সেবাপ্রার্থীর চাপে হিমশিম বগুড়া বিআরটিএ, বেড়েছে ভোগান্তি

Passenger Voice    |    ১০:৫০ এএম, ২০২৬-০৮-১২


সেবাপ্রার্থীর চাপে হিমশিম বগুড়া বিআরটিএ, বেড়েছে ভোগান্তি

মোটরযানের ফিটনেস পরীক্ষা, চালকদের প্রশিক্ষণ ও ড্রাইভিং লাইসেন্স পরীক্ষাসহ বিভিন্ন সেবা নিশ্চিত করতে দেশের ১৫টি বৃহত্তর জেলায় ভেহিকেল ইন্সপেকশন সেন্টার (ভিআইসি) এবং মোটর ড্রাইভিং টেস্টিং অ্যান্ড ট্রেনিং সেন্টার (এমডিটিটিসি) নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল প্রায় ১২ বছর আগে। কিন্তু এত বছরেও প্রকল্পের আওতায় বগুড়াসহ সংশ্লিষ্ট জেলাগুলোতে প্রস্তাবিত স্থাপনার নির্মাণকাজ শুরু হয়নি। ফলে নিজস্ব ভবন ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর অভাবে বগুড়ায় বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটির (বিআরটিএ) সেবা কার্যক্রম চলছে সীমিত পরিসরে। এতে প্রতিদিন ভোগান্তিতে পড়ছেন বিপুলসংখ্যক সেবাপ্রার্থী।

বিআরটিএ সূত্রে জানা গেছে, অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বগুড়া সার্কেল অফিস নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০১৭ সালে বগুড়া শহরের ছিলিমপুর এলাকায় প্রায় পৌনে চার একর জমিতে প্রস্তাবিত সার্কেল অফিসের নকশাসংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানো হয়। তবে এখনো ভবন নির্মাণের বিষয়ে কার্যকর কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।

বিআরটিএর কর্মকর্তারা জানান, রাজশাহী, চট্টগ্রাম, খুলনা ও ঢাকায় বিভাগীয় দপ্তরের নিজস্ব ভবন রয়েছে। তবে দেশের অনেক জেলায় মোটরযানের ফিটনেস পরীক্ষা, চালকদের প্রশিক্ষণ এবং ড্রাইভিং লাইসেন্সের পরীক্ষা নেওয়ার জন্য নিজস্ব স্থান ও স্থাপনা নেই। ফলে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সীমিত পরিসরের কক্ষে এসব কার্যক্রম পরিচালনা করতে হচ্ছে। এতে একদিকে যেমন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাজ করতে সমস্যা হচ্ছে, অন্যদিকে সেবাপ্রার্থীদেরও নানা ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।

বগুড়া জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে অবস্থিত বিআরটিএ অফিসে গিয়ে দেখা যায়, সীমিত জায়গায় গাদাগাদি করে চলছে দাপ্তরিক কার্যক্রম। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বসার পর্যাপ্ত জায়গা নেই। পুরোনো ও গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র সংরক্ষণেও রয়েছে সমস্যা। অফিসের জায়গা সংকটের কারণে কিছু নথি গুদাম ও বারান্দায় সংরক্ষণ করতে হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। জনবল সংকটের কারণে সেবাপ্রার্থীদেরও দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়।

বিআরটিএর পুরোনো নথি ও সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮৯ সালে বগুড়া জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের একটি পুরোনো ভবনে ৯ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়ে বিআরটিএর কার্যক্রম শুরু হয়। সে সময় মোটরযানের নিবন্ধন, ড্রাইভিং লাইসেন্স, মালিকানা পরিবর্তনসহ বিভিন্ন সেবা নিতে প্রতিদিন গড়ে ৩৫ জন আসতেন। বর্তমানে বগুড়া বিআরটিএ অফিসে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৫০০ সেবাপ্রার্থী আসেন। অথচ ৩৭ বছরে জনবল বেড়েছে মাত্র দুজন। ফলে জনবল ও অবকাঠামোর সঙ্গে সেবাপ্রার্থীর চাপের বড় ধরনের অসামঞ্জস্য তৈরি হয়েছে।

ড্রাইভিং লাইসেন্সের জন্য বায়োমেট্রিক দিতে আসা মো. কামরুল ইসলাম বলেন, তার বাড়ি বগুড়ার শেরপুর উপজেলায় হলেও তিনি ঢাকার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। বায়োমেট্রিক দেওয়ার জন্য নির্ধারিত দিনে দীর্ঘ লাইন এড়াতে তিনি সকাল ৭টার দিকে বিআরটিএ অফিসে আসেন। কিন্তু এসেও তাঁকে ৫৬ জনের পেছনে লাইনে দাঁড়াতে হয়।

