শিরোনাম
Passenger Voice | ০১:১১ পিএম, ২০২৬-০৮-১৩
যশোরে রেলের যাত্রী ও রাজস্ব আয় বাড়ছে, কিন্তু সেই তুলনায় বাড়েনি যাত্রীসেবার মান। বরং সময়সূচির অনিয়ম, দীর্ঘ ক্রসিং, অপরিচ্ছন্নতা, নিরাপত্তাহীনতা ও স্টেশনে প্রয়োজনীয় সুবিধার ঘাটতিতে প্রতিনিয়ত ভোগান্তি পোহাচ্ছেন যাত্রীরা। গত অর্থবছরে জংশনটি থেকে ১১ লাখের বেশি যাত্রী ভ্রমণ করে রেলকে প্রায় ২৪ কোটি টাকা রাজস্ব দিলেও সেবার সংকট কাটেনি। ফলে আয় বাড়লেও সেবার মান উঠছে প্রশ্ন।
জানা গেছে, গত এক বছরে যশোর রেলওয়ে জংশন থেকে ট্রেনের যাত্রী এবং রাজস্ব আয় বেড়েছে ৩০ শতাংশ। আড়াই লক্ষাধিক অতিরিক্ত যাত্রীর মাধ্যমে এই টিকিট বিক্রির রাজস্ব আয়ের পরিমাণ পৌনে ছয় কোটি টাকা।
সাধারণ যাত্রীরা জানায়, রেলওয়ের যাত্রী সেবার মান বৃদ্ধি এবং কিছু সমস্যা সংকট দূর করা সম্ভব হলে ট্রেনের যাত্রী এবং রাজস্ব আদায় আরও বৃদ্ধি পাবে।
আর রেলওয়ে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, টিকিটবিহীন যাত্রীর সংখ্যা কমিয়ে আনা সম্ভব হলে রাজস্ব আদায়ের এই হার আরও বৃ দ্ধি করা সম্ভব।
যশোর রেলওয়ে জংশন সূত্র থেকে জানা গেছে, বিগত ২০২৫-২৬ অর্ধবছরে (জুলাই-২৫ থেকে জুন-২৬) যশোর রেলওয়ে জংশন থেকে মোট ১১ লাখ ৩৫ হাজার ৫৯৬ জন যাত্রী ভ্রমণ করেছেন। এর মাধ্যমে রাজস্ব আদায় হয়েছে ২৩ কোটি ৯৫ লাখ ৮৩ হাজার ২৭৫ টাকা। আর এর পূর্ববর্তী বছর অর্থাৎ ২০২৪-২৫ অর্ধবছরে (জুলাই-২৪ থেকে জুন-২৫) এই জংশন থেকে মোট ৮ লাখ ৭৬ হাজার ৭৩০ জন যাত্রী ভ্রমণ করেছেন। এই যাত্রীদের টিকিটের মাধ্যমে রাজস্ব আদায় হয়েছে ১৮ কোটি ২৫ লাখ ১৯ হাজার ৪২৯ টাকা। অর্থাৎ বিগত অর্থবছরে যশোর জংশন থেকে যাত্রী বেড়েছে প্রায় দুই লাখ ৬০ হাজার। আর রাজস্ব আয় বেড়েছে পাঁচ কোটি ৭০ লাখ টাকা। যাত্রী বৃদ্ধির হার প্রায় ৩০ শতাংশ আর রাজস্ব আয় বৃদ্ধির হার ৩১ শতাংশ।
তবে ট্রেনের যাত্রী বাড়লেও রেলসেবার মান নিয়ে সাধারণ যাত্রীদের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। সাধারণ যাত্রীদের মতে, বিভিন্ন সমস্যা সংকটের কারণে ট্রেন পিছিয়ে রয়েছে। এই সমস্যা সংকটগুলো দূর করা সম্ভব হলে রেলওয়ের যাত্রী সেবার মান বৃদ্ধি পাবে। আর সেবার মান বাড়লে যাত্রীও যেমন বৃদ্ধি পাবে, তেমনি রাজস্ব আয়ও বাড়বে।
যাত্রীদের দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে- ট্রেনের সময়সূচি মেনে চলা, ক্রসিংয়ের সময়-সংখ্যা কমিয়ে আনা, ট্রেনে-স্টেশনে যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং স্টেশনের বিশ্রামাগার, টয়লেটসহ অন্যান্য সুবিধাদি বৃদ্ধি করা।
যশোরের একটি কিন্ডারগার্টেন স্কুলের অধ্যক্ষ সাইফুর রহমান সাইফের বাড়ি অভয়নগর উপজেলার নওয়াপাড়ায়। তিনি প্রতিদিনই ট্রেনে যাতায়াত করেন।
