শিরোনাম
লাকসাম-আখাউড়া ডাবল লাইন
Passenger Voice | ১১:০৪ এএম, ২০২১-০১-০৭
নভেল করোনাভাইরাসের কারণে সব মেগা উন্নয়ন প্রকল্পের মেয়াদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে এক বছর বাড়িয়েছে সরকার। সেই সুবাদে বাড়তি এক বছর সময় পেয়েছে লাকসাম-আখাউড়া ডাবল লাইন প্রকল্পও। কিন্তু অতিরিক্ত সময়ে কাজ শেষ করতে পারছে না ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। তার ওপর উল্টো প্রতিবন্ধকতার অজুহাতে ৪০০ কোটি টাকা ব্যয় বৃদ্ধির দাবি জানিয়েছে তারা।
ঢাকা-চট্টগ্রাম ৩২১ কিলোমিটার রেলপথের ১১৮ কিলোমিটার আগে থেকেই ডাবল লাইন। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর তিনটি প্রকল্পের মাধ্যমে আরো ১৩১ কিলোমিটার ডাবল লাইন নির্মাণ করা হয়েছে। বাকি ৭২ কিলোমিটার রেলপথ ডুয়াল গেজ ডাবল লাইনে উন্নীত করার জন্য ‘লাকসাম-আখাউড়া ডাবল লাইন প্রকল্পটি’ নেয় বাংলাদেশ রেলওয়ে। ২০১৪ সালের ২৩ ডিসেম্বর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রকল্পটি অনুমোদন হয়। কাজ শুরু হয় ২০১৬ সালে।
এ প্রকল্পের নির্মাণকাজে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে নিয়োজিত রয়েছে সিটিএম জয়েন্ট ভেঞ্চার। এটি চায়না রেলওয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং গ্রুপ, বাংলাদেশী প্রতিষ্ঠান ম্যাক্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড ও তমা কনস্ট্রাকশন অ্যান্ড কোম্পানি লিমিটেডের যৌথ একটি কোম্পানি। প্রায় সাড়ে ৬ হাজার কোটি টাকার এ প্রকল্পের কাজ ২০২০ সালের জুনের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা ছিল। তবে কভিড-১৯-এর কারণে স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রকল্পের মেয়াদ এক বছর বাড়িয়ে দেয় সরকার। কিন্তু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের গাফিলতি ও সময়ক্ষেপণের ফলে ২০২২ সালের জুনের আগে শেষ হচ্ছে না এ প্রকল্প। গাফিলতির এ অভিযোগের মধ্যেই প্রতিবন্ধকতার অজুহাতে প্রকল্পটির সময় বৃদ্ধির পাশাপাশি ব্যয় ৪০০ কোটি টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।
জানতে চাইলে প্রকল্পের প্রধান প্রকৌশলী মো. মামুনুল ইসলাম বলেন, নভেল করোনাভাইরাসের কারণে প্রকল্পের কাজে সময়ক্ষেপণ হয়েছে এটা ঠিক। কিন্তু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কভিডের কারণে যে ক্ষতিপূরণ দাবি করছে সেটি গ্রহণযোগ্য নয়। চুক্তিতে এ ধরনের কোনো শর্ত না থাকায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দাবি মেনে নেয়া যাবে না। এছাড়া এ প্রকল্পের প্রতিবন্ধকতার যে দাবি করা হয়েছে সেগুলো নেই। ফলে নির্বিঘ্নে প্রকল্পের কাজ এগিয়ে নিতে কোনো সমস্যা হওয়ারও কথা নয় বলে দাবি করেছেন তিনি।
প্রকল্পটির শশীদল থেকে আখাউড়া পর্যন্ত অংশের ৩৬ কিলোমিটার রেলপথের কাজ করছে বিদেশী ঠিকাদারের বাংলাদেশী পার্টনার তমা কনস্ট্রাকশন। শশীদল থেকে লাকসাম পর্যন্ত ৩২ কিলোমিটারের কাজ করছে বাংলাদেশী আরেক প্রতিষ্ঠান ম্যাক্স। এর মধ্যে শশীদল স্টেশনে তিনটি, গঙ্গাসাগর স্টেশনে দুটি, আখাউড়া স্টেশনে ৩৩টি রেলওয়ে অবকাঠামো পুনর্নির্মাণের পর বিদ্যমান অবকাঠামো অর্থাৎ রেলওয়ে স্টেশনের যাবতীয় কার্যক্রম স্থানান্তরের পর রেলপথ উন্নয়নের কাজ করার চুক্তি ছিল। কিন্তু তমা কনস্ট্রাকশন বিদ্যমান অবকাঠামোকে প্রকল্পের কাজ এগিয়ে নিতে অন্তরায় হিসেবে বার বার