আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আটকে আছে কর্ণফুলী টানেলের আয় বাড়ানোর পরিকল্পনা

Passenger Voice    |    ১২:০৬ পিএম, ২০২৬-০৮-১২


আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আটকে আছে কর্ণফুলী টানেলের আয় বাড়ানোর পরিকল্পনা

কর্ণফুলী টানেল পরিচালনায় প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১০ লাখ টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে। বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ- আইএমইডির প্রভাব মূল্যায়ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এই ক্ষতির নেপথ্য কারণ। সেখানে বলা হয়েছে, প্রকল্পের অব্যবস্থাপনা এবং অদূরদর্শী পরিকল্পনার কারণে এই মেগাপ্রকল্প এখন জাতীয় অর্থনীতির ওপর বড় ধরনের বোঝার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এদিকে সেতু কর্তৃপক্ষ এই ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে বহুমুখী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। কর্তৃপক্ষ আশা করছে, গৃহীত উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা সম্ভব হলে এই আর্থিক ক্ষতি অনেকটা কমিয়ে আনা সম্ভব হবে। তবে আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় থমকে আছে আয় বাড়ানোর পরিকল্পনা।

এই লোকসান পোষাতে সেতু বিভাগ একগুচ্ছ মহাপরিকল্পনা নিয়েছে। এসব পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে–চট্টগ্রামের পারকি বিচ উন্নয়ন; কোরিয়ান ইপিজেডের কার্যক্রম বৃদ্ধি; চায়না ইকোনমিক ও ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন বাস্তবায়ন; আনোয়ারা প্রান্তে বন্দরের কার্যক্রম বাড়ানো; আনোয়ারা-বরকল-গাছবাড়িয়া সড়ক প্রশস্তকরণ; আনোয়ারা প্রান্তে টানেল সংযোগ সড়কের পাশে আবাসন প্রকল্প বাস্তবায়ন।

এসব পরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়নে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ), বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ও কর্ণফুলী ড্রাইডক লিমিটেড, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে চিঠি চালাচালি করছে সেতু বিভাগ।

বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের পরিকল্পনা ও উন্নয়ন অনুবিভাগের পরিচালক (পিঅ্যান্ডডি) মোহাম্মদ ভিখারুদ্দৌলা চৌধুরী দেশীয় গণমাধ্যম খবরের কাগজকে বলেন, এসব পরিকল্পনা যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হলে কর্ণফুলী টানেলের আয় বাড়বে।

প্রতিদিন ১০ লাখ টাকা লোকসান
সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের সময় দাবি করা হয়েছিল, উদ্বোধনের পর প্রতিদিন ১৭ হাজার যানবাহন চলবে এবং ২০২৬ সাল নাগাদ এই সংখ্যা বেড়ে হবে ২৮ হাজার ৩০৫। অথচ বর্তমানে টানেল ব্যবহার হচ্ছে প্রাক্কলিত লক্ষ্যের মাত্র ১৪ শতাংশ, অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে মাত্র ৪ হাজার থেকে ৪ হাজার ৫০০টি যানবাহন যাতায়াত করে। এই ভরাডুবির কারণে প্রতিদিন প্রায় ১০ লাখ টাকা লোকসান হচ্ছে। ২০২৪ সালের নভেম্বর মাস থেকে ২০২৬ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত কর্ণফুলী টানেলের আয়-ব্যয়ের হিসাব কষে এই তথ্য জানানো হয়েছে।

এখন কর্ণফুলী টানেলে টোলের মাধ্যমে যে আয় হচ্ছে, তা টানেলটির মোট পরিচালন ব্যয়ের মাত্র ৫৪ থেকে ৫৫ শতাংশ মেটানো যায়। আইএমইডির পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, শুধু টানেল নির্মাণ করলেই হয় না, এর সঙ্গে সংযোগকারী শিল্পাঞ্চল ও পরিকল্পিত নগরায়ণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন ছিল। দক্ষ জনবলের অভাব ও দুর্বল সংযোগ সড়কের কারণে টানেলটির সুফল পাওয়া যাচ্ছে না।

চট্টগ্রাম শহরের যানজট কমাতে শহরে প্রবেশ না করে দূরপাল্লার কনটেইনার ও পণ্যবাহী যানবাহন কর্ণফুলী টানেল অভিমুখী করার লক্ষ্যে এবং এর ব্যবহার বৃদ্ধির মাধ্যমে রাজস্ব আয় বাড়াতে বহুমুখী উদ্যোগ ও কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে।

মহাপরিকল্পনার অগ্রগতি ধীর
কর্ণফুলী টানেলের আয় বাড়াতে সেতু বিভাগ যে মহাপরিকল্পনা করেছে, তার অগ্রগতি খুব ধীর। সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরের কার্যক্রম পর্যালোচনায় দেখা যায়, চট্টগ্রাম শহরের যানজট কমানোর লক্ষ্যে দূরপাল্লার কনটেইনার ও পণ্যবাহী যানগুলোকে শহরের ভেতরে প্রবেশ না করিয়ে কর্ণফুলী টানেল অভিমুখী করার কাজ চলছে।

চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের (সিএমপি) সহযোগিতায় চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন এই কাজটি এগিয়ে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু জেলা প্রশাসন কোনো দাপ্তরিক ব্যবস্থা নেয়নি। তাই সেতু বিভাগ বেসরকারি বাস-ট্রাক মালিক সমিতির সঙ্গে একাধিক বৈঠক করছে। তবে কোনো অগ্রগতির খবর পাওয়া যায়নি।

চট্টগ্রামের গুরুত্বপূর্ণ দুটি দপ্তরের দুজন শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, ‘কর্ণফুলী টানেলের দিকে যদি গাড়িগুলো ঘুরিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে সেগুলো শহরের ভেতর দিয়ে যাবে না। এতে শহরের নানা পয়েন্টে যে চাঁদা দিতে হতো, সেটা বন্ধ হয়ে যাবে। এতে আয় কমে যাবে ট্রাফিক বিভাগের। সেটা সিএমপির হর্তাকর্তারা করবেন না এবং নানা খোঁড়া যুক্তি দেবেন। তারপর পরিবহন মালিকদেরও নানা সিন্ডিকেট থাকে। তারা চাঁদার পরিমাণ অনুযায়ী রুট প্ল্যান ঠিক করে রাখেন; সে মোতাবেকই গাড়ি পরিচালনা করবেন। আর শাহ আমানত সেতুতে টোল কালেকশন কমে গেলে সওজ তা মেনে নেবে কেন?’

এ বিষয়ে সেতু কর্তৃপক্ষের পরিচালক (পিঅ্যান্ডডি) মোহাম্মদ ভিখারুদ্দৌলা চৌধুরী বলেন, ‘আমরা প্রতিটি ফ্যাক্টর গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করছি। এগুলো সমাধানযোগ্য। আমরা পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে সংকট সমাধান করতে পারব।’

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় পারকি বিচের উন্নয়ন কার্যক্রম এগিয়ে নিতে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ জানিয়েছিল সেতু বিভাগ। তৎকালীন সড়ক পরিবহন ও সেতু উপদেষ্টা ড. ফাওজুল কবির খানের নির্দেশনায় সে চিঠি দেওয়া হয়েছিল। ২০২৪ সালের মে মাসে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনকে চিঠি দেওয়া হয়। কিন্তু করপোরেশন ওই চিঠির জবাব দেয়নি। সেতু কর্তৃপক্ষ এখনো হাল ছাড়েনি। তারা পর্যটন করপোরেশনের সঙ্গে যোগাযোগ চালিয়ে যাচ্ছে।

আশা দেখাচ্ছে বন্দরের কার্যক্রম
চট্টগ্রামের আনোয়ারায় কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ তীরে ৮০০ একর জমিতে ৪১০০ কোটি টাকা ব্যয়ে চায়নিজ ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন (সিইআইজেড) নির্মাণ করছে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা)। এই প্রকল্পে ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগ ও প্রায় ১ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হবে বলে আশা করা হচ্ছে। বন্দর এলাকায় কোরিয়ান বা চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল নির্মাণের কাজেও বেশ অগ্রগতি হয়েছে বলে সেতু বিভাগকে জানিয়েছে বেজা।

কর্ণফুলী নদীর আনোয়ারা প্রান্তে চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রম ও সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ এবং কর্ণফুলী ড্রাইডক লিমিটেড যৌথভাবে কাজ করছে।

কর্ণফুলী ড্রাইডক লিমিটেড সেতু বিভাগকে চিঠি দিয়ে জানিয়েছে, চট্টগ্রাম বন্দর চ্যানেলের গুপ্তাবেন্ডের আগে সমুদ্রের মোহনায় সমুদ্রগামী বড় জাহাজ ভেড়ানোর লক্ষ্যকে সামনে রেখে বিশ্ব ব্যাংকের ১০০ মিলিয়ন ডলার অর্থায়নে ৬টি জেটি তৈরি করা হয়েছে। এর মধ্যে ৩টি জেটি দিয়ে ইতোমধ্যে পণ্য খালাসের কাজও করা হয়েছে। এ ছাড়া ড্রাইডক এবং প্রায় ১০০ একর জমিতে ইয়ার্ড তৈরির কাজ চলছে।

সব কটি জেটির কার্যক্রম পুরোদমে শুরু হলে বার্ষিক ১০০ থেকে ১২০ মেট্রিক টন পণ্য হ্যান্ডলিং করা সম্ভব হবে।

বন্দর এলাকায় ৪৮.৪ একর জায়গায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের অধীনে কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (কেজিডিসিএল) ইনল্যান্ড কন্টেইনার ডিপো এবং কন্টেইনার ফ্রেইট স্টেশন স্থাপন করবে কর্ণফুলী ড্রাইডক লিমিটেড (কেডিডিএল)।

