চট্টগ্রাম সীতাকুণ্ড টেম্পো মালিক সমিতির নেতার কান্ড

পুলিশের নামে ২ লাখ টাকা চাঁদা তুলে ইমন, একেখান-জিইসি রুটে চলে অবৈধ অটোটেম্পু

Tanjin Tanju    |    ০১:২৭ পিএম, ২০২০-১০-১৬


পুলিশের নামে ২ লাখ টাকা চাঁদা তুলে ইমন, একেখান-জিইসি রুটে চলে অবৈধ অটোটেম্পু

তানজীন তানজু : চট্টগ্রাম নগরীর একে খান -জিইসি মোড় পর্যন্ত চলাচলকারী প্রায় ৭০ টি অটোটেম্পো রুট পারমিট ও ফিটনেস বিহীন চলাচল করছে। রুট পারমিট ও ফিটনেসবিহীন অটোটেম্পো চলাচলে দেশজুড়ে প্রশাসন কঠোর অবস্থানে থাকলেও নগরীর একেখান থেকে জিইসি মোড় পর্যন্ত দাপিয়ে বেড়াচ্ছে এসব অবৈধ গাড়ি। হরহামেশাই তৈরী হচ্ছে যানজট ও জনজট, ভোগান্তিতে যাত্রী সাধারণ। আর এই অবৈধ গাড়ি গুলো থেকে প্রতি মাসে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের নামে প্রায় ২ লাখ টাকা চাঁদা উঠিয়ে থাকে চট্টগ্রাম সীতাকুণ্ড টেম্পো মালিক সমিতির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও একে খান মোড়ের  রবিন মোটর্স এর কর্ণধার ইমাম উদ্দিন ইমন। এই টাকা সরাসরি চলে যায় নগর পুলিশের তিন শহর ও যানবাহন পরিদর্শকের পকেটে। 

শুধু তাই নয়, সকল বৈধ কাগজ আছে এমন অটোটেম্পু থেকে ও গাড়ি প্রতি চাঁদা দিতে হয় এই নেতার নামে। মালিক শ্রমিকরা বলছে সিএমপির আকবরশাহ, খুলশী ও পাঁচলাইশ থানার টিআই দের ছত্রছায়ায় এমন অপকর্ম করছে ইমাম উদ্দিন ইমন। চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের নতুন পুলিশ কমিশনার সালেহ মোহাম্মদ তানভির যোগদানের পর নগরীতে সব ধরনের চাঁদাবাজী বন্ধ করে দেওয়া হয়। কিন্তু বেপরোয়া এই পরিবহন নেতার কোন হাল হয়নি। এছাড়াও অভিযোগ রয়েছে অটোটেম্পো মালিকদের কাছ থেকে মাসিক চাঁদার টাকা না পেলে বৈধ গাড়ি গুলোকে টিআইদের মাধ্যমে বিভিন্ন মামলা ও আটক করিয়ে থাকে। 

চট্টমেট্রো আঞ্চলিক ট্রান্সপোর্ট কমিটির (আরটিসি) সভাপতি ও চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনারের দপ্তরের সূত্র বলছে, নগরীর ১১ নম্বর রুটে অটোটেম্পো চলাচলের নির্ধারিত সিলিং রয়েছে ১২০ টি। অথচ দীর্ঘদিন ধরে প্রায় ১৭০ থেকে ১৯০ টি অটোটেম্পো এই রুটে চলাচল করে। প্রশ্ন উঠেছে, রুট পারমিট ছাড়া এসব গাড়ি দীর্ঘদিন ধরে পুলিশ ও প্রশাসনের চোখের সামনে কিভাবে চলছে?

অনুসন্ধানে জানা যায়, ১২০ টি রুট পারমিট যুক্ত গাড়ির সাথে চলছে রুট পারমিট বিহীন ৫০ টিরও বেশি গাড়ি। এসব গাড়ি চলাচলের জন্য নগর পুলিশের নামে মাসোহারা দিতে হয়। এই রুটে চলাচলের পারমিট নেই এমন অটোটেম্পু গুলোকে ‘মান্থলী’ দিতে হয় ৩ হাজার টাকা করে। যা প্রতি মাসে ৭০ টি গাড়ি থেকে ২ লাখ ১০ হাজার টাকা চাঁদা উঠিয়ে থাকে। এক বছরে এই ১১ নম্বর রুটে ২৪ লাখ টাকা চাঁদা আদায় হয় শুধু রুট পারমিট ছাড়া গাড়ি গুলোকে অবৈধ ভাবে চলতে দিয়ে।