অভিযোগ করে আসছে। যদিও রেলওয়ে বলছে, চলমান রেলপথ সংশ্লিষ্ট কোনো প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় চুক্তি অনুযায়ী নতুন অবকাঠামো নির্মাণের পর পুরনো অবকাঠামো ভেঙে সেখানে ট্রেন চলাচলের আনুষঙ্গিক ব্যবস্থাপনা সরিয়ে নিতে হয়। কিন্তু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চুক্তির বাইরে গিয়ে বিদ্যমান অবকাঠামোকে প্রকল্পের প্রতিবন্ধকতা হিসেবে হাজির করছে। এছাড়াও ঘুমতি ঘর (লেভেল ক্রসিং এলাকার স্থাপনা) ভেঙে ফেলতে না দেয়ায় প্রকল্পের কাজ বিঘ্ন হচ্ছে বলে অভিযোগ তুলেছে। মূলত করোনাভাইরাসের কারণে প্রকল্পের কাজ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ করতে না পারায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো প্রকল্পের সময় ও ব্যয় বৃদ্ধির জন্য নানা অজুহাত তুলছে বলে অভিযোগ করছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ।
প্রকল্পের ব্যয় ও সময় বৃদ্ধির বিষয়ে জানতে চাইলে তমা কনস্ট্রাকশনের প্রজেক্ট ম্যানেজার বিমল সাহা বলেন, বড় কোনো প্রকল্পের কাজের ক্ষেত্রে কোনো মহামারীর কারণে কাজ বিঘ্নিত হলে সময় বৃদ্ধি ছাড়া উপায় থাকে না। তাছাড়া প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়নের সময় একাধিক প্রতিবন্ধকতার কারণে আমরা সময় বৃদ্ধির প্রস্তাব করেছি। সময় বাড়লে ব্যয়ও বাড়বে। প্রস্তাবের এসব বিষয় নিয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। বর্তমানে পুরোদমে কাজ এগিয়ে যাওয়ায় আগামী বছরের মধ্যেই মেগা এ প্রকল্পটির কাজ শেষ করা সম্ভব হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।
এদিকে প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যেকোনো প্রকল্পের চুক্তিতে প্রাকৃতিক দুর্যোগসহ একাধিক প্রাকৃতিক প্রতিবন্ধকতার কারণে কাজ বন্ধ থাকলেও সেগুলো বিবেচনার শর্ত থাকে। কিন্তু কভিড-১৯ পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। সরকার মেগা প্রকল্পগুলোর সময় স্বয়ংক্রিয়ভাবে এক বছর বাড়িয়ে দিয়েছে। রেলের পক্ষ থেকে করণীয় ৩০০টির ওপর স্থাপনা এরই মধ্যে সরিয়ে নেয়া হয়েছে। এর পরও নানা অজুহাত তুলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো সময় ও ব্যয় বাড়ানোর চেষ্টা করছে। এক্ষেত্রে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোর কাজের মান নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে প্রকল্পের রেলওয়ে সংশ্লিষ্ট শীর্ষ একাধিক কর্মকর্তা।
প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে ৭২ কিলোমিটার ডুয়াল গেজ ডাবল লাইন প্রকল্পটির ৬৭ শতাংশ কাজ শেষ করেছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। এখনো প্রকল্পটির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অংশের কাজ শেষ করতে পারেনি তারা। সর্বশেষ গত ৪ নভেম্বর প্রকল্পের পরামর্শক প্রতিষ্ঠান কনস্ট্রাকশন সুপারভিশন কনসালট্যান্টকে চিঠি দেয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, প্রকল্পের নির্ধারিত সময়ের এখনো ১৬ মাস থাকলেও সেকশন-১-এ এখনো ১৬টি প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। এছাড়া সেকশন-২-এ ২৭৮টি প্রতিবন্ধকতাসহ প্রকল্প এলাকায় সর্বমোট ৩২১টি অবকাঠামোগত প্রতিবন্ধকতা রয়েছে, যা রেলওয়ে প্রকল্পের কাজের প্রয়োজনে সরিয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে বুঝিয়ে দেয়ার কথা ছিল। এসব প্রতিবন্ধকতা ও কভিড-১৯-এর কারণে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আখাউড়া-লাকসাম ডাবল লাইন প্রকল্পের কাজ শেষ করা যায়নি। এসব কারণে ক্ষয়ক্ষতি ফলে প্রকল্পের ব্যয় প্রায় ৪০০ কোটি টাকা বৃদ্ধির প্রস্তাব দেয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।
