সাবেক গভর্নরের জেদে গচ্চা রাষ্ট্রের শত শত কোটি টাকা

Passenger Voice    |    ০১:১৮ পিএম, ২০২৬-০৮-১৬


সাবেক গভর্নরের জেদে গচ্চা রাষ্ট্রের শত শত কোটি টাকা

রাজনৈতিক ‘জেদের বলি’ হতে চলেছে রাষ্ট্রের শত শত কোটি টাকা। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর পদে বসে ড. আহসান এইচ মনসুর টাকার নোট থেকে বঙ্গবন্ধুর ছবি সরাতে গিয়ে এক হঠকারী সিদ্ধান্ত নিয়ে বসেন। তার জেদ ও হঠকারিতার বলি হচ্ছে রাষ্ট্রের শত শত কোটি টাকা।

জুলাই অভ্যুত্থানে আওয়ামী সরকারের পতনের পর গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের অংশ বিশেষ গিয়ে পড়ে বঙ্গবন্ধুর ছবিসংবলিত টাকার ওপর। তিনি সব বণিজ্যিক ব্যাংকে চিঠি দিয়ে বঙ্গবন্ধুর ছবিসংবলিত টাকা বাজারে ছাড়তে নিষেধ করেন। শুধু তা-ই নয়, নির্ধারিত সময়ের (১৮ মাস) আগেই বঙ্গবন্ধুর ছবি বাদ দিয়ে নতুন নকশার টাকা ছাপিয়ে বাজারে আনতে এক ‘তুঘলকি’ প্রস্তুতি ঘোষণা করেন। নির্ধারিত সময়ের আগে টাকা বাজারে আনতে গিয়ে হয় নানা বিপত্তি। ভুল ছাপা (টাকার নম্বরে) ও মানসম্মত না হওয়ায় নোট বাজারে ছাড়া সম্ভব হয়নি। তার ফলস্বরূপ রাষ্ট্রকে আজ বহন করতে হচ্ছে শত শত কোটি টাকার লোকসান। আংশিক ছাপানো প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা এখনো ভল্টেই পড়ে আছে। অন্যদিকে নিম্নমানের ছেঁড়া-ফাটা নোট নিয়ে প্রতিদিনই বাজারে ভোক্তাদের ঝামেলায় পড়তে হচ্ছে।

দেশের বাজারে কেনাকাটা কিংবা দৈনন্দিন লেনদেনে গেলে সাধারণ মানুষকে এখন এক নতুন ভোগান্তির মুখোমুখি হতে হচ্ছে। পকেটে টাকা থাকা সত্ত্বেও সাধারণ ক্রেতা ও বিক্রেতারা পড়ছেন চরম অনভিপ্রেত বিপাকে।

বাজারজুড়ে ঘুরছে হাতবদল হওয়া পচা, ছিঁড়ে যাওয়া, টেপ মারা এবং জরাজীর্ণ সব কাগুজে নোট। ব্যাংকের এটিএম বুথ কিংবা কাউন্টার থেকে টাকা তুললেও হাতে আসছে পুরোনো ও ব্যবহার অনুপযোগী নোট। অথচ এই তীব্র জনভোগান্তির বিপরীত চিত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক, বাণিজ্যিক ব্যাংকের ভল্ট এবং দ্য সিকিউরিটি প্রিন্টিং করপোরেশন বাংলাদেশ লি.-এর (টাঁকশাল) প্রেসে অলস ও অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে রয়েছে শেখ মুজিবুর রহমানের ছবিসংবলিত প্রায় ১৪ থেকে ১৬ হাজার কোটি টাকার নতুন নোট।

কেবল নীতিগত সিদ্ধান্তহীনতা ও রাজনৈতিক অস্পষ্টতার কারণে প্রস্তুত কিংবা আংশিক প্রস্তুত থাকা এসব নোট বাজারে ছাড়া হচ্ছে না, যার ফলে রাষ্ট্র ইতোমধ্যেই প্রায় ২৫০ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে।

সংকট ও তার পটভূমি
সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংকিং খাতের নানাবিধ অস্থিরতা, কয়েকটি ব্যাংক একীভূতকরণের গুঞ্জন এবং ইসলামী ব্যাংকসহ অন্য ব্যাংকে তৈরি হওয়া সংকট গ্রাহকদের মধ্যে এক গভীর আস্থাহীনতার জন্ম দিয়েছে। এর ফলে সাধারণ গ্রাহকদের মধ্যে ব্যাংক থেকে নগদ টাকা উত্তোলনের হিড়িক পড়ে যায়। মানুষ ব্যাংক থেকে টাকা তুলে নিজের কাছে রাখা নিরাপদ মনে করায় বাজারে নগদ অর্থের চাহিদা ও সংকট উভয়ই একযোগে বাড়তে থাকে। গত কোরবানি ঈদের পর কেবল ইসলামী ব্যাংক থেকেই ৫ হাজার কোটি টাকার বেশি নগদ অর্থ উত্তোলন করা হয়।

