শিরোনাম
Passenger Voice | ০১:৩২ পিএম, ২০২৬-০৮-১৬
বাজার মূল্য যথাযথভাবে বিশ্লেষণ না করে মেট্রোরেলের এমআরটি-১ প্রকল্পের বিভিন্ন ঠিকাদারি প্যাকেজে দরপত্র আহ্বান করে বিপাকে পড়েছে ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল)। অভিযোগ করা হয়েছে, দরপত্রে অনেক ‘অসংগতিপূর্ণ’ আছে। এই প্রকল্পের নানা ঠিকাদারি কার্যক্রমের আগে প্রাক-প্রাথমিক আলোচনায় আগ্রহ দেখানো অনেক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান (আন্তর্জাতিক কনসোর্টিয়াম) শেষ পর্যন্ত সরে যাচ্ছে। ডিএমটিসিএল দরপত্রে ‘অবাস্তব শর্ত’ আরোপ করছে–এমন অভিযোগ আনছে এই প্রতিষ্ঠানগুলো। এমআরটি-১ প্রকল্পের অগ্রগতি প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে ও মেট্রোরেলসংক্রান্ত বিভিন্ন দপ্তরে যোগাযোগ করে মিলেছে এমন তথ্য।
‘প্রি-কোয়ালিফাইড’ ঠিকাদার সরে যাচ্ছে
এমআরটি-১ প্রকল্পের কন্ট্রাক্ট প্যাকেজের (সিপি-৩) ক্ষেত্রে নানা অব্যবস্থাপনা দেখা গেছে। এই প্যাকেজের ঠিকাদারি কার্যক্রমের জন্য জাপানের পাঁচটি প্রতিষ্ঠানকে প্রাথমিকভাবে মনোনীত করে (প্রি-কোয়ালিফাইড) ডিএমটিসিএল। ২০২৩ সালের মার্চে এই ঠিকাদারি প্যাকেজের দরপত্র আহ্বান করা হয়। তখন ‘দরপত্রে অবাস্তব শর্তাবলি’ ও ‘ভুল বাজার বিশ্লেষণের’ অভিযোগ তুলে জাপানের সেই পাঁচ প্রতিষ্ঠান দরপত্রে অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকে। এরপর তিন বছর কেটে গেছে। সিপি-৩-এর দরপত্র প্রক্রিয়া তিন বছর আগের অবস্থানেই আটকে আছে।
প্রকল্পের অগ্রগতি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘সিপি-৩’-এর দরপত্র পুনরায় আহ্বান করতে দুই দফায় খসড়াপত্র পাঠানো হয়েছে জাইকার কাছে। এ বছরের ৯ মার্চ সর্বশেষ চিঠি দেওয়া হয় জাইকাকে। কিন্তু জাইকা এখনো সেই খসড়াপত্রে অনুমোদন দেয়নি।
এদিকে সিপি-৪ প্যাকেজে সর্বনিম্ন দরদাতা হয়েছে জাপানের টোকিও-মিল কনসোর্টিয়াম। এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি চূড়ান্ত করার আগে দর-কষাকষি চলছে ডিএমটিসিএলের। ২০২৫ সালের ৪ আগস্ট এই প্রক্রিয়া শুরু হয়ে এখনো চলছে।
সিপি-৫ প্যাকেজে সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে জাপানের কাজিমা করপোরেশন প্রায় ৫ হাজার ৫৫ কোটি টাকার প্রস্তাব দিয়েছিল। প্রকল্পের কার্যক্রমে ধীরগতির কারণে কাজিমা দরপত্রের বৈধতার মেয়াদ (বিড ভ্যালিডিটি পিরিয়ড) বাড়াতে অস্বীকৃতি জানায়। পরে তারা প্রতিযোগিতা থেকে সরে দাঁড়ায়। কারণ হিসেবে প্রতিষ্ঠানটি উল্লেখ করেছে, নির্মাণসামগ্রীর দাম বৃদ্ধি। একই সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রার বিপরীতে স্থানীয় মুদ্রামানের পরিবর্তন। এখন পুরো প্যাকেজটি বাতিল হওয়ার শঙ্কা রয়েছে।
ডিএমটিসিএল এই তথ্য গোপন করতে চেয়েছিল। গত জুন মাসের প্রতিবেদনে তারা দাবি করে, সিপি-৫-এর সঙ্গে চুক্তি সম্পন্ন করার আগে দর-কষাকষি প্রায় সম্পন্ন করে আনা হয়েছে। জাইকাও ২০২৩ সালের ১২ মে এই প্রক্রিয়ায় অনুমোদন দিয়েছিল বলে উল্লেখ করা হয়। তখন বলা হয়েছিল, এই প্যাকেজের ক্রয় প্রস্তাব অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে। কিন্তু কাজিমার সরে যাওয়ার পর ডিএমটিসিএল গত জুলাইয়ের প্রতিবেদনে জানায়, এই প্যাকেজের ঠিকাদারি কার্যক্রমই থমকে গেছে।