যদিও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের এসব দাবি অস্বীকার করেছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। সর্বশেষ ১৫ ডিসেম্বর পরামর্শক প্রতিষ্ঠানকে দেয়া এক চিঠিতে উল্টো ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের গাফিলতি, নিম্নমানের কাজের অভিযোগ করেন প্রকল্প পরিচালক মো. রমজান আলী। চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেন, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান প্রকল্প এলাকার বিদ্যমান রেলওয়ে স্টেশনগুলো ভেঙে ফেলার আগে নতুন স্টেশন ভবন নির্মাণ চুক্তির শর্তে ছিল। সম্প্রতি প্রকল্প এলাকার আখাউড়া, গঙ্গাসাগর, ইমামবাড়ি, কসবা, মন্দবাগ, সালদানদী, শশীদল ও রাজাপুর সরেজমিন পরিদর্শনে নিয়োজিত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাজ নিম্নমানের বলে চুক্তিমতো হয়নি বলে দেখতে পেয়েছে রেলওয়ে। তাছাড়া প্রকল্প এলাকার বিদ্যমান রেলওয়ে স্টেশন ভবনগুলো প্রকল্পের কাজে বিঘ্ন ঘটাচ্ছে না। এছাড়াও চুক্তির শর্ত অনুযায়ী প্রকল্পের একাধিক কাজ এরই মধ্যে সম্পন্ন করার কথা থাকলেও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সেটি এখনো বাস্তবায়ন করেনি বলে দাবি করে প্রকল্প পরিচালক।
প্রকল্পের নথি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, এ পর্যন্ত রেলওয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়নে কুমিল্লা অংশে ৪২ দশমিক ২৫ একর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া অংশে ২৮ দশমিক ২৭ একর জমি অধিগ্রহণ করেছে। পরবর্তী সময়ে প্রকল্পের প্রয়োজনে অতিরিক্ত ৫ দশমিক ৫ একর (কুমিল্লায় ১ দশমিক ৭৯ একর এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ৩ দশমিক ৬৯ একর) ভূমি অধিগ্রহণ করেছে। এরই মধ্যে সর্বশেষ ডিসেম্বরে ১২৬টি অপসারণ করেছে। এছাড়াও ২০২০ সালের অক্টোবর পর্যন্ত ৩১৭টি প্রতিবন্ধকতা (অধিকৃত ভূমিতে ঘরবাড়ি-অবকাঠামো) অপসারণ করেছে। এর আগেও প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়নে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের চুক্তির শর্ত অনুযায়ী রেলওয়ে আরো ১৯১টি প্রতিবন্ধকতা অপসারণ করে প্রকল্পের জন্য বুঝিয়ে দিয়েছে। স্টেশন ভবনের জন্য প্রকল্পের কাজ বিঘ্নিত হওয়ার বিষয়টিকে অযৌক্তিক বলে দাবি করেছেন রেলওয়ের প্রকল্প সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা।
প্রসঙ্গত. লাকসাম-আখাউড়া ডাবল লাইন প্রকল্পটির জন্য মোট ব্যয় হচ্ছে ৬ হাজার ৫০৪ কোটি ৫৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা। এর মধ্যে প্রকল্প সহায়তা ৫ হাজার ৪৭৭ কোটি ৮৮ লাখ ২৮ হাজার টাকা। আর বাংলাদেশ সরকার দিচ্ছে ১ হাজার ২৬ কোটি ৬৬ লাখ ২২ হাজার টাকা। এডিবি, ইআইবি রেলের এ মেগা প্রকল্পে বিনিয়োগ করছে।
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত 2019 - 2026 PassengerVoice | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Developed By Muktodhara Technology Limited.
পাবলিক মতামত