চাহিদার অনুপাতে বাজারে নতুন নোটের সরবরাহ না থাকায় পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। একপর্যায়ে পুরোনো ও ছিঁড়ে যাওয়া নোট, যা স্বাভাবিক নিয়মে আগুনে পুড়িয়ে ধ্বংস করে দেওয়ার কথা, তা-ই পুনরায় বাজারে ছেড়ে দিয়ে চাহিদা মেটানোর চেষ্টা করা হয়। এমনকি দেশের প্রধান বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর এটিএম বুথ থেকেও অচলপ্রায় নোট বের হওয়ার অভিযোগ করছেন ক্ষুব্ধ গ্রাহকরা। অনলাইন লেনদেন বা এটিএম বুথে তাৎক্ষণিক টাকা ফেরত দেওয়ার সুযোগ না থাকায় এই ভোগান্তি চরমে পৌঁছেছে।

এ বিষয়ে মো. ছারোয়ার হোসেন নামের প্রাইম ব্যাংকের এক গ্রাহক বলেন, ‘প্রাইম ব্যাংকের কার্ড দিয়ে ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের এটিএম থেকে ২০ হাজার টাকা তুলেছি। এর মধ্যে তিনটি এক হাজার টাকার নোট প্রায় অচল। এখন এসব নোট ফেরত দিতে গেলেও ব্যাংকগুলো নিতে চাচ্ছে না।’

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনেকেই নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, হঠাৎ নতুন নোট বন্ধ করে দেওয়ায় বাজারে সংকট তৈরি হয়েছে। একদিকে ছাপানো টাকা ব্যবহার না করে অপচয় করা হচ্ছে, অন্যদিকে গ্রাহক ভোগান্তি বাড়ছে।

প্রেসে আটকে পড়া নোট ও আর্থিক অপচয়
বাংলাদেশ ব্যাংকের কারেন্সি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ ও টাঁকশালের একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তৈরি হওয়া নীতিগত জটিলতায় বিপুল পরিমাণ টাকা প্রেসে আটকে আছে।

তথ্যসূত্রে জানা গেছে, প্রেসে আংশিক ছাপানো, অর্ধসমাপ্ত এবং শেষ ধাপে পৌঁছানো নোটের মোট অঙ্ক প্রায় ১৪ থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকা। এসব নোটের কাগজ, নিরাপত্তা সুতা, বিশেষ কালি আমদানি এবং প্রাথমিক ছাপার বিভিন্ন ধাপে সরকারের ইতোমধ্যে প্রায় ২৫০ কোটি টাকা ব্যয় হয়ে গেছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী, যেকোনো ব্যাংকনোটের নকশা ও সিকিউরিটি ফিচার পরিবর্তন করে নতুন টাকা বাজারে আনতে স্বাভাবিকভাবে কমপক্ষে ১৮ মাস সময়ের প্রয়োজন হয়। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদে তড়িঘড়ি করে মাত্র আট মাসের মধ্যে নতুন ডিজাইন ও ছাপার উদ্যোগ নেওয়া হলেও সেখানে বানানের ভুল ও ছাপাজনিত ত্রুটি দেখা দেয়, যা প্রক্রিয়াটিকে আরও জটিল করে তোলে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, যদি এই আংশিক বা পুরো প্রস্তুতকৃত নোটগুলো বাজারে না ছাড়া হয়, তবে ইতোমধ্যে ব্যয় হওয়া ২৫০ কোটি টাকার পুরোটাই রাষ্ট্রীয় ক্ষতির খাতায় জমা হবে।

সিদ্ধান্তহীনতার ধারাবাহিকতা ও বিতর্কের শুরু
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ ও তৎকালীন গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুরের মেয়াদে নোটের নকশা পরিবর্তন ও নতুন নোট ছাপানো নিয়ে একাধিক নির্দেশনার আলোড়নে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়।

প্রথমে জানানো হয় যে বিদায়ী নোটের ডিজাইন পরিবর্তন করা হবে না এবং গভর্নরের স্বাক্ষর যুক্ত করে তা ছাপানোর জন্য প্রেসে পাঠানো হয়। পরবর্তী সময়ে উচ্চপর্যায়ের নির্দেশে শেখ মুজিবুর রহমানের ছবিসংবলিত নতুন নোটের কাজ হুট করে স্থগিত করতে বলা হয়।

২০২৫ সালের ১০ মার্চ বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে দেশের সব বাণিজ্যিক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের কাছে আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠানো হয়। চিঠিতে ব্যাংকে থাকা বঙ্গবন্ধুর ছবিসংবলিত নতুন নোট গ্রাহকদের মাঝে বিনিময় বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয় এবং গচ্ছিত নোটগুলো সংশ্লিষ্ট শাখায় সংরক্ষণের তাগিদ দেওয়া হয়। এই নির্দেশের পর থেকে বাজার থেকে নতুন নোটের সরবরাহ প্রায় পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তী সময়ে নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসার পর দেশের অর্থনৈতিক পুনর্গঠন ও প্রশাসনিক সংস্কারে নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হলেও এই অব্যবহৃত টাকার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে বিলম্ব ঘটছে।

