শিরোনাম
Passenger Voice | ১২:৪২ পিএম, ২০২৬-০৮-৩১
নেপাল-চীন সীমান্তবর্তী হিমালয় অঞ্চলে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় দুদেশ মিলিয়ে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৯১৯ জনে দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে নেপালে সোমবার সকাল পর্যন্ত ৯০৩ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়ে। আর চীন গতকাল রোববার সর্বশেষ ১৬ জনের মরদেহ উদ্ধারের কথা জানিয়েছিল। খবর বিবিসি, রয়টার্স, কাঠমান্ডু পোস্ট।
গত বুধবার আঘাত হানা এ দুর্যোগে দুদেশে নিখোঁজের সংখ্যা সাড়ে চার হাজার ছাড়িয়েছে। এর মধ্যে নেপালে এখনো নিখোঁজ ৪ হাজার ২০০ জনের মতো। আর চীন অংশে নিখোঁজ রয়েছেন ৫৪৬ জন। দুদেশে নিখোঁজদের মধ্যে বিদেশী নাগরিকও রয়েছেন। অস্ট্রেলিয়া সরকার জানিয়েছে, অন্তত ৪৩ জন অস্ট্রেলীয় নাগরিক নিখোঁজ। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, নেপালে ২৭৫ জন ভারতীয় নাগরিকের খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। ভারতীয় বংশোদ্ভূত আরো ১২৮ জন নিখোঁজ রয়েছেন।
নেপালে বৈরী আবহাওয়ার মধ্যেই উদ্ধার তৎপরতা চলছে। তবে জীবিতদের উদ্ধারের পাশাপাশি মরদেহ ব্যবস্থাপনাও বড় সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে। নদীর স্রোতে ভেসে যাওয়া মরদেহ পৌঁছেছে চিতওয়ান পর্যন্ত। দীর্ঘ সময় পানিতে ও ধ্বংসস্তূপের নিচে থাকার কারণে অনেক মরদেহে পচন ধরেছে। ফলে স্বাভাবিক উপায়ে পরিচয় শনাক্ত করা প্রায় অসম্ভব। এরই মধ্যে চিতওয়ানের দেবঘাটের একটি বনাঞ্চলে বেওয়ারিশ মরদেহের গণকবর দেয়া শুরু করেছে কর্তৃপক্ষ। জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মরদেহ দ্রুত পচে জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি তৈরি হওয়ায় দাফনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।
তবে দাফনের পরও পরিচয় শনাক্তের সুযোগ রাখা হচ্ছে। প্রতিটি মরদেহের ছবি তোলা, ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ এবং পরিচয়-সংক্রান্ত তথ্য নথিভুক্ত করা হচ্ছে। কবরের অবস্থান ও শনাক্তকরণ চিহ্ন সংরক্ষণ করা হচ্ছে, যাতে প্রয়োজনে ভবিষ্যতে মরদেহ উত্তোলন করা যায়। ডিএনএ বিশ্লেষণে নেপালকে সহায়তা করছে ভারতের ফরেনসিক দল। চীনের একটি দলের সঙ্গেও সমন্বয় করছে দেশটি।
নেপালের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে প্রায় অর্ধডজন জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গে আটকে পড়া শ্রমিকদের উদ্ধারে। কাদা ও পাথরের ধ্বংসাবশেষে সুড়ঙ্গগুলোর প্রবেশপথ বন্ধ হয়ে গেছে। উদ্ধারকারী দলের প্রকাশ করা ছবি ও ভিডিওতে দেখা গেছে, রাতের অন্ধকারে আলো জ্বালিয়ে ভারী যন্ত্রপাতি দিয়ে কাদা ও পাথর সরানোর কাজ চলছে। শ্রমিকরা কাছেই দাঁড়িয়ে উদ্ধার তৎপরতা পর্যবেক্ষণ করছেন। সেনাসদস্যরা টর্চের আলো ব্যবহার করে খনন করা একটি বড় গর্তের ভেতর দিয়ে একটি সুড়ঙ্গে প্রবেশের পথ খুঁজছেন।
নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বন্যাকবলিত অঞ্চলের বিভিন্ন জলবিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে ৯৩৩ জন নিখোঁজ রয়েছেন। আন্তর্জাতিক রেড ক্রসের হিসাবে, দুর্যোগে ৯০ হাজারের বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকতে পারেন। চীন এ দুর্যোগকে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের সঙ্গে যুক্ত করেছে।