সাইফুর রহমান সাইফ বলেন, যশোর-খুলনা রুটে ট্রেনের সবচেয়ে বড় সমস্যা ক্রসিং। সিঙ্গেল লাইন হওয়ায় ক্রসিং পড়লেই দীর্ঘসময় স্টেশনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। আর ট্রেনে দায়িত্বরত পুলিশ যাত্রীদের নিরাপত্তার চেয়ে নানা অজুহাতে টাকা তোলায় ব্যস্ত থাকে। বিভিন্ন মালামাল, ছাগল, গ্যাসের সিলিন্ডার-এসব বহনকারীদের কাছ থেকে টাকা আদায় করাই যেনো তাদের দায়িত্ব। এছাড়া প্লাটফর্মের নিরাপত্তা নিয়েও রয়েছে নানা প্রশ্ন। এমনকি যশোর স্টেশনের এই প্লাটফর্মে হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনাও ঘটেছে। আর ছিনতাই তো সাধারণ ঘটনা।
ট্রেনের যাত্রী শহরের রায়পাড়া এলাকার আকলিমা আক্তার আঁখি জানান, ট্রেনের ভেতরে পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার ঘাটতি রয়েছে। বাথরুমও ভালোভাবে পরিষ্কার থাকে না। এছাড়া স্টেশনের ওয়েটিংরুম ও বাথরুমের অবস্থাও করুণ। দ্বিতীয় প্লাটফর্মের ছাউনি ছোট। ওভারব্রিজের কোনো ছাউনি নেই। ফলে রোদ-বৃষ্টিতে যাত্রীদের পড়তে হয় চরম দুর্ভোগে। আর রাতে স্টেশনের দুই প্রান্তে বখাটে ছিনতাইকারীদের উৎপাত থাকে। ফলে নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বিগ্ন থাকতে হয়।
যশোরের সংবাদকর্মী ও এনজিও কর্মকর্তা আব্দুল কাদের প্রায়ই ট্রেনে চড়ে পেশাগত দায়িত্ব পালনে কুষ্টিয়ায় যান।
তিনি বলেন, ট্রেনের যাত্রীদের একটি অংশ টিকিট ছাড়াই ভ্রমণ করে থাকে। ঠিকমতো টিকিট চেক করা হয় না। আবার অনেক সময় টিটি এদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে নিজের পকেটেই রেখে দেয়। ফলে সরকার রাজস্ব বঞ্চিত হয়। তাই ঠিকমতো টিকিট যেমন চেক হওয়া দরকার, তেমনটি টিকিট ছাড়া ভ্রমণ রোধে প্রয়োজনে ভ্রাম্যমাণ আদালতও পরিচালনা করা উচিত। আর নিয়মিত যাত্রীদের জন্য মাসিক টিকিটের ব্যবস্থা করা দরকার।
যাত্রীদের আরও অভিযোগ, আন্তঃনগর ট্রেন বিশেষ করে রূপসী বাংলা থেকে ব্যাগ-ব্যাগেজ খোয়া যাচ্ছে। প্লাটফর্মে যাত্রী ওঠানামার সময় ব্যাগ টেনে নিয়ে চম্পট দেয় ছিনতাইকারীরা। ছিনতাইরোধে প্লাটফর্মে দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যদের তেমন তৎপরতা দেখা যায় না।
নিরাপত্তার বিষয়ে যশোর রেলওয়ে ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই মো. লিটন মিয়া বলেন, ট্রেনের অভ্যন্তরে নিরাপত্তার জন্য আলাদা পুলিশ রয়েছে। এখানে আমার নেতৃত্বে ফাঁড়িতে মোট ১৫ জন সদস্য রয়েছে। এর মধ্যে দু’জন বদলি হয়ে গেছে। আর চারজন করে পালাক্রমে ডিউটি করি।
তিনি আরও বলেন, এত বড় স্টেশনে মাত্র চারজন পুলিশ দিয়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা খুবই কঠিন। আর ছিনতাইকারীরা সাধারণত ট্রেন চলতে শুরু করলে প্লাটফর্ম এলাকার বাইরে গিয়ে ব্যাগ টেনে নিয়ে পালিয়ে যায়। ফলে অধিকাংশ সময়ে তাদের শনাক্ত বা আটক করা কঠিন হয়ে পড়ে। এজন্য স্টেশনে পুলিশ ফোর্স বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।
এদিকে রেলওয়ে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এখনও ট্রেনে টিকিটবিহীন ভ্রমণের প্রবণতা রয়েছে। এই হার কমিয়ে আনা সম্ভব হলে রাজস্ব আয়ের পরিমাণ আরও বৃদ্ধি করা সম্ভব। পাশাপাশি কিছু ট্রেনের সুবিধাদি বৃদ্ধি করা গেলেও ইতিবাচক ফল পাওয়া যাবে।