একই কাণ্ড ঘটানো হয়েছে ‘সিপি-৬’-এর ক্ষেত্রে। এই প্যাকেজের এক নথিতে বলা হয়েছিল, এই প্যাকেজের আর্থিক প্রস্তাবের মূল্যায়ন চূড়ান্ত করা হয়েছে। ২০২৩ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি জাইকা থেকে সম্মতি পাওয়ার পর সর্বনিম্ন দরদাতার সঙ্গে দর-কষাকষি চলছে। আরেক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সর্বনিম্ন দরদাতার সঙ্গে আলোচনা চূড়ান্ত করার পর দর প্রস্তাব জাইকার অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়েছে।
এমআরটি-১ প্রকল্পের মূল মেট্রোরেল লাইনের ট্র্যাক নির্মাণের কাজের একটি প্যাকেজ সিপি-৯। কারিগরি মূল্যায়নে জাইকার সম্মতি পাওয়ার পর ২০২৫ সালের ৩ সেপ্টেম্বর এই প্যাকেজের আর্থিক প্রস্তাব খোলা হয়। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে জাইকা সেই প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে একাধিক পর্যবেক্ষণ জানায়। ডিএমটিসিএল তখন দরপত্রের বৈধতার মেয়াদ (বিড ভ্যালিডিটি পিরিয়ড) বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়। তাতে বেঁকে বসে সর্বনিম্ন দরদাতা সুমিতুমি জয়েন্ট ভেঞ্চার। ডিএমটিসিএল সূত্রে জানা যায়, এ প্যাকেজের দ্বিতীয় সর্বনিম্ন দরদাতা মিতসুবিশি-সিমেন্স কনসোর্টিয়ামকে এখন কাজ পাইয়ে দিতে তৎপর হয়েছেন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। মিতসুবিশি-সিমেন্স কনসোর্টিয়াম প্রথম সর্বনিম্ন দরদাতার চেয়ে ৭১ শতাংশ বেশি দর হাঁকিয়েছে বলে জানা গেছে।
ডিএমটিসিএলের বোর্ডসভার একজন সদস্য এ নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, ‘দরপত্রের মেয়াদ বাড়ালে ঠিকাদার তার দর ও শর্ত বদলাতে পারে না। এখানেই ঠিকাদারদের আপত্তি।’
তিনি জানান, প্রথম দরদাতাকে ধরে রাখা না গেলে এবং দ্বিতীয় সর্বনিম্ন দরদাতাকে কাজ দেওয়া হলে প্রকল্পের ব্যয় এক ধাক্কায় অস্বাভাবিক পরিমাণে বেড়ে যাবে। তাই ডিএমটিসিএল চায়, পুনরায় দরপত্র প্রক্রিয়ায় না গিয়ে সর্বনিম্ন দরদাতার সঙ্গে দর-কষাকষি করে ব্যয় যেন একটু কমিয়ে আনা যায়। এই জটিল প্রক্রিয়ায় দেড় বছর সময় অতিবাহিত হয়েছে। এখনো কোনো অগ্রগতি নেই।
‘সংশোধিত মূল্যায়ন প্রতিবেদনেও নানা ত্রুটি ধরা পড়ছে’
এমআরটি-১ প্রকল্পের ধীরগতির জন্য জাইকাকে দোষারোপ করেন ডিএমটিসিএলের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। ২০২৪ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি সিপি-৭-এর দরপত্রের আর্থিক প্রস্তাব; ২০২৫ সালের অক্টোবরে সিপি-০৮-এর দরপত্রের কারিগরি প্রস্তাব মূল্যায়ন প্রতিবেদন জাইকার অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়েছে। কিন্তু জাইকা এখনো অনুমোদন দেয়নি।
ডিএমটিসিএলের নথিপত্রের তথ্য বলছে, সংশোধিত মূল্যায়ন প্রতিবেদনেও নানা ত্রুটি ধরা পড়ছে। ২০২৩ সালের ২৮ ডিসেম্বর জাইকার কাছে সিপি-১০-এর দরপত্রের আর্থিক প্রস্তাবের মূল্যায়ন প্রতিবেদন পাঠানো হয়। জাইকা সেই প্রতিবেদনে নানা ত্রুটির কথা উল্লেখ করে সংশোধিত মূল্যায়ন প্রতিবেদন পাঠাতে চিঠি দেয় ডিএমটিসিএলকে। ডিএমটিসিএল একাধিকবার সেই প্রতিবেদন পাঠালেও সিপি-১০-এর আর্থিক প্রস্তাব চূড়ান্ত করা যায়নি।
২০২৩ সালের ৯ জানুয়ারি সিপি-১১-এর দরপত্র উন্মুক্ত করার তারিখ নির্ধারণ করা হলেও তা পিছিয়ে ২০২৬ সালের অক্টোবরে নির্ধারণ করা হয়েছে। দেড় বছরের এ দীর্ঘসূত্রতায় ভাড়া আদায়ের স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি নিয়ে কোনো ঠিকাদারের সঙ্গে প্রাক-প্রাথমিক আলোচনাও করতে পারছে না প্রকল্প কার্যালয়। ২০২৪ সালের ১ ফেব্রুয়ারি সিপি-১২-এর দরপত্র উন্মুক্ত করা হলেও বছরের পর বছর ধরে তা কেবল ‘মূল্যায়ন প্রক্রিয়াধীন’ অজুহাতে স্থবির করে রাখা হয়েছে।
তথ্য দিতে নারাজ ডিএমটিসিএল
