শিরোনাম
Passenger Voice | ১১:০৯ এএম, ২০২৬-০৮-২০
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনার পরও ব্যাংক খাতে ঋণ ও আমানতের গড় সুদহারের ব্যবধান বা স্প্রেড কমেনি। বরং জুন শেষে ব্যাংক খাতের গড় স্প্রেড দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক ৭০ শতাংশে, যা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্ধারিত ৪ শতাংশ সীমার চেয়ে ১ দশমিক ৭০ শতাংশীয় পয়েন্ট বেশি। কোনো কোনো বিদেশি ব্যাংকে এ ব্যবধান ৮ শতাংশের বেশি। ফলে ঋণের সুদ কমিয়ে ব্যবসা ও বিনিয়োগের ব্যয় কমানোর উদ্যোগটি কেবল নির্দেশনাতেই সীমাবদ্ধ, এখনো বাস্তবে পুরোপুরি কার্যকর হয়নি।
ব্যাংক খাতে স্প্রেডের এই উচ্চ হার মূলত আমানত ও ঋণের সুদহারের বড় ব্যবধানকে তুলে ধরে। জুন শেষে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর আমানতের গড় সুদ ছিল ৫ দশমিক ৬৯ শতাংশ, আর ঋণের সুদ ১১ দশমিক ৩৩ শতাংশ। ফলে স্প্রেড দাঁড়ায় ৫ দশমিক ৬৪ শতাংশ। বেসরকারি ব্যাংকে আমানতের সুদ ৬ দশমিক ৫২ শতাংশের বিপরীতে ঋণের সুদ ছিল ১২ দশমিক ৯ শতাংশ, ফলে স্প্রেড ৫ দশমিক ৫৭ শতাংশ।
বিদেশি ব্যাংকগুলোর ব্যবধান আরও বেশি। জুন শেষে এ খাতের স্প্রেড ছিল ৮ দশমিক ২৭ শতাংশ। এসব ব্যাংক আমানতে গড়ে ২ দশমিক ১০ শতাংশ সুদ দিলেও ঋণ বিতরণ করেছে ১০ দশমিক ৩৭ শতাংশ সুদে। বিপরীতে বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর স্প্রেড ছিল সবচেয়ে কম, ৩ দশমিক ৫০ শতাংশ। এ খাতে আমানতের গড় সুদ ৭ দশমিক ২০ শতাংশ এবং ঋণের সুদ ১০ দশমিক ৭০ শতাংশ।
মে মাসের চিত্রও প্রায় একই ছিল। ওই মাসে ব্যাংক খাতে আমানতের গড় সুদ ছিল ৬ দশমিক ২২ শতাংশ এবং ঋণের গড় সুদ ১১ দশমিক ৯২ শতাংশ। ফলে স্প্রেড ছিল ৫ দশমিক ৭০ শতাংশ। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে সার্বিক স্প্রেডে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসেনি।
এই পরিস্থিতিতে গত ৩০ জুন ব্যাংকগুলোকে নতুন নির্দেশনা দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। ক্রেডিট কার্ড ও ভোক্তাঋণ ছাড়া অন্যান্য ঋণে আমানত ও ঋণের গড়ভারিত সুদহারের ব্যবধান ৪ শতাংশের মধ্যে রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভাষ্য, অতিরিক্ত স্প্রেডের কারণে ব্যবসা-বাণিজ্যের অর্থায়ন ব্যয় বাড়ছে। এতে উৎপাদন ও বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
তবে ব্যাংকারদের মতে, বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে দ্রুত স্প্রেড কমানো সহজ নয়। আমানত সংগ্রহে ব্যাংকগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা বেড়েছে। একই সঙ্গে খেলাপি ঋণ বাড়ায় প্রভিশন সংরক্ষণে বিপুল অর্থ আটকে যাচ্ছে। পরিচালন ব্যয়ও বেড়েছে। এসব খরচ সামাল দিতে ঋণের সুদহার কমানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক চেয়ারম্যান ও মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের সিদ্ধান্ত ব্যাংকগুলোকে মানতেই হবে। তবে ঋণ ও আমানতের সুদহার নির্ধারণে বাজারের প্রতিযোগিতার বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। তাঁর মতে, আমানত সংগ্রহের সক্ষমতা ও বাজার পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করেই ব্যাংকগুলোকে সিদ্ধান্ত নিতে হয়।
নতুন নির্দেশনায় সবচেয়ে বেশি উদ্বেগে রয়েছে এসএমই খাতে বেশি ঋণ দেওয়া ব্যাংকগুলো। কারণ, ছোট উদ্যোক্তাদের ঋণ দিতে বড় ঋণের তুলনায় পরিচালন ব্যয় বেশি। ফলে ৪ শতাংশ স্প্রেডে এই ব্যয় মেটানো কঠিন বলে মনে করছে ব্যাংকগুলো।
এসএমই খাতে অন্যতম বড় ঋণদাতা ব্র্যাক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তারেক রেফাত উল্লাহ খান এ প্রসঙ্গে বলেন, এই খাতে ঋণের পরিচালন ব্যয় বেশি হওয়ায় ব্যাংকের আয় ও ব্যয়ের অনুপাত প্রায় ৬৫ শতাংশ। ফলে মাত্র ৪ শতাংশ স্প্রেডে খরচ মেটানো কঠিন। এ কারণে এসএমই ঋণকে স্প্রেডের সীমা থেকে অব্যাহতি দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনার আহ্বান জানান তিনি।
উচ্চ ঋণসুদের চাপ পড়ছে ব্যবসায়ীদের ওপরও। বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম জানান, কাঁচামাল, গ্যাস-বিদ্যুৎ ও ডলারের মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে ১২-১৪ শতাংশ সুদে ঋণ নিয়ে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে ছোট উদ্যোক্তারা বেশি চাপে রয়েছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, ব্যবসা-বাণিজ্যের গতি বাড়াতেই স্প্রেড ৪ শতাংশের মধ্যে রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বিদ্যমান ঋণ ও আমানতের ব্যবস্থাপনায় তাৎক্ষণিক পরিবর্তনের সুযোগ নেই। তবে নতুন ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে নির্দেশনাটি কার্যকর করতে হবে।
অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরীর মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে স্প্রেড ৪ শতাংশে সীমিত রাখার সিদ্ধান্ত যৌক্তিক ও সাময়িক পদক্ষেপ। তবে শুধু নির্দেশনা দিয়ে দীর্ঘ মেয়াদে এ ব্যবধান কমানো যাবে না। খেলাপি ঋণ, সুশাসনের ঘাটতি ও ব্যাংকের অদক্ষতা কমিয়ে খাতটির কাঠামোগত সংস্কার করতে হবে। একই সঙ্গে ব্যাংকগুলোকে সুদের ব্যবধান বাড়ানোর বদলে দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর দিকে নজর দিতে হবে।
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত 2019 - 2026 PassengerVoice | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Developed By Muktodhara Technology Limited.
পাবলিক মতামত