সূত্র মতে, যশোর থেকে পদ্মাসেতু হয়ে ঢাকায় যাওয়ার জন্য সকালে একটি ট্রেন খুবই দরকার। এছাড়া রূপসী বাংলার কোচ সংখ্যা বৃদ্ধি করতে হবে। রূপসা ও সীমান্ত এক্সপ্রেসের সময়মতো চলাচল করা জরুরি। বিলম্বজনিত কারণে এই দুই ট্রেনের যাত্রী কমছে। যাত্রীদের চাহিদা থাকায় সাগরদাঁড়ি ও কপোতাক্ষ এক্সপ্রেসে অন্তত তিনটি কোচ বাড়াতে হবে। বিশ্রামাগার সংস্কার করতে হবে। স্টেশনে অন্তত ৬টি ওয়াশরুম স্থাপন করতে হবে। এছাড়া দ্বিতীয় প্লাটফর্ম, ওভারব্রিজে ছাউনি বাড়াতে হবে। পাশাপাশি গাড়ি পার্কিং, অ্যাপ্রোচ সড়কও মেরামত করা প্রয়োজন।
বৃহত্তর যশোর রেল যোগাযোগ উন্নয়ন সংগ্রাম কমিটির সদস্য সচিব প্রকৌশলী রুহুল আমিন বলেন, কিছু পরিকল্পিত পদক্ষেপ গ্রহণ করা হলে রেলওয়ের যাত্রীসেবার মান যেমন বাড়বে, তেমনি রাজস্ব আয়ও বাড়বে। অবিলম্বে বেনাপোল/দর্শনা সীমান্ত-যশোর-ঢাকা রুটে ১টি প্রভাতি আন্তঃনগর ট্রেনসহ মোট ৩টি নতুন আন্তঃনগর ট্রেন চালু করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, সাধারণ ও নিম্নআয়ের মানুষের যাতায়াতের সুবিধার্থে সব আন্তঃনগর ট্রেনে পর্যাপ্ত সাধারণ বগি যুক্ত করতে হবে। দর্শনা-খুলনা রুট এবং বেনাপোল-যশোর রুটে দ্রুত ডবল রেললাইন স্থাপন করতে হবে। বেনাপোল বা দর্শনা সীমান্ত থেকে যশোর-ঢাকা রুটে নিয়মিত কমিউটর ট্রেন চালু করতে হবে। সিঙ্গিয়া রেল স্টেশনে অবিলম্বে ‘রেল কনটেইনার টার্মিনাল’ চালু করে বাণিজ্যিক সুবিধা বাড়াতে হবে। রেলকে দেশের গণযোগাযোগের প্রধান মাধ্যম হিসেবে গড়ে তোলার জন্য কার্যকর রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।
প্রকৌশলী রুহুল আমিন বলেন, এসব দাবি আদায়ে বৃহত্তর যশোর রেল যোগাযোগ উন্নয়ন সংগ্রাম কমিটি ২০২৩ সাল থেকে এই ন্যায্য দাবিতে শান্তিপূর্ণ ও নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন করে যাচ্ছে।
যশোর রেলওয়ে জংশনের স্টেশন মাস্টার সাইদুজ্জামান বলেন, গত এক বছরে যশোর জংশনে যাত্রী ও রাজস্ব আয়ের পরিমাণ অনেক বেড়েছে। তবে টিকিটবিহীন যাত্রীর সংখ্যা কমানো গেলে এই হার আরও বাড়বে।
জনবল সংকটের কারণে অনেক সময় ঠিকমতো টিকিট চেকিং করা সম্ভব হয় না বলেও তিনি স্বীকার করেন। পাশাপাশি যাত্রীসেবার মান আরও বৃদ্ধি করা প্রয়োজন বলেও তিনি মনে করেন।
স্টেশনের বিশ্রামাগার ও ওয়াশরুম বৃদ্ধি প্রয়োজন স্বীকার করে তিনি বলেন, এই স্টেশন থেকে গড়ে প্রতিদিন ৫-৬ হাজার যাত্রী ভ্রমণ করেন। এই যাত্রীদের জন্য অন্তত ৬টি ওয়াশরুম দরকার। তবে পার্শ্ববর্তী রেলবাজারের কোনো পাবলিক টয়লেট নেই। ফলে এই বাজারে কেনাকাটা করতে আসা সাধারণ মানুষের চাপও স্টেশনের টয়লেটের ওপরে পড়ে। এছাড়া বাজারের কোনো ডাস্টবিন না থাকায় স্টেশনের পার্কিং এলাকায় ময়লার স্তূপ জমে থাকে। এই সঙ্কটেরও সমাধান জরুরি। সূত্র জাগো নিউজ
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত 2019 - 2026 PassengerVoice | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Developed By Muktodhara Technology Limited.
পাবলিক মতামত