কর্ণফুলী ড্রাইডক চিঠিতে জানিয়েছে, তাদের জেটিগুলোর সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও সেগুলোর যথাযথ ব্যবহার হচ্ছে না। বন্দরের ব্যবসায়ীদের বরাত দিয়ে তারা জানিয়েছে, টানেলে ‘উচ্চহারে টোল নেওয়া হয়’ এমন অভিযোগ তোলা হচ্ছে। এ অবস্থায় টানেল দিয়ে পণ্য পরিবহন করতে ব্যবসায়ীরা নিরুৎসাহিত হচ্ছেন। এতে টানেলটি অব্যবহৃত থাকছে এবং সরকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

সেতু কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেয়। বন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, কেডিডিএল এলাকায় কনটেইনার হ্যান্ডলিং করতে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এই কার্যক্রম শুরু হলে টানেলের ব্যবহার আরও বাড়বে।

এদিকে কর্ণফুলী ড্রাইডক জানিয়েছে, টোলের হার কমালে বিএসআরএম স্টিল ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি এককভাবে বছরে ২০ লাখ মেট্রিক টন পণ্য হ্যান্ডলিং করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। এ ছাড়া অন্য বড় আমদানি-রপ্তানিকারক ও শিপিং কোম্পানিগুলো জানিয়েছে, টোলের হার কমানো হলে কনটেইনার ও পণ্য পরিবহন বাড়াবে।

কেডিডিএল জানিয়েছে, তাদের জেটিগুলো চট্টগ্রাম বন্দর চ্যানেলের গুপ্তাবেন্ডের আগে সমুদ্রের মোহনায় অবস্থিত। এই চ্যানেলের গভীরতা ১১ মিটার হওয়ায় যেকোনো ধরনের বড় জাহাজ সেখানে ভিড়তে পারবে। এখন কেডিডিএলের ৩টি জেটি চালু রয়েছে, এগুলোতে বার্ষিক ৫০ থেকে ৬০ লাখ মেট্রিক টন পণ্য হ্যান্ডলিং ক্যাপাসিটি রয়েছে। বাকি ৩টিতে হ্যান্ডলিং শুরু হলে বার্ষিক ১০০ থেকে ১২০ লাখ মেট্রিক টন পণ্য হ্যান্ডলিং সম্ভব হবে।

সেতু কর্তৃপক্ষকে লেখা চিঠিতে কেডিডিএল জানিয়েছে, তখন যদি কর্ণফুলী টানেলে টোল অন্তত ৫০ শতাংশ হ্রাস করা সম্ভব হয় তাহলে প্রতিবছরে ১০০ থেকে ১২০ কোটি টাকা অতিরিক্ত টোল আদায় হবে। এতে চট্টগ্রাম বন্দরে জাহাজজট কমে আসবে এবং বিশাল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রাও সাশ্রয় হবে।

টানেলের টোল কমাতে উদ্যোগ নিচ্ছে সেতু কর্তৃপক্ষ
বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে কর্ণফুলী টানেলের টোল কমিয়ে আনতে কারিগরি কমিটি গঠন করেছে সেতু কর্তৃপক্ষ। এই কমিটির সুপারিশ নিয়ে সেতু কর্তৃপক্ষ সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের উচ্চতর কমিটিতে প্রতিবেদন পেশ করবে। সেই প্রতিবেদনে মতামত এলে কর্ণফুলী টানেলের টোল হার কমাতে পদক্ষেপ নেবে সেতু কর্তৃপক্ষ। গত ৭ আগস্ট রাতে সেতু বিভাগের সচিব ও বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ আবদুর রউফ খবরের কাগজকে এই তথ্য জানান।

টানেল নির্মাণের সময় সম্ভাব্যতা সমীক্ষা যাচাই প্রতিবেদনে কোরিয়ান ও চায়না ইপিজেড নির্মাণের আভাস দেওয়া হয়েছিল। সেতু কর্তৃপক্ষ (বিবিএ) তখন আশা করেছিল, এই দুই ইপিজেডের গাড়ি চলাচল করলে টানেল থেকে মোটা অঙ্কের রাজস্ব পাওয়া যাবে। কিন্তু সেই দুটি ইপিজেড নির্মাণ না হওয়ায় ধারণার চেয়ে অনেক কম গাড়ি টানেলে চলাচল করছে। এতে বিশাল ক্ষতির মুখে পড়তে হয় বিবিএ-কে।

মোহাম্মদ আবদুর রউফ বলেন, ‘আমরা আশা করছি, আগামী দেড় বছরের মধ্যে এই দুই ইপিজেডের কার্যক্রম শুরু হয়ে যাবে। পাশাপাশি আনোয়ারা আবাসিক এলাকা চালু হয়ে গেলে টানেলে গাড়ির চাপ বাড়বে। আমরা প্রতিদিন যে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছি তা অচিরে কাটিয়ে ওঠা সম্ভব।’ সূত্র খবরের কাগজ