শিরোনাম
কৃষিপণ্য পরিবহনে রেলের বিশেষ পরিকল্পনা
Passenger Voice | ১০:৫৪ এএম, ২০২০-১২-২৩
বাংলাদেশ রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে উৎপাদিত কৃষিজাত পণ্য পরিবহন প্রক্রিয়া সহজ ও সাশ্রয়ী করার উদ্যোগ নিয়েছে। একই সঙ্গে শিল্পজাত পণ্য পরিবহন ব্যবস্থার সুবিধা সম্প্রসারণের পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। এসব প্রক্রিয়া বাস্তবায়ন করতে রেলের বহরে যুক্ত করা হচ্ছে ১২৫টি লাগেজ ভ্যান। এর মধ্যে থাকছে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত লাগেজ ভ্যানও।
রেলের প্রবর্তিত নতুন এক ব্যবসায়িক পরিকল্পনায় প্রথমবারের মতো শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত লাগেজ ভ্যান যুক্ত করা হয়েছে। মূলত কৃষি ও শিল্পজাত পণ্য পরিবহন ব্যবস্থাকে যুগোপযোগী করে যাত্রী খাতে আয় বাড়ানোর পাশাপাশি পরিবহন ঢেলে সাজানোর উদ্যোগের অংশ হিসেবে দেশের বিভিন্ন বিশেষায়িত কৃষি ও শিল্পপণ্য উৎপাদনকারী অঞ্চলের কথা মাথায় রেখে গুডস ও কৃষিজাত পণ্য পরিবহনের নতুন ট্রেনসূচি তৈরির কাজ শুরু করেছে রেলওয়ের পরিবহন ও বাণিজ্যিক বিভাগ। ২০২২ সালের শেষার্ধে রেলের নতুন এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হতে পারে বলে জানিয়েছে বিভাগটি।
রেলওয়ে সূত্র জানায়, এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের অর্থায়নে ৫০টি ব্রড গেজ ও ৭৫টি মিটার গেজ লাগেজ ভ্যান সংগ্রহের জন্য চুক্তি হয়েছে। চীন থেকে ক্রয়ের জন্য প্রক্রিয়াধীন এসব লাগেজ ভ্যান আগামী দু্ই বছরের মধ্যে রেলের বহরে পর্যায়ক্রমে যুক্ত হবে। এর মধ্যে ৫৯টি মিটার গেজ, ৩৮টি ব্রড গেজ, ১৬টি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত মিটার গেজ এবং ১২টি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ব্রড গেজ লাগেজ ভ্যান। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত লাগেজ ভ্যান যুক্ত হলে সারা দেশের দ্রুত পচনশীল কৃষিপণ্য যেমন দুধ, মাছ, দুগ্ধজাতীয় পণ্য পরিবহন সহজতর হবে। এসব লাগেজ ভ্যানের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে ইতোমধ্যে বিভিন্ন সংস্থা ও ব্যবসায়ী সমিতির সঙ্গে আলোচনা করছে রেলওয়ে।
রেলের রোলিং স্টক বিভাগের তথ্যমতে, ওয়ার্কিং টাইম টেবিল-৫১ অনুযায়ী, রেলওয়ের লাগেজ ভ্যান ছিল ১২০টি। কিন্তু দীর্ঘদিনের পুরনো হওয়ায় বর্তমানে ওয়ার্কিং টাইম টেবিল-৫২-এ লাগেজ ভ্যানের সংখ্যা কমে ১০০টিতে নেমে এসেছে। নতুন পরিকল্পনায় ১২৫টি লাগেজ ভ্যান আমদানি হলে রেলের কৃষিপণ্য পরিবহন ব্যবস্থায় দ্বিগুণের বেশি সুফল পাওয়া যাবে বলে মনে করছেন রেলওয়ের পরিবহন ও বাণিজ্যিক বিভাগ।
