গ্যাস-বিদ্যুৎসংকটে দিশেহারা মানুষ

Passenger Voice    |    ১১:৩১ এএম, ২০২৬-০৮-১৪


গ্যাস-বিদ্যুৎসংকটে দিশেহারা মানুষ

একদিকে গ্যাস, অন্যদিকে বিদ্যুৎসংকট। এ দুই সংকটে দিশেহারা দেশবাসী। এলএনজি সরবরাহ কমে যাওয়ায় সারা দেশে গ্যাসের চাপ কমেছে। এর প্রভাব পড়েছে বিদ্যুৎ উৎপাদনেও। ফলে দিনের পাশাপাশি গভীর রাতেও লোডশেডিং করতে হচ্ছে। গ্যাস ও বিদ্যুতের এই দ্বিমুখী সংকটে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। তবে বন্ধ থাকা এলএনজি টার্মিনাল শুক্রবার মধ্যরাতে পুনরায় চালুর আশা প্রকাশ করেছেন মহেশখালীর প্রকৌশলীরা।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, দুই সপ্তাহ ধরে গ্যাস সরবরাহ কম থাকার পর গত বৃহস্পতিবার এলএনজি সরবরাহ কিছুটা বাড়লেও সোমবার থেকে তা আবার কমতে শুরু করেছে। সোমবার এলএনজি বহনকারী একটি নতুন জাহাজ দেশে পৌঁছালেও বঙ্গোপসাগরে বৈরী আবহাওয়ার কারণে টার্মিনাল সেটি থেকে এলএনজি নিতে পারেনি। এতে সামিটের টার্মিনাল থেকে গ্যাস সরবরাহ প্রায় ২৫০ মিলিয়ন ঘনফুট কমে গেছে।

এর ফলে দেশে দৈনিক মোট গ্যাস সরবরাহ ২ দশমিক ২ বিলিয়ন ঘনফুটের নিচে নেমে গেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বুধবার থেকে সরবরাহ আরও কমে যায়। বৃহস্পতিবারও তা স্বাভাবিক হয়নি। এতে চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস সরবরাহ করতে হিমশিম খাচ্ছে বিতরণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো।

রাষ্ট্রায়ত্ত রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের (আরপিজিসিএল) উপমহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মুহাম্মদ নাছির উদ্দিন বলেন, ‘আগামী সপ্তাহের প্রথম দিকে এলএনজি সমস্যা দূর হতে পারে। আজ শুক্রবার মধ্যরাতে মহেশখালী থেকে এলএনজি সরবরাহ শুরুর সম্ভাবনা রয়েছে। তখন মানুষের দুর্ভোগ কিছুটা কমতে পারে।

গত ২১ জুলাই মার্কিনভিত্তিক প্রতিষ্ঠান এক্সিলারেট এনার্জি পরিচালিত একটি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের পর যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেয়। পরে আরপিজিসিএল ও দেশি-বিদেশি প্রকৌশলীদের যৌথ সহায়তায় টার্মিনালটি মেরামত করে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করা হয়েছিল। পরে পুনরায় সংকটে পড়তে হয় বৈরী আবহাওয়ার কারণে।

গ্যাসসংকটে বাড়ছে লোডশেডিং

গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ার প্রভাব পড়েছে বিদ্যুৎ উৎপাদনে। চট্টগ্রামে চাহিদার তুলনায় বিদ্যুতের সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হওয়ায় বিভিন্ন এলাকায় পর্যায়ক্রমে লোডশেডিং করতে হচ্ছে।

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের চট্টগ্রাম অঞ্চলের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন বলেন, ‘বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ১ হাজার ২৫০ মেগাওয়াট। রাতে চাহিদা কমে ১ হাজার মেগাওয়াটের মধ্যে চলে আসে। প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত লোডশেডিং করতে হচ্ছে। চাহিদার তুলনায় সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হওয়ায় পরিস্থিতি সামাল দিতে বিভিন্ন এলাকায় পর্যায়ক্রমে লোডশেডিং করতে হয়। গ্যাসসংকট কেটে গেলে লোডশেডিংও কমবে।’