কামরুল ইসলাম বলেন, ‘একটি বুথে বায়োমেট্রিক দেওয়ার ব্যবস্থা থাকায় দীর্ঘ লাইনে দাঁড়ানো সেবাপ্রার্থীদের কষ্ট হয়। তার ওপর মাথার ওপর কোনো ছাদ নেই। রোদ-বৃষ্টির মধ্যেই অপেক্ষা করতে হয়।’

শুধু ড্রাইভিং লাইসেন্স নয়, মোটরযানের ফিটনেস পরীক্ষা করাতেও ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে সেবাপ্রার্থীদের। শেরপুর উপজেলার ট্রাকচালক মো. শফিকুল ইসলামের ট্রাকের ফিটনেস পরীক্ষার তারিখ ছিল ১০ আগস্ট। বিআরটিএ অফিসের চত্বরে পর্যাপ্ত জায়গা না থাকায় তাকে বগুড়া সরকারি আজিজুল হক কলেজের নতুন ভবনের পাশের সড়কে গাড়ি নিয়ে যেতে বলা হয়। নির্ধারিত সময়ে সকাল ১০টার দিকে সেখানে পৌঁছালেও দুপুর দেড়টা পর্যন্ত তাকে অপেক্ষা করতে হয়।

শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘রাস্তার পাশে গাড়ি রাখার কারণে যানজট তৈরি হয়। শিক্ষার্থী ও পথচারীদেরও ভোগান্তি হয়। কিন্তু আমাদের করার কিছু নেই। গাড়ি রাখার জন্য অন্য কোনো জায়গাও নেই।’

বিআরটিএ কর্মকর্তারা জানান, অফিস চত্বরে পর্যাপ্ত জায়গা না থাকায় বর্তমানে অনেক সময় সড়ক বা মহাসড়কের পাশে বাস-ট্রাক রেখে ফিটনেস পরীক্ষা করতে হয়। এতে যানজটসহ নানা ধরনের জনদুর্ভোগ সৃষ্টি হয়।

বিআরটিএ সূত্র জানায়, জনদুর্ভোগ কমাতে নিজস্ব ভবন নির্মাণ ও জনবল বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল প্রায় ১২ বছর আগে। ২০১৭ সালে বগুড়া শহরের ছিলিমপুর এলাকায় প্রস্তাবিত ভবনের জন্য জমি ও নকশাসংক্রান্ত প্রস্তাব সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানো হয়। কিন্তু দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও ভবন নির্মাণের কাজ শুরু হয়নি।

অন্যদিকে জনবলসংকট কাটাতে কয়েক বছর আগে সারা দেশে প্রায় ১ হাজার ২০০ জনবল বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছিল। সম্প্রতি ৯৬ জন নিয়োগ দেওয়া হলেও তাদের মধ্যে ১৫ জন ম্যাজিস্ট্রেট। ফলে মাঠপর্যায়ে সরাসরি সেবা কার্যক্রমের জন্য নতুন জনবল পাওয়া গেছে ৮১ জন বলে বিআরটিএ সূত্র জানিয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, প্রয়োজনের তুলনায় এ সংখ্যা খুবই কম।

বগুড়া বিআরটিএর উপ-পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ার) মোহাম্মাদ হারুন উর রশিদ বলেন, ‘নিজস্ব ভবন না থাকায় সরকারি নথিপত্র যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে জনবলসংকটের কারণে সেবাপ্রার্থীদের সময়মতো কাঙ্ক্ষিত সেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।’

তিনি বলেন, ‘নিজস্ব ভবন থাকলে প্রশিক্ষণসহ অন্য কার্যক্রম আরও সহজ ও মানসম্মতভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হতো।’

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, বগুড়া বিআরটিএ অফিসে গত ৩৭ বছরে জনবল বেড়েছে মাত্র দুজন। অথচ একই সময়ে সেবাপ্রার্থীর সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ৬ গুণ। বিপুলসংখ্যক মানুষের সেবা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় জনবল বৃদ্ধি এবং দ্রুত নিজস্ব ভবন নির্মাণ করা জরুরি। তা না হলে সেবাপ্রার্থীদের দুর্ভোগ আরও বাড়বে। সূত্র খবরের কাগজ