নেপাল সেনাবাহিনীর মুখপাত্র রাজা রাম বাসনেত রয়টার্সকে বলেন, প্রচুর পরিমাণ ধ্বংসাবশেষ জমে গেছে। এতে সুড়ঙ্গগুলো খুলে দেওয়া আমাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমাদের প্রধান লক্ষ্য সুড়ঙ্গগুলো খুলে দেয়া।
প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ বন্যাকে ‘নজিরবিহীন ও ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ হিসাব তৈরি করাও এখনো কঠিন হয়ে পড়েছে। রোববার রাতে ফেসবুকে দেয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, প্রতিকূল আবহাওয়া, দুর্গম ভূখণ্ড ও চলমান ঝুঁকি সত্ত্বেও নাগরিকদের জীবন রক্ষায় সরকার দৃঢ়ভাবে কাজ করছে। উদ্ধার অভিযানে বেসামরিক কর্মী ও স্বেচ্ছাসেবকদের পাশাপাশি প্রায় ২১ হাজার নিরাপত্তাকর্মী নিয়োজিত রয়েছেন বলেও জানান তিনি।
এদিকে চীনের তিব্বতে ২৩টি দেশের ২৬১ জন বিদেশী নাগরিকের কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না বলে জানিয়েছে বেইজিং। দেশটির রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভি জানিয়েছে, নিখোঁজদের উদ্ধারে ২ হাজার ১০০জনেরও বেশি উদ্ধারকর্মী মোতায়েন করা হয়েছে। ত্রাণ ও উদ্ধার তৎপরতায় অন্তত ২২ কোটি ইউয়ান বা প্রায় ৩ কোটি ৩০ লাখ ডলার বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। সম্মুখসারির উদ্ধারকারীদের কাছে বিমান থেকে সরঞ্জাম ও ত্রাণসামগ্রী পৌঁছে দেয়া হচ্ছে। নিখোঁজদের সন্ধানে চীনা সেনারা জীবন শনাক্তকারী বিশেষ যন্ত্রও ব্যবহার করছে।
সোমবারের এক হালনাগাদ প্রতিবেদনে চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, শনিবার সন্ধ্যায় সৃষ্ট হ্রদসদৃশ জলাধারটি প্রাকৃতিকভাবেই পানি ছেড়ে দিয়েছে এবং পরিস্থিতি অনেকটাই স্বাভাবিক হয়েছে। তবে মঙ্গলবার পর্যন্ত জিরং এলাকায় অব্যাহত বৃষ্টিপাত হতে পারে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভি জানিয়েছে, সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত কয়েকটি এলাকায় এক মিটারেরও বেশি পুরু পলির স্তর জমেছে। এতে উদ্ধারকাজ কঠিন হয়ে পড়েছে এবং মানুষ সহজেই পলির নিচে আটকা পড়তে পারে।
সীমান্তবর্তী এলাকায় এখনো নিখোঁজদের সন্ধানে তল্লাশি ও উদ্ধার অভিযান চলছে। অভিযানে ১১৭ জন দমকলকর্মী ও ১৩টি প্রশিক্ষিত উদ্ধারকারী কুকুর মোতায়েন করা হয়েছে। রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যমটি জানিয়েছে, এ পর্যন্ত দুই দফা তল্লাশি অভিযান শেষ হয়েছে।
চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভি জানিয়েছে, দীর্ঘমেয়াদি বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাবে হিমবাহের অস্থিতিশীলতা থেকে এ বন্যার সৃষ্টি হয়েছে। তিব্বত মালভূমিতে এ ধরনের ঘটনা ‘ক্রায়োস্ফিয়ার দুর্যোগের নতুন ও ক্রমবর্ধমান বৈশিষ্ট্য’ বলেও উল্লেখ করেছে তারা।
তবে এ বছরের শুরুতে দুর্যোগ মোকাবেলায় সহযোগিতা জোরদারের বৈঠকের পর হিমবাহের ঝুঁকি ও পানির স্তর নিয়ে চীন খুব বেশি তথ্য নেপালের সঙ্গে ভাগ করেনি বলে রয়টার্সকে জানিয়েছেন দুই নেপালি কর্মকর্তা। তাদের আশঙ্কা, তথ্য আদান-প্রদানের ঘাটতি ভবিষ্যৎ দুর্যোগ মোকাবিলার প্রস্তুতিকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। এ বিষয়ে মন্তব্যের জন্য চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তারা সাড়া দেয়নি।
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত 2019 - 2026 PassengerVoice | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Developed By Muktodhara Technology Limited.
পাবলিক মতামত