কয়েকজন পরিবহন চালকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চট্টগ্রাম সীতাকুণ্ড টেম্পো মালিক সমিতির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও  রবিন মোটর্স এর কর্ণধার ইমাম উদ্দিন ইমনের ব্যাক্তিগত ভিজিটিং কার্ডে বিভিন্ন অবৈধ গাড়ির নম্বর,মাসিক টোকেনের মেয়াদ ও সংশ্লিষ্ট টি আই এর মোবাইল নম্বর উল্লেখ করা থাকে। এই কার্ডের (টোকেন) সাথে থাকলে কোন পুলিশ সার্জেন্ট এই গাড়ি গুলোতে কোন মামলা বা আটক করতে পারবে না।

বিআরটিএর তথ্য মতে চট্টমেট্রো আঞ্চলিক পরিবহন কমিটির অনুমোদিত ১১ নং রুটের যানবাহনগুলো চট্টগ্রাম নগরীর আল মাস সিনেমা-ওয়াসার মোড়-গরিবুল্লাহশাহ মাজার-ফয়েজ লেক– একে খান মোড়-কর্নেল হাট-সিডিএ পর্যন্ত চলাচল করার কথা তবে সেসব গাড়িগুলো চলছে একে খান-ফয়েজ লেক-খুলশি হয়ে জিইসির মোড় পর্যন্ত অর্থাৎ রুট কমপ্লিটও করে না এবং অন্যরুট ব্যবহার করছে। যা বিআরটিএর ভাষায় পারমিটের শর্ত ভঙ্গ। আইন প্রয়োগকারী সংস্থা হিসেবে এইসব অটোটেম্পোর বিরুদ্ধে সড়ক পরিবহন আইনের ৭৭ নং ধারা অনুযায়ি ব্যবস্থা নেওয়ার কথা নগর ট্রাফিক পুলিশের।

সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮ এর ৭৭ ধারায় বলা হয়েছে রুট পারমিট ব্যতীত পরিবহন যান চালনা করা বা চালনার অনুমতি দেওয়া ব্যক্তির অনধিক ৩ মাসের কারাদন্ড বা অনধিক ২০ হাজার টাকা অর্থদন্ড বা উভয় দন্ড হতে পারে।

অথচ দায়িত্বরত ট্রাফিক পুলিশের নাকের ডগায় এই গাড়িগুলো চললেও কোন ব্যবস্থা না নেওয়ার অভিযোগ তাদের বিরুদ্ধে। কোন রুটে কি গাড়ি চলবে তার সম্পর্কে ধারণাও নেই তাদের, এমনই জানালেন ১১ নম্বর রুটে চলাচলরত অটোটেম্পোর এক চালক। তিনি  জানান, সমিতিকে প্রতিদিন ওয়াবিল দিতে হয়। আর রুট অমান্য করে অন্য রুটে গাড়ি চালাতে গেলে পুলিশ ও নেতাকে ম্যানেজ করা লাগে। যা একেক রুটে একেক রকম। রুট পারমিট নেই এমন গাড়ির মালিকরা জানিয়েছেন, রবিন মোটর্স এর কর্ণধার ইমাম উদ্দিন ইমন কে টাকা দিলেই অবৈধ রুট বৈধ হয়ে যায়। টাকা না দিলে সন্ত্রাসী দিয়ে আটকে দেয়া হয় গাড়ি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক অটোটেম্পো মালিক জানান, গাড়ি প্রতি ৩ হাজার টাকা না দিলে এই রুটে গাড়ি চালানো যাবে না বলে হুমকি দেন ইমন। শুধু তাই নয়, চাঁদা দিতে অনেকটা বাধ্যও করছেন তিনি। আমরা এ চাঁদাবাজি থেকে মুক্তি চাই।