এমআরটি-১ প্রকল্পের এসব অসংগতি নিয়ে খবরে কাগজের পক্ষ থেকে ডিএমটিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শাওগাতুল আলম, কোম্পানি সচিব খোন্দকার এহতেশামুল কবীর ও প্রকল্প পরিচালক মো. সারওয়ার উদ্দীন খানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। এহতেশামুল কবীর ও সারওয়ার উদ্দীন খান জানান, তারা ফোনে কোনো মন্তব্য জানাবেন না। তারা ডিএমটিসিএলের ভারপ্রাপ্ত জনসংযোগ কর্মকর্তা আহসান উল্লাহ শরীফির সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। খবরের কাগজের পক্ষ থেকে একাধিকবার আহসান উল্লাহ শরীফির হোয়াটসঅ্যাপ নাম্বারে এমআরটি-১ প্রকল্প নিয়ে প্রশ্ন পাঠানো হয়। গত ২৫ জুলাই থেকে এই প্রক্রিয়া চলে। কিন্তু তিনি প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে কালক্ষেপণ করেন। মো. সারওয়ার উদ্দীন খানের হোয়াটসঅ্যাপ নাম্বারেও প্রশ্নগুলো পাঠানো হয়। তিনিও কোনো উত্তর দেননি। এদিকে গত বুধবার (১২ আগস্ট) মো. শাওগাতুল আলমকে বার্তা পাঠানো হয়, ফোন করা হয় একাধিকবার। কিন্তু তিনিও সায় দেননি। এমআরটি-১ প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নেতিবাচক প্রতিবেদনের আশঙ্কায় ডিএমটিসিএল মুখে কুলুপ এঁটেছে।
ব্যয় বাড়ছে মেট্রোরেলের এই প্রকল্পে
বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর পর্যন্ত সংযুক্ত হতে যাওয়া বাংলাদেশের প্রথম ভূগর্ভস্থ মেট্রোরেল প্রকল্প এমআরটি লাইন-১-এর প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিল ৫২ হাজার ৫৬২ কোটি টাকা। এখন সেই ব্যয় ১ লাখ ২০ হাজার ৭৯৪ কোটি টাকায় উন্নীত করার প্রস্তাব করেছে বাস্তবায়নকারী সংস্থা ডিএমটিসিএল। একই সঙ্গে প্রকল্পের মেয়াদ ডিসেম্বর ২০২৬ থেকে বাড়িয়ে ডিসেম্বর ২০৩৫ পর্যন্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রকল্পটির ১২টি প্যাকেজের মূল আনুমানিক ব্যয় ছিল ৩৭ হাজার ৬৫৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকা, যা এখন ৮০ হাজার ৯৯৯ কোটি ৭৯ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে।
ডিএমটিসিএল এবং পরিকল্পনা কমিশন প্রস্তাবিত ব্যয় বৃদ্ধির প্রধান কারণ হিসেবে টেন্ডার প্রক্রিয়ার সময় অনুমানের চেয়ে বেশি দর পাওয়ার কথা জানিয়েছে। মার্কিন ডলারের বিপরীতে টাকার দরপতনও ব্যয় বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে। এই প্রস্তাব অনুমোদিত হলে ১ লাখ ৩৮ হাজার ৬৮৫ কোটি টাকার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের পর এই প্রকল্পটি ব্যয়ের দিক থেকে বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম প্রকল্প হয়ে উঠবে। এ ছাড়া এর সংশোধিত ব্যয় হবে এমআরটি-৬ (বিদ্যমান মেট্রোরেল প্রকল্প)-এর ব্যয়ের প্রায় চার গুণ। পরিকল্পনা কমিশনের অতিরিক্ত সচিব (পরিবহন উইং) মো. আলী রেজা সিদ্দিকী এ বিষয়ে বলেন, ‘উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবে (ডিপিপি) যে অর্থ নির্ধারণ করা হয়েছিল, বাস্তবে তার চেয়েও বেশি অর্থ প্রয়োজন হবে এই প্রকল্পের বাস্তবায়নে। এমআরটি-১ প্রকল্পের প্যাকেজগুলোর দর আবার পুনর্মূল্যায়ন করার পর এই অর্থ পাওয়া যাবে। এখন এই বাড়তি অর্থ পেতে পুরো প্রকল্প (১২টি প্যাকেজ) পুনর্মূল্যায়ন করতে হতে পারে।’ সূত্র খবেরর কাগজ
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত 2019 - 2026 PassengerVoice | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Developed By Muktodhara Technology Limited.
পাবলিক মতামত