সাগরে ডুবে বাড়ছে মৃত্যুর ঝুঁকি

Passenger Voice    |    ১০:৪৯ এএম, ২০২৬-০৮-১১


সাগরে ডুবে বাড়ছে মৃত্যুর ঝুঁকি

পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কক্সবাজারে বেড়াতে এসে সমুদ্রে গোসল করতে নেমে গত ২৪ জুলাই হেলাল শেখ নামে এক ব্যক্তি নিখোঁজ হয়েছেন। ওই দিন বিকেলে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের কলাতলী পয়েন্টের সায়মন বিচের দক্ষিণ পাশে মডার্ন হ্যাচারিসংলগ্ন এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তার কোনো সন্ধান মেলেনি। তবে একই ঘটনায় তার ছেলে নিলয় দীপকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে।

গত বছরের ৮ জুলাই কক্সবাজারের হিমছড়িতে সমুদ্রে গোসল করতে নেমে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী অরিত্র হাসান নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাও দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দেয়। এক বছর পেরিয়ে গেলেও তার খোঁজ মেলেনি।

এ রকম এক-দুটি দুর্ঘটনা নয়; বর্ষা মৌসুমে প্রায়ই কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে পর্যটক নিখোঁজ হওয়া, ঢেউয়ে ভেসে যাওয়া কিংবা গুপ্ত খাল বা রিপ কারেন্টের কবলে পড়ার ঘটনা ঘটছে। 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বঙ্গোপসাগরে আবহাওয়ার অস্বাভাবিকতা বেড়েছে। ঘন ঘন নিম্নচাপ, অতিবৃষ্টি, উত্তাল ঢেউ এবং সাগরের তলদেশের পরিবর্তনের ফলে সৈকতে গুপ্ত খালে পড়ার ঝুঁকি আগের তুলনায় অনেক বেশি দেখা দিচ্ছে। কিন্তু অধিকাংশ পর্যটক এসব ঝুঁকি সম্পর্কে না জেনেই পানিতে নামছেন।

তবে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে পর্যটকদের জন্য তথ্যসেবা ও সচেতনতামূলক কার্যক্রমের ইতিবাচক প্রভাবও দেখা গেছে পরিসংখ্যানে।

২০২৫ সালে সৈকতে ডুবে ২০ জনের মৃত্যু হলেও ২০২৬ সালে এখন পর্যন্ত এ সংখ্যা ৫ জন। একই সময়ে ডুবে যাওয়া ৯৯ জনকে জীবিত উদ্ধার করেছেন লাইফগার্ডের কর্মীরা।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পর্যটকদের সতর্ক করতে নিয়মিত মাইকিং, তথ্যসেবা, সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড এবং লাইফগার্ডদের তৎপরতা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

ঝুঁকি জেনেও পানিতে নামছেন পর্যটক
সম্প্রতি কলাতলী, সুগন্ধা ও লাবণী পয়েন্ট ঘুরে দেখা যায়, পর্যটকদের সতর্ক করতে বিভিন্ন স্থানে লাল পতাকা, সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড, মাইকিং এবং লাইফগার্ডের টহল অব্যাহত রয়েছে। তার পরও অনেক পর্যটক নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে গভীর পানিতে নামছেন।

ঢাকার রামপুরা থেকে বেড়াতে আসা পর্যটক তামিম ইকবাল বলেন, ‘আমরা শুধু উত্তাল সাগর দেখতে এসেছিলাম। কিন্তু পরে পানিতে নেমে বুঝলাম ঢেউয়ের টান কতটা ভয়ংকর। মনে হচ্ছিল পা নিচের দিকে ডুবে যাচ্ছে। লাইফগার্ডের বাঁশির শব্দ শুনে দ্রুত উঠে আসি। এখানে আরও স্পষ্টভাবে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করা দরকার।’

রাজশাহী থেকে আসা পর্যটক রামিম হায়দার বলেন, ‘অনেক টাকা খরচ করে পরিবার নিয়ে কক্সবাজার বেড়াতে এসেছি। পানিতে না নামলে পয়সা উসুল হবে না, তাই আনন্দ করছি। পরে আফসোস থেকে যাবে।’ 

স্থানীয় দর্শনার্থী ও টেকপাড়ার বাসিন্দা রাশেদুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা জানি বর্ষায় সাগরের নিচে বড় বড় খাদ তৈরি হয়। কিন্