সূত্র অনুযায়ী,নগরীর ১১ নম্বর রুটের রুট পারমিট বিহীন অটোটেম্পো গুলোর নম্বর হলো চট্টমেট্রো-ফ-১১-২৯২৯, চট্টমেট্রো-ফ-১১-২৯৩৪, চট্টমেট্রো-ফ-১১-২২৩৭, চট্টমেট্রো-ফ-১১-২২৯৮, চট্টমেট্রো-ফ-১১-২৭৮২, চট্টমেট্রো-ফ-১১-৩০০৪, চট্টমেট্রো-ফ-১১-২২৮১, চট্টমেট্রো-ফ-১১-২০১৮, চট্টমেট্রো-ফ-১১-২৬২২, চট্টমেট্রো-ফ-১১-২৬২৩, চট্টমেট্রো-ফ-১১-২৫৮১, চট্টমেট্রো-ফ-১১-২৫৮০, চট্টমেট্রো-ফ-১১-২৯২১, চট্টমেট্রো-ফ-১১-২১৮১, চট্টমেট্রো-ফ-১১-২৩৪২, চট্টমেট্রো-ফ-১১-২৩৪১, চট্টমেট্রো-ফ-১১-২৫৫৩, চট্টমেট্রো-ফ-১১-২২৮৩, চট্টমেট্রো-ফ-১১-২৫৯৭, চট্টমেট্রো-ফ-১১-২৬১৯, চট্টমেট্রো-ফ-১১-২৮৪৫, চট্টমেট্রো-ফ-১১-২১৭১, চট্টমেট্রো-ফ-১১-২১৭২, চট্টমেট্রো-ফ-১১-২৯৩৮, চট্টমেট্রো-ফ-১১-২৯৩৯, চট্টমেট্রো-ফ-১১-২৬৭৭, চট্টমেট্রো-ফ-১১-০১৮৯, চট্টমেট্রো-ফ-১১-২২৬২, চট্টমেট্রো-ফ-১১-১৭৫৫, চট্টমেট্রো-ফ-১১-২১৭৫,চট্টমেট্রো-ফ-১১-২১৭৩, চট্টমেট্রো-ফ-১১-২৮২০, চট্টমেট্রো-ফ-১১-২৭১৯, চট্টমেট্রো-ফ-১১-২৮৫২, চট্টমেট্রো-ফ-১১-২৮৭০, চট্টমেট্রো-ফ-১১-২০৯৪, চট্টমেট্রো-ফ-১১-২৫৫১, চট্টমেট্রো-ফ-১১-২৫৪৯।

এইসব গাড়ি গুলো চট্টগ্রাম সীতাকুণ্ড টেম্পো মালিক সমিতির (রেজি নং চট্ট ১৪২৬/৮৯) ও চট্টগ্রাম অটারিক্শা অটোটেম্পু ফোরস্টোক ও সিএনজি মালিক সমিতি (রেজি:২২৩০) এই দুই সংগঠনের নামে। যদির ইমনের হুংকারে বর্তমানে ২২৩০ সংগঠনের কোন গাড়ি রাস্তায় চলতে দেয়না ট্রাফিক পুলিশ।

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম সীতাকুণ্ড টেম্পো মালিক সমিতির (রেজি নং চট্ট ১৪২৬/৮৯) যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও রবিন মোটর্স এর কর্ণধার ইমাম উদ্দিন ইমন প্রথমে রুট পারমিট আছে দাবি করলেও রুট নম্বর, গাড়ির সিলিং (সংখ্যা) ও স্টপেজ জানতে চাইলে রুট পারমিট নেই স্বীকার করে বলেন, তাঁর ২২ টা গাড়ির রুট পারমিট নেই। ট্রাফিক পুলিশের টি আই দের মাসিক মাসহারা দিয়েই তাঁরা গাড়ি চালান। তবে মাঝেমধ্যে পুলিশ মামলা দেয়, আটকও করে। এদিকে  চাঁদাবাজির অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, আমরা সরকারি সিদ্ধান্তের বাইরে চলি না।

তবে তার ভিজিটিং কার্ডকে ‘টোকেন’ হিসেবে ব্যাবহার করার বিষয়টি স্বীকার করে তিনি বলেন,আমার দোকান আছে, গ্রাহক হিসেবে অনেক কে কার্ড দেই। এখন তারা যদি এটাকে অবৈধ কোন কাজে ব্যাবহার করে সেটাতে আমি কি করবো?

জানতে চাইলে সিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) শ্যামল কুমার নাথ প্যাসেঞ্জার ভয়েসকে বলেন, সম্প্রতি নগরীর ১১ নম্বর রুট নিয়ে আমাদের কাছে কিছু অভিযোগ এসেছে। আমরা বিষয়টি দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিবো।