করে মালিকদের কাছ থেকে কিনছে।
তবে বিআরটিএর সহকারী পরিচালক তৌহিদুল হোসেন এই বিষয়ে বলেন, সিএনজি অটোরিক্শা স্ক্যাপ করণের পরে আমরা মালিককে ধংসকরা স্ক্যাপ গুলো বুঝিয়ে দিয়ে থাকি এরপর তারা কার কাছে বিক্রি করবে সে বিষয়ে আমাদের কোন বাধ্য বাধকতা নেই। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট স্ক্যাপক্রয়কারী ব্যক্তিরা বলতে পারবে।
জানা গেছে, শুরুতে ২০১৮ সালে স্ক্র্যাপ কার্যক্রমের জন্য সিএনজি/পেট্রলচালিত ফোর স্ট্রোক থ্রি-হুইলার অটোরিকশা স্ক্র্যাপ কমিটি গঠন করা হয়। পরবর্তীতে আগের কমিটি ভেঙে বিআরটিএর উপপরিচালক (প্রকৌশল) মোহাম্মদ শহীদুল্লাহকে আহ্বায়ক ও মোটরযান পরির্দশক (চট্টমেট্রো-১ সার্কেল) মো. মিজানুর রহমানকে সদস্য সচিব করা হয়। পাশাপাশি কমিটিতে সদস্য রাখা হয় সহকারী পরিচালক (প্রকৌশল-চট্টমেট্রো-১) তোহিদুল হোসেনকে।
জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বিভাগের বিআরটিএর উপপরিচালক (প্রকৌশল) মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ বলেন, নিয়ম মেনেই চট্টগ্রামের অটোরিকশাগুলো পর্যায়ক্রমে ভেঙে ফেলা হচ্ছে। কেউ যাতে ভোগান্তির মধ্যে না পড়েন সেজন্য নিয়ম মেনে বিআরটিএ কার্যালয়ের সামনে ম্যাজিস্ট্রেট বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা ও আপনাদের সাংবাদিক ভাইদের উপস্থিতিতে স্ক্র্যাপিং করা হচ্ছে। এতে কোনো অনিয়ম বা ভোগান্তি সযোগ নেই। কেউ যদি বিআরটিএ কার্যালয়ের বাইরে কারো সঙ্গে নিয়মবহির্ভূতভাবে আর্থিক লেনদেন করে তাতে আমাদের কিছু করার নেই।
তবে সড়ক পরিবহন সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরর আমলে বিআরটিএ প্রায় শতভাগ ডিজিটালাইজড হয়েছে, এখন সরাসরি বিআরটিএতে ঘুষ দুর্নীতি করার কোন সুযোগ নেই কর্মকর্তাদের। দালাল নিয়ন্ত্রনেও বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছেন তিনি। তবে গাড়ির শো-রুমের মালিক ও বাহিরের দালালদের সাথে কোন ধরনের লেনদেন করে প্রতারণা না হওয়ার বিষয়েও গুরুত্ব দিচ্ছে বিআরটিএ।
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত 2019 - 2026 PassengerVoice | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Developed By Muktodhara Technology Limited.
পাবলিক মতামত