বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর কান পর্যন্ত গড়িয়েছে

সুদমুক্ত ঋণে গাড়ি, জনগণের ট্যাক্সের টাকায় রক্ষণাবেক্ষণ খরচ: তবুও ব্যবহার করছেন পুলের গাড়ি

Passenger Voice    |    ০৪:৪৬ পিএম, ২০২০-০৯-০২


সুদমুক্ত ঋণে গাড়ি, জনগণের ট্যাক্সের টাকায় রক্ষণাবেক্ষণ খরচ: তবুও ব্যবহার করছেন পুলের গাড়ি

প্রতিবেদক: আমলাদের গাড়ি কেনার জন্য ৩০ লাখ টাকা সুদবিহীন ঋণ দিচ্ছে সরকার। গাড়ির জ্বালানি তেল, ড্রাইভারের বেতনসহ রক্ষণাবেক্ষণ খরচ বাবদ প্রতিমাসে আরও দিচ্ছেন ৫০ হাজার টাকা। আমলারা সরকারের কাছ থেকে নেওয়া সুদমুক্ত ঋণে কেনা গাড়ি এবং তা রক্ষণাবেক্ষণে প্রতিমাসে ৫০ হাজার টাকাও তুলছেন। অথচ সেই গাড়ি সরকারি কাজে নিজে ব্যবহার না করে তা ব্যবহার করছেন পরিবারের কাজে। আর নিজে ব্যবহার করছেন সরকারি পরিবহন পুলের গাড়ি। অথচ পরিবহন পুলের গাড়ি ব্যবহার করবেন না−এমন শর্তেই নিজে গাড়ি কেনার জন্য সুদমুক্ত ঋণ নিয়েছেন সরকারের কাছ থেকে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও পরিবহন পুল সূত্রে এমন তথ্য জানা গেছে।

সূত্র জানায়, কাজে গতি আনতে আগে যুগ্মসচিব থেকে ঊর্ধ্বতন পদমর্যাদার কর্মকর্তারা এ সুযোগ পেতেন। উপসচিবরা এ সুবিধা পেতেন না। বর্তমান সরকার প্রশাসনের উপসচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তাদেরও একই সুবিধা দিয়েছেন। এসব কর্মকর্তাকে নিজস্ব গাড়ি কেনার জন্য সুদমুক্ত ৩০ লাখ টাকা ঋণ সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। এই ৩০ লাখ টাকার মধ্যে ঋণ গ্রহণকারী কর্মকর্তাকে কিস্তিতে পরিশোধ করতে হবে মাত্র ১০ লাখ টাকা, আর বাকি ২০ লাখ টাকা পরিশোধ করবে সরকার। সুদবিহীন সরকারি ঋণ সুবিধা নিয়ে উপসচিব, যুগ্মসচিব ও অতিরিক্ত সচিব মিলিয়ে প্রশাসন ক্যাডারের প্রায় দুই হাজার ৭০০ কর্মকর্তা গাড়ি কিনেছেন। এতে তাদের পেছনে সরকারের ব্যয় হয়েছে প্রায় ৮১৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে ১০ লাখ টাকা করে আমলারা পরিশোধ করবেন প্রায় পৌনে তিনশ’ কোটি টাকারও কম। আর সাড়ে ছয়শ’ কোটি টাকার বেশি পরিশোধ করতে হবে সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে। এর বাইরে এই বিপুল পরিমাণ কর্মকর্তার গাড়ি খরচ বাবদ প্রতিমাসে দেওয়া টাকার পুরোটাই সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে দেওয়া হচ্ছে। 

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, সরকারি কর্মকর্তাদের গাড়ি কেনার ঋণের অর্থ সর্বোচ্চ ১২০টি সমান কিস্তিতে অর্থাৎ ১০ বছরের মধ্যে আদায়যোগ্য। ৩০ লাখ টাকা ঋণের বিপরীতে মাসিক কিস্তি দাঁড়ায় ২৫ হাজার টাকা। তবে কিস্তির হার পুনর্নির্ধারণের সুযোগ রয়েছে। সরকারি গাড়ির আয়ুষ্কাল হচ্ছে আট বছর। এ কারণে প্রতি বছর ১০ শতাংশ হারে অবচয় বাদ দিয়ে অবশিষ্ট মূল্য পরিশোধ করে গাড়ির বন্ধককাল শেষ হবে। এক্ষেত্রে রিকন্ডিশন গাড়ির ক্ষেত্রে প্রথম বছর থেকেই এই অবচয় সুবিধা পাবেন ঋণগ্রহীতা কর্মকর্তারা। আর ঋণ পরিশোধ হওয়ার পরই গাড়িটির মালিক হবেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা। তার আগ পর্যন্ত গাড়িটি সরকারি হিসেবেই গণ্য হবে।

অভিযোগ রয়েছে, আমলারা সরকারের কাছ থেকে পাওয়া টাকায় কেনা গাড়ি নিজে ব্যবহার না করে অনেকেই তা ভাড়ায় খাটাচ্ছেন। আবার খরচ বাবদ টাকাও নিচ্ছেন। বিষয়টি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় কর্তৃপক্ষ এমনকি প্রধানমন্ত্রীর কান পর্যন্ত গড়িয়েছে। 