রান্না বন্ধ, ঘুমও হারাম

একসঙ্গে গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকটে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন আবাসিক গ্রাহকরা। অনেক এলাকায় গ্যাসের চাপ এতটাই কম যে, চুলা জ্বলছে না। বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার কারণে রাতে গরমের মধ্যেও ঘুমাতে পারছেন না অনেকে।

চট্টগ্রামের কাজীর দেউড়ি এলাকার বাসিন্দা গৃহিণী কুমকুম আজাদ বলেন, ‘সকাল থেকে চুলায় গ্যাস নেই। গ্যাসের চাপ এত কম যে, রান্না করা যাচ্ছে না। পরিবারের জন্য সময়মতো খাবার তৈরি করতে পারছি না। বাধ্য হয়ে বাইরে থেকে খাবার কিনতে হচ্ছে।’

হামজারবাগ এলাকার জুলফিকার জিলান বলেন, ‘গ্যাসের সমস্যা তো আছেই, তার ওপর রাতে বিদ্যুৎও চলে যাচ্ছে। প্রচণ্ড গরমে ঘরে থাকা যাচ্ছে না। শিশু ও বয়স্কদের নিয়ে খুব কষ্টে আছি।’

শিক্ষিকা সুলতানা কাজী বলেন, ‘গ্যাস ও বিদ্যুৎ–দুটি সমস্যাই একসঙ্গে চলছে। কখন গ্যাস আসবে, কখন বিদ্যুৎ থাকবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। এতে স্বাভাবিক জীবনযাপন কঠিন হয়ে পড়েছে। ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া ঠিকমতো হচ্ছে না। তারা ক্লাসের পড়া শেষ করতে পারছে না।’

ক্ষোভ সিএনজি অটো রিকশাচালকদের

গ্যাসসংকটে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সিএনজি অটো রিকশাচালকরা। তাদের অভিযোগ, গ্যাসের চাপ কম থাকায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফিলিং স্টেশনে অপেক্ষা করতে হচ্ছে। অনেক সময় দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়েও পর্যাপ্ত গ্যাস না পেয়ে ফিরে যেতে হচ্ছে। এতে একদিকে যেমন কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে কমে যাচ্ছে দৈনিক আয়।

সিএনজি অটো রিকশাচালক মোহাম্মদ আব্বাস উদ্দিন বলেন, ‘গ্যাস নিতে এসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। গ্যাস না পেলে গাড়ি চালাব কীভাবে? আমরা গাড়ি চালিয়ে সংসার চালাই। এভাবে গ্যাসের সংকট চলতে থাকলে আমাদের আয়-রোজগার বন্ধ হয়ে যাবে।’

আরেক চালক হেলাল উদ্দিন বলেন, ‘সকাল থেকে গ্যাসের জন্য অপেক্ষা করছি। আগে এত সময় লাগত না। এখন গ্যাসের চাপ কম, আবার কোথাও কোথাও দীর্ঘ লাইন। যাত্রী নিয়ে রাস্তায় বের হওয়ার সময়ই পাচ্ছি না। অথচ কোম্পানিকে ঠিক সময়ে পরিশোধ করতে হয়। এতে সংসারের খরচ মেটানোর টাকা থাকে না।’

কেজিডিসিএলের দুঃখ প্রকাশ

কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (কেজিডিসিএল) এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, মহেশখালী এলএনজি টার্মিনাল থেকে এলএনজি সরবরাহ হ্রাস পাওয়ায় পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত কেজিডিসিএলের আওতাধীন সব শ্রেণির গ্রাহকের প্রান্তে গ্যাসের স্বাভাবিকের তুলনায় স্বল্পচাপ বিরাজ করবে। সাময়িক অসুবিধার জন্য গ্রাহকদের কাছে আন্তরিক দুঃখও প্রকাশ করেছে কর্তৃপক্ষ।

কেজিডিসিএলের উপমহাব্যবস্থাক মোহাম্মদ রফিক খান বলেন, এলএনজি সরবরাহ স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত গ্যাসের সমস্যা সমাধান হবে না। একই সঙ্গে বিদ্যুতের সমস্যাও মিটবে না। তাই বিষয়টি পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে গ্রাহকদের জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। তবে আগামী সপ্তাহের প্রথম দিন থেকে সমস্যা সমাধান হতে পারে।