রেলে কনটেইনার, খাদ্যপণ্য, জ্বালানি পরিবহনের পাশাপাশি প্রতিটি মেইল ও এক্সপ্রেস ট্রেনে একটি করে লাগেজ ভ্যান যুক্ত থাকে। এসব ল্যাগেজ ভ্যানে মাছ, শাকসবজি, আসবাব, ডিমসহ কৃষিজ বিভিন্ন পণ্য পরিবহন হয়। চলতি বছরের শুরুতে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শুরু হলে রেলওয়ে বিশেষ ব্যবস্থায় সারা দেশে বেশ কয়েকটি পার্সেল ট্রেন সার্ভিস চালু করে। এসব ট্রেনের সাফল্যের পর আম উৎপাদন মৌসুমে রাজশাহী থেকে ম্যাঙ্গো স্পেশাল ট্রেন এবং কোরবানির ঈদের আগে গরু পরিবহনের জন্য বিশেষ ট্রেন সার্ভিসও চালু করেছিল। আগে শুধু মেইল ও এক্সপ্রেস ট্রেনে লাগেজ ভ্যান যুক্ত হলেও নতুন পরিকল্পনায় আন্তঃনগর ট্রেন ও মেইল ট্রেনেও লাগেজ ভ্যানের কোচ সংযোজনের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
রেলওয়ের নথিপত্র অনুযায়ী, করোনার কারণে পণ্য পরিবহনে বিদায়ী অর্থবছরে রেলের আয় কমেছে। এখন কৃষি ও শিল্পজাত পণ্য পরিবহনের ব্যবস্থা করা হলে একদিকে কৃষক ও উদ্যোক্তারা লাভবান হবেন। আবার রেলওয়ে আর্থিকভাবে লাভবান হবে। মূলত করোনাভাইরাস সংক্রমণকালে সারা দেশের যানবাহন ব্যবস্থা কিছুটা স্তিমিত হয়ে যাওয়ার পর রেলওয়ে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে পণ্য পরিবহনে বিশেষ কিছু ট্রেন চালু করে। এসব ট্রেন দিয়ে সারা দেশের ব্যবসায়ী ও কৃষকরা কৃষিজাত পণ্য পরিবহনের সুযোগ পান। তাছাড়া করোনাভাইরাস সংক্রমণকালে রেলওয়ের এসব উদ্যোগের ফলে সারা দেশে কৃষিপণ্য সরবরাহ ব্যবস্থার সংকট এড়াতে সহায়তা করে। মূলত এসব অভিজ্ঞতা থেকেই রেলওয়ে কৃষিপণ্য পরিবহনে স্থায়ীভাবে বিশেষায়িত ট্রেন ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে উদ্যোগী হয়েছে।
রেলের মাধ্যমে কৃষিজাত পণ্য পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলার বিষয়ে বিভাগীয় বাণিজ্যিক কর্মকর্তার দপ্তর থেকে সম্প্রতি ১৭ দফা প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের প্রধান বাণিজ্যিক ব্যবস্থাপককে দেয়া এ প্রস্তাবে বলা হয়েছে, রেলওয়ের বহরে ৭৫টি মিটার গেজ লাগেজ ভ্যান যুক্ত হচ্ছে। এ লাগেজ ভ্যানগুলো সুষ্ঠু ব্যবহারের মাধ্যমে রেলওয়ের রাজস্ব আয় বাড়বে। রেলের মাধ্যমে পণ্য পরিবহন ব্যবস্থা আরো সহজ করতে যাত্রীবাহী ট্রেনগুলোতে লাগেজ ভ্যানের সংখ্যা বৃদ্ধির প্রস্তাবও দেয় এ দপ্তর। কোন ট্রেনে কয়টি করে লাগেজ ভ্যান বৃদ্ধি করতে হবে, তারও একটি তালিকা দেয়া হয়।
প্রস্তাবগুলো হচ্ছে, দীর্ঘদিন বিভিন্ন রুটের ট্রেনে লাগেজ ভ্যান চলাচল না করায় ব্যবসায়ীরা অন্য মাধ্যমে পণ্য পরিবহন করে থাকেন। ব্যবসায়ীদের রেলমুখী করার জন্য রেলওয়ের পণ্য পরিবহন ব্যবস্থা সম্পর্কে ধারণা দিতে হবে। প্রতি মাসে অন্তত দুবার স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে স্টেশন মাস্টারের মতবিনিময় সভার আয়োজন প্রয়োজন বলে প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে। এছাড়া নির্দিষ্ট স্টেশনে মালামাল পরিবহনের জন্য আলাদা আলাদা লাগেজ ভ্যান সংযোজন ও সংরক্ষণ করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। স্টেশনে লাগেজ বা পার্সেল মালামাল পরিবহনের জন্য ওজন যন্ত্র এবং লম্বা লরি ও ভ্যান সরবরাহ করা প্রয়োজন। দেশের বড় বড় ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান ও শিল্প গ্রুপের সঙ্গে মালামাল পরিবহনে রেলওয়ে চুক্তি সম্পাদন করতে পারে। আর সর্বোচ্চ মালামাল পরিবহনকারী ব্যবসায়ীদের প্রণোদনা এবং স্টেশনকে পুরস্কার দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।