সরকারের জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে ২০১৭ সালের ২৫ সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত প্রাধিকারপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তাদের সুদমুক্ত বিশেষ অগ্রিম এবং গাড়ি সেবা নগদায়ন নীতিমালা, ২০১৭ (সংশোধিত) এর গেজেটে বলা আছে, প্রাধিকারপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা বিশেষ অগ্রিম নিয়ে গাড়ি কেনার জন্য পরিবহন কমিশনারের ছাড়পত্র গ্রহণপূর্বক পরবর্তী মাস থেকে গাড়ি মেরামত/সংরক্ষণ, জ্বালানি, চালকের বেতন ইত্যাদি বাবদ বরাদ্দ দেওয়া অর্থ (প্রতি মাসে ৫০ হাজার টাকা) সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা তার মাসিক বেতন বিলের সঙ্গে উত্তোলন করবেন।

নীতিমালায় গাড়ির ব্যবহার বিষয়ে বলা হয়েছে, কোনও কর্মকর্তার দাফতরিক কার্যালয় যে স্থানে অবস্থিত তার আট কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে সরকারি কাজে ভ্রমণের জন্য ওই কর্মকর্তা কোনও টিএ/ডিএ দাবি করতে পারবেন না। কোনও কর্মকর্তা চাকরিতে থাকাবস্থায় দাফতরিক প্রয়োজন শেষে গাড়িটি ব্যক্তিগত প্রয়োজনে পরিবারের সদস্যরা ব্যবহার করতে পারবেন। এক্ষেত্রে প্রাধিকারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার গাড়ি ব্যবহার বিষয়ে দূরত্ব সংক্রান্ত সরকারি নিষেধাজ্ঞা প্রযোজ্য হবে না।

নীতিমালায় সরকারি গাড়ি রিকুইজিশন নিষিদ্ধ করে বলা হয়েছে, বিশেষ অগ্রিম সুবিধা গ্রহণকারী কোনও কর্মকর্তা সাধারণভাবে তার দফতর হতে রিকুইজিশনের ভিত্তিতে কোনও গাড়ি সরকারি বা ব্যক্তিগত প্রয়োজনে ব্যবহার করতে পারবেন না।

এদিকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সরকারের প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে নিয়োজিত সুবিধাপ্রাপ্ত কিছু আমলা নিজের গাড়ি ভাড়া বা অন্য কাজে ব্যস্ত রেখে অফিসে আসছেন পরিবহন পুলের গাড়িতে অথবা অন্য কোনও সহকর্মীর গাড়িতে। সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব থেকে শুরু করে যুগ্ম সচিব ও অতিরিক্ত সচিবদের একটা বড় অংশই গাড়ি সুবিধা নিয়ে সেই গাড়ি ব্যবহার করছেন না। একই পরিবারের দুই কর্মকর্তা গাড়ি নিয়েও দুটি গাড়িই ব্যবহার না করে সরকারি দফতরের গাড়ি ব্যবহার করছেন। এমনও দেখা গেছে, একজন সচিব নিজে মন্ত্রণালয়ের একসঙ্গে ৯টি গাড়ি একা ব্যবহার করেছেন। শুধু তাই নয়, তিনি এদিক-সেদিক করে ভাউচারে এই ৯টি গাড়ির তেল খরচও নিজে নিয়েছেন।

সরকারের খাদ্য মন্ত্রণালয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু বিষয়ক মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার বিভাগ, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগ, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়, কৃষি মন্ত্রণালয়, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ, সেতু বিভাগ, ভূমি মন্ত্রণালয়সহ প্রায় সব মন্ত্রণালয়েই অনেক কর্মকর্তা সরকারের দেওয়া ঋণের টাকায় কেনা গাড়ি ব্যবহার না করে অফিসে আসেন মন্ত্রণালয়ের অধীন প্রকল্প, বিভিন্ন অধিদফতর, সংস্থা, উন্নয়ন সহযোগী বা সহকর্মীর গাড়ি ব্যবহার করে। একই পদ্ধতিতেই বাসায় ফেরেন তারা।

জানা গেছে, নীতিমালা অনুযায়ী সুদমুক্ত ঋণে কোনও কর্মকর্তা গাড়ি কিনলে তিনি সার্বক্ষণিক সরকারি গাড়ি ব্যবহার করতে পারবেন না। তবে মাঠ প্রশাসনে বা প্রেষণে অথবা প্রকল্পে কর্মরত থাকলে সরকারি গাড়ি ব্যবহার করতে পারবেন। কিন্তু ব্যক্তিগত গাড়ি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য তিনি ৫০ হাজারের অর্ধেক ২৫ হাজার টাকা পাবেন। দেখা গেছে, সরকারি অনেক আমলাই প্রকল্প ও নিজের গাড়ি দুটোই ব্যবহার করছেন আবার নিজের গাড়ির জন্য ৫০ হাজার করে টাকাও তুলছেন। এটি সুদমুক্ত বিশেষ অগ্রিম ও গাড়ি সেবা নগদায়ন নীতিমালার স্পষ্ট লঙ্ঘন।

এ প্রসঙ্গে সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার জানান, বিষয়টি স্পর্শকাতর। সরকারের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকতারা এমন অনৈতিক কাজ করতে পারেন না। অবশ্যই এর বিহিত হওয়া দরকার। এই অনিয়ম চলতে দেওয়া ঠিক না। কারণ সরকারের পক্ষ থেকে দেওয়া এসব আর্থিক সুবিধার অর্থ জনগণের দেওয়া ট্যাক্সের টাকা।

জানা গেছে, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের থেকে যে সমস্ত মাঠ প্রশাসন এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে প্রেষণে ও প্রকল্পে কর্মরত আমলারা এ ধরনের সুবিধা গ্রহণ করছেন সেই সব কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন বলেন, বিষয়টি অবগত হয়েছি। প্রধানমন্ত্রীও বিষয়টি জানেন। এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে বলে জানান তিনি।