নকশা পরিবর্তন ও উচ্চপর্যায়ের নির্দেশনা
বর্তমানে নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর রাষ্ট্রপ্রধান ও উচ্চপর্যায়ের নীতিনির্ধারকদের কাছে নতুন টাকা ছাপানোর বিষয়ে নির্দেশনা চাওয়া হয়। সূত্রে জানা গেছে, জিয়াউর রহমান বা বেগম খালেদা জিয়ার ছবিসংবলিত নতুন নোট ছাপানোর বিষয়ে পরামর্শ চাওয়া হলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অত্যন্ত স্পষ্ট ও ইতিবাচক অবস্থান ব্যক্ত করেন।

তিনি জানান, তার পরিবারের কোনো সদস্যের ছবি ব্যবহার করে বাজারে নতুন নোট ছাড়ার প্রয়োজন নেই। বরং অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক ও সময়ক্ষেপণ এড়িয়ে বর্তমান নোটের মূল কাঠামো ও সার্বিক নকশা বজায় রেখে মুদ্রণ স্বাভাবিক রাখার নির্দেশ দেন তিনি। এর ফলে ব্যক্তিকেন্দ্রিক প্রতিকৃতি নিয়ে যে রাজনৈতিক টানাপোড়েন ছিল, তার প্রশাসনিক নিরসন ঘটেছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞদের মতামত
দেশের শীর্ষস্থানীয় অর্থনীতিবিদ, ব্যাংকার এবং আর্থিক খাতের গবেষকরা মনে করছেন, শেখ মুজিবুর রহমানের ছবিযুক্ত প্রস্তুতকৃত নোট আনুষ্ঠানিকভাবে বাতিল বা নিষিদ্ধ করা হয়নি। ফলে স্রেফ নীতিগত দোলাচলের কারণে এত বিশাল অঙ্কের রাষ্ট্রীয় সম্পদ গুদামে ফেলে রেখে ২৫০ কোটি টাকার অপচয় ঘটানো কোনোভাবেই যুক্তিসংগত নয়।

সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. গোলাম মোয়াজ্জেম এ বিষয়ে বলেন, যেহেতু সরকারি কোষাগার ও প্রেসে প্রস্তুতকৃত নোট রয়েছে এবং এর পেছনে ইতোমধ্যে রাষ্ট্রের প্রচুর অর্থ ব্যয় হয়েছে, তাই এগুলো বাজারে আনার ক্ষেত্রে কোনো আইনি বা নীতিগত বাধা থাকা উচিত নয়। দেশের বর্তমান আর্থিক পরিস্থিতিতে এত বিপুল অর্থ ব্যয় করে ছাপানো নোট ফেলে রাখা একধরনের অপচয় ও বিলাসিতা। তিনি বলেন, সরকার চাইলে ভবিষ্যতে ধাপে ধাপে নকশা পরিবর্তন করতে পারে, কিন্তু এই মুহূর্তে নগদ টাকার সংকট কাটাতে এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষতি বন্ধ করতে এই নোট বাজারে ছাড়ার বিষয়টি দ্রুত বিবেচনা করা প্রয়োজন।

একই মতামত ব্যক্ত করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের এই সংশ্লিষ্ট একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, প্রতিবছর দেশে গড়ে ১৮ থেকে ২০ হাজার কোটি টাকার নতুন নোটের প্রয়োজন হয়, যার পেছনে ৪০০ থেকে ৪৫০ কোটি টাকা খরচ হয়। গত দুই বছরে পর্যাপ্ত টাকা না ছাপানোয় এবং ১৮ মাসের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার ব্যত্যয় ঘটায় বাজারে যে ঘাটতি তৈরি হয়েছে, তা মেটাতে প্রস্তুত থাকা নোটগুলো ব্যবহার করাই সবচেয়ে যৌক্তিক সমাধান।

সংকট নিরসনে সুপারিশ ও সম্ভাব্য ইতিবাচক প্রভাব
বিদ্যমান অচল অবস্থা কাটিয়ে উঠতে এবং বাজারের স্বাভাবিক লেনদেনব্যবস্থা ফিরিয়ে আনতে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, আংশিক ও সমাপ্ত অবস্থায় থাকা নোটগুলো সম্পন্ন করে পর্যায়ক্রমে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় নিয়ে আসা জরুরি। নতুন টাকা সরবরাহের মাধ্যমে বাজার থেকে পুরোনো, ছেঁড়া, ফাটা ও ময়লাযুক্ত নোট দ্রুত তুলে নিতে হবে। একই সঙ্গে গ্রাহক ভোগান্তি কমাতে ব্যাংকগুলোর এটিএম বুথে নতুন ও পরিচ্ছন্ন নোট দেওয়া বাধ্যতামূলক করতে হবে।

রাজনৈতিক বিতর্কের ঊর্ধ্বে উঠে জাতীয় অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং জনভোগান্তি লাঘবের বিষয়টি বিবেচনা করে দ্রুততম সময়ে টাঁকশালে পড়ে থাকা বিপুল পরিমাণ নতুন নোট বাজারে ছাড়ার বাস্তবমুখী সিদ্ধান্ত গ্রহণই এখন সময়ের দাবি বলে মনে করেন তারা। সূত্র খবরের কাগজ