রেলের পণ্য পরিবহনের নতুন এ ব্যবসায়িক পরিকল্পনায় আরো রয়েছে, পণ্য পরিবহনের জন্য চট্টগ্রাম মেইল ট্রেনটি নরসিংদী স্টেশনে ২০ মিনিট বিরতি দিয়ে স্থানীয় কাপড় বুকিং দেয়ার ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে। ভৈরববাজার স্টেশনের পাশে কমলপুর এলাকায় ৫০০ জুতা তৈরির কারখানা রয়েছে। কারখানাগুলোর উৎপাদিত জুতা রেলের মাধ্যমে ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, নোয়াখালী, কুমিল্লা ও ময়মনসিংহে পরিবহনের সুযোগ রয়েছে। এজন্য স্টেশন মাস্টার স্থানীয় জুতা উৎপাদনকারীদের সঙ্গে মতবিনিময় করে রেলযোগে পণ্য পরিবহনের উদ্যোগ নিতে পারেন।
পরিকল্পনায় আরো বলা হয়েছে, বর্তমানে চলাচলরত মেইল, এক্সপ্রেস ট্রেনগুলোতে লাগেজ ভ্যানের সংখ্যা বৃদ্ধি করা, আন্তঃনগর ও লোকাল ট্রেনে লাগেজ ভ্যান সংযোজন, সেকশনভিত্তিক স্বল্প দূরত্বে শুধু লাগেজ ট্রেন পরিচালনা, এলাকাভিত্তিক পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্র ও বৃহৎ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা, রেলওয়ের পণ্য পরিবহন সেবা সম্পর্কে প্রচার-প্রচারণা এবং পরিবহনকৃত পণ্য সংরক্ষণের জন্য অবকাঠামোগত সুবিধা বৃদ্ধি করা। ময়মনসিংহের মোহনগঞ্জ স্টেশন হতে হাওড় বা মোহনগঞ্জ এক্সপ্রেস ট্রেনের সঙ্গে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত লাগেজ ভ্যান যুক্ত করে মোহনগঞ্জ ও ধর্মপাশার উৎপাদিত মাছ, সবজি ও পচনশীল দ্রব্য ঢাকা পর্যন্ত পরিবহন করা যেতে পারে। ভৈরববাজার থেকে ঢাকা, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন রুটে সপ্তাহে এক বা একাধিক দিন পার্সেল এক্সপ্রেস চালানো যেতে পারে। এতে করে ভৈরব বাজার হতে জুতা, মাছ, কয়েল ও ঝাড়ুসহ অন্যান্য মালামাল পরিবহন করা যাবে।
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ রেলওয়ের রোলিং স্টক অপারেশন উন্নয়ন প্রকল্পের পরিচালক মো. মিজানুর রহমান এ বিষয়ে বলেন, রেলের কাছে যেসব লাগেজ ভ্যান রয়েছে সেগুলো খুবই পুরনো। তাছাড়া নানা কারণে রেলপথে কৃষিপণ্য পরিবহনে মানুষের আগ্রহ বেড়েছে। সারা দেশে কৃষিপণ্য বাজারজাতকরণ ও কৃষকদের অর্থনৈতিক সম্প্রসারণে ১২৫টি লাগেজ ভ্যান আমদানির প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এ প্রকল্পে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত লাগেজ ভ্যান থাকায় দেশের কৃষিপণ্য পরিবহনে রেলওয়ে কর্মপরিধি আরো বাড়বে বলে আশা প্রকাশ করেন এ কর্মকর্তা।
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত 2019 - 2026 PassengerVoice | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Developed By Muktodhara Technology Limited.
পাবলিক মতামত