চট্টগ্রাম বন্দরে নানা জটিলতায় ব্যবসায়ীদের ভোগান্তি ও খরচ বাড়ছে

Passenger Voice    |    ১১:২৪ এএম, ২০২৬-০৮-২৩


চট্টগ্রাম বন্দরে নানা জটিলতায় ব্যবসায়ীদের ভোগান্তি ও খরচ বাড়ছে

দেশের আমদানি-রপ্তানির ৮০ ভাগই চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে হয়। এ বন্দরের বিরাজমান সমস্যার কারণে ব্যবসায়ের খরচ বাড়ছে। দেশের অন্যতম এ বন্দরের চলমান সমস্যার দ্রুত সমাধান চেয়েছেন ব্যবসায়ীরা। বিশেষভাবে নতুন স্ক্যানার মেশিন যুক্ত করা, নিরাপত্তা বৃদ্ধিসহ বন্দরের শুল্কসংক্রান্ত জটিলতার সমাধান চেয়েছেন।

তারা চট্টগ্রাম বন্দরে গতি আনতে জাহাজ থেকে পণ্য খালাস, কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স, কনটেইনার ডেলিভারিসহ অন্য কাজগুলো দ্রুত ও সমন্বিতভাবে করার পরামর্শ দিয়েছেন। কারণ বহির্নোঙরে দেরি হলে কার্গো রিলিজের জটিলতা ও কনটেইনার দীর্ঘদিন পড়ে থাকার কারণে আর্থিক ক্ষতিপূরণ দিতে হচ্ছে। বন্দরের পুরো কার্যক্রম দ্রুত ও নির্বিঘ্ন করতে না পারলে ব্যবসায়ে খরচ বাড়বে।

ব্যবসায়ীরা আরও বলছেন, চট্টগ্রাম বন্দরের দিকে যখন দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের চোখ পড়েছে ঠিক তখনই ঘটতে শুরু করেছে একের পর এক সমালোচিত ঘটনা। বন্দর চ্যানেল বা বহির্নোঙরে দফায় দফায় জাহাজে জাহাজে সংঘর্ষ, নেভিগেশন চ্যানেলে জাল ফেলাকে ঘিরে লাইটার জাহাজ-সংশ্লিষ্টদের অসন্তোষ, বহির্নোঙরে জলদস্যুতা–এসব কিছুই যেন বন্দরের সব অর্জনকে ধুলোয় মিশিয়ে ফেলছে।

খালি কনটেইনার নিয়ে চিঠি চালাচালি
চট্টগ্রাম বন্দরে চাপ কমাতে খালি কনটেইনার বন্দর ও অফডকের মতো বন্ডেড এরিয়া থেকে সরিয়ে ‘নন বন্ডেড’ এলাকায় রাখতে গত ২৬ জুলাই জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে চিঠি দেয় বন্দর কর্তৃপক্ষ। চিঠিতে বলা হয়, বন্দরের অভ্যন্তরে আমদানি করা সব এলসিএল কনটেইনার ‘আনস্টাফিং’সহ ৭০ শতাংশ এফসিএল কনটেইনার খুলে ডেলিভারি দেওয়া হয়। খালি কনটেইনারের স্তূপ বাড়ছে।

একই ইস্যুতে গত ৩০ জুলাই অর্থমন্ত্রীকে চিঠি দেয় চট্টগ্রাম চেম্বার। বন্দরের ভেতরে দীর্ঘদিন পড়ে থাকা খালি কনটেইনার নন-বন্ডেড এলাকায় নেওয়ার অনুমতি চেয়ে চিঠিতে বলা হয়, বর্তমানে খালি কনটেইনার সংরক্ষণজনিত প্রচণ্ড চাপের কারণে চট্টগ্রাম বন্দরের উৎপাদনশীলতা প্রত্যাশিত পর্যায়ে উন্নীত হচ্ছে না। অপ্রয়োজনীয়ভাবে বন্দর ও বেসরকারি কনটেইনার ডিপোগুলোতে খালি কনটেইনার জমা হওয়ার কারণে ইয়ার্ডের ধারণক্ষমতার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে। ২০ ফুট কনটেইনারের তুলনায় ৪০ ফুট কনটেইনারের চাহিদা বেশি থাকায় ২০ ফুট খালি কনটেইনার দীর্ঘ সময় অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে থাকে।

কনটেইনার গায়েব
চলতি বছর ঢাকার খিলক্ষেত সুপার মার্কেটের ফাহিম অ্যাটায়ার অ্যান্ড কম্পোজিট লি. নামে একটি প্রতিষ্ঠানের আমদানি করা ফেব্রিক্স পণ্যবাহী একটি কনটেইনার গায়েব হয়। চট্টগ্রাম বন্দর থানায় দায়েরকৃত এজাহারে বলা হয়, চীন থেকে ফেব্রিক্স পণ্যবাহী ৪০ ফুট দীর্ঘ একটি কনটেইনার (কনটেইনার নম্বর কেওসিইউ-৪৮২৯৩৯৯) গত ২১ জানুয়ারি টার্মিনাল অপারেটর মেসার্স সাইফ পাওয়ারটেক লিমিটেডের মাধ্যমে জাহাজ থেকে ডিসচার্জ করে চিটাগং কন্টেইনার টার্মিনালে (সিসিটি) রাখা হয়। পণ্যবাহী কনটেইনারটি গত ২৮ এপ্রিল কাস্টমসের পণ্য যাচাইয়ের জন্য অ্যাসাইনমেন্টভুক্ত ছিল। কিন্তু সিসিটি ইয়ার্ডের ডায়েরি থেকে জানা যায়, কনটেইনারটির অবস্থান খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।

বিদেশিদের কাছে টার্মিনাল ইজারা ইস্যুতে আন্দোলন চলমান
চট্টগ্রাম বন্দরের এনসিটি ও সিসিটি টার্মিনাল দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠানের নিকট ইজারা দেওয়ার ষড়যন্ত্র বন্ধ এবং বন্দরকে জাতীয় মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণে রাখার দাবিতে সমাবেশ ও মানববন্ধনসহ বিভিন্ন কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছে চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা কমিটি ও শ্রমিক-কর্মচারী ঐক্য পরিষদ (স্কপ)।

চলতি মাসে জাহাজে দফায় দফায় সংঘর্ষ
গত ৩ আগস্ট দুপুরে মাল্টার পতাকাবাহী কনটেইনার জাহাজ ‘এমভি সিএনসি ইউরেনাস’ চট্টগ্রাম বন্দরের প্রবেশমুখে পৌঁছালে জাহাজটির স্টিয়ারিং গিয়ার বিকল হয়ে যায়। নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে জাহাজটি প্রথমে ২ নম্বর লাল সংকেত বয়ায় ধাক্কা দেয়। এরপর ভাসতে ভাসতে নৌবাহিনীর স্থাপনার পাশে পাথরের বাঁধে আটকে পড়ে।

বন্দরের বহির্নোঙরে গত ১৪ আগস্ট দুপুরে পাশাপাশি নোঙর করে থাকা ৩৩ হাজার টন ডিজেলবাহী ট্যাংকার ‘এমটি সি স্পাইক’ ও গমবাহী বাল্ক ক্যারিয়ার ‘এমভি সানশাইন’-এর সংঘর্ষ হয়। ঘটনাটি তদন্তে দুই সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি হয়েছে। গত ১৬ আগস্ট রাতে বহির্নোঙরে থাকা স্ল্যাগবাহী জাহাজ ‘এমভি আনাসসা’ প্রবল স্রোতের কারণে পাশের ‘এমভি জাহাব জাহানের’ মধ্যে সংঘর্ষ হয়।

লাইটারেজ শ্রমিকদের অভিযোগ
লাইটারেজ শ্রমিকদের অভিযোগ–দীর্ঘদিন ধরে পতেঙ্গা জেলেপাড়া থেকে পারকি বিচ, শিপ চ্যানেল আলফা থেকে কুতুবদিয়া এবং পতেঙ্গা থেকে ভাসানচর পর্যন্ত সাগরে ভাসমান ও বিন্দি জাল পেতে রাখা হচ্ছে। জাহাজের প্রপেলারে জাল আটকে নিয়মিত দুর্ঘটনা ঘটছে। অনেক সময় ভুলবশত জাল কেটে গেলে মৎস্যজীবীরা আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠেন এবং নাবিকদের ওপর পাথর নিক্ষেপসহ হামলার ঘটনা ঘটে। সম্প্রতি ভাসানচর এলাকা থেকে দুই লাইটার জাহাজের দুই নাবিককে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়, যাদের পরবর্তী সময়ে উদ্ধার করা হয়।

গত ১০ আগস্ট বন্দর চেয়ারম্যানকে চিঠি দেয় বাংলাদেশ লাইটারেজ শ্রমিক ইউনিয়ন। আগামী ২৫ আগস্টের মধ্যে নেভিগেশন চ্যানেল থেকে জাল সরানোর কার্যকর উদ্যোগ না নিলে বহির্নোঙরে লাইটার জাহাজ চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ করার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়।

বাংলাদেশ লাইটারেজ শ্রমিক ইউনিয়নের সিনিয়র সহ-সভাপতি নবী আলম বলেন, ‘বন্দর চ্যানেলে জেলেরা জাল ফেলার কারণে আমরা সীমাহীন ভোগান্তি পোহাচ্ছি। আজকেও আমরা নিজেদের ব্যবস্থাপনায় ডুবুরি দিয়ে জাল সরিয়েছি। জাল সরালে জেলেরা পাথর নিক্ষেপ করে, খারাপ ব্যবহার করে। এ নিয়ে আমরা বন্দর কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়েছি। এ সমস্যার সমাধানে বন্দর কর্তৃপক্ষকে ২৫ আগস্ট পর্যন্ত সময় দিয়েছি। এর মধ্যে পরিস্থিতির উন্নতি না হলে লাইটার জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেব।’

এদিকে পতেঙ্গা ও পারকি এলাকার জেলেদের প্রতিনিধি ও বোট মালিক মো. এরশাদ আলী বলেন, লাইটার জাহাজগুলো আমাদের নির্ধারিত সংকেত বা আলোর তোয়াক্কা না করে জালের ওপর দিয়ে চলে যায়, এতে জাল নষ্ট হয়। ক্ষতিপূরণ তো পাই না, উল্টো আমাদের হামলাকারী বা জলদস্যুর অপবাদ দেওয়া হয়।

লাইটার জাহাজ ‘শেখ এন্টারপ্রাইজের’ মালিক মো. জাহাঙ্গীর বলেন, নৌযান চলাচলের পথে জাল পেতে রাখা একটা উছিলা। মূলত নৌযান যখন জালে আটকে যায় তখন ডাকাতি হয়। অর্থাৎ ডাকাতিই তাদের মূল উদ্দেশ্য। বন্দর কর্তৃপক্ষ কোস্টগার্ডকে দায়িত্ব দিয়েছে সমস্যাটি সমাধানের জন্য।

বহির্নোঙরে জলদস্যুতা প্রতিরোধ ও জাহাজের নিরাপত্তা জোরদারে মন্ত্রণালয়ে চিঠি
চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে জলদস্যুতা প্রতিরোধ ও জাহাজের নিরাপত্তা জোরদারে ২২ আগস্ট নৌপরিবহন মন্ত্রীকে চিঠি দেয় চট্টগ্রাম চেম্বার। চিঠিতে বলা হয়, গত এক মাসের ব্যবধানে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে তিনটি বিদেশি বাণিজ্যিক জাহাজে জলদস্যুতার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় কয়েক কোটি টাকার মালামাল, জাহাজের সরঞ্জাম ও মূল্যবান যন্ত্রাংশ লুট হয়েছে। এতে বিদেশি জাহাজের মালিক, শিপিং এজেন্ট এবং নাবিকদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।

আন্তর্জাতিক সমুদ্র নিরাপত্তা সংস্থা রিজিওনাল কো-অপারেশন এগ্রিমেন্ট অন কমবেটিং পাইরেসি অ্যান্ড আর্মড রবারি এগেইনস্ট শিপস ইন এশিয়ার (রিক্যাপ) সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০২৬ সালের প্রথম চার মাসে (জানুয়ারি-এপ্রিল) চট্টগ্রাম বন্দরে কোনো প্রকার দস্যুতা বা চুরির ঘটনা ঘটেনি। কিন্তু সাম্প্রতিক চুরির ঘটনাগুলো রিক্যাপ প্রতিবেদনে প্রভাব ফেলতে পারে। তাই ঝুঁকিপূর্ণ স্পটগুলোতে কোস্টগার্ডের টহল জোরদার ও গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি করতে হবে।

চট্টগ্রাম বন্দরের সাবেক পরিচালক মাহফুজুল হক শাহ বলেন, বন্দর চ্যানেল বা বহির্নোঙরে জাহাজের সংঘর্ষ, নৌযান চলাচলের পথে জেলেদের জাল ফেলা, বহির্নোঙরে জলদস্যুতা–এসব সমস্যা সমাধানে বন্দরকেই উদ্যোগ নিতে হবে। অন্যথায় বন্দরের সুনাম ক্ষুণ্ন হতে পারে।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম বলেন, প্রাকৃতিক কারণে বা স্রোতের টানে জাহাজের সংঘর্ষের ঘটনাটি ঘটেছে। ঘটনাগুলোর তদন্ত চলমান। তদন্তের পর হয়তো বিস্তারিত জানা যাবে। নৌযান চলাচলের পথে জেলেদের জাল ফেলার বিষয়ে আমরা বেশকিছু পদক্ষেপ নিয়েছি। আমরা তাদের গণবিজ্ঞপ্তি দিয়েছি। তাদের আরও বেশি সচেতন করার জন্য সব ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সার্বিক নিরাপত্তা বাড়ানোর জন্য বন্দরের বহির্নোঙরে নিয়মিত অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। সূত্র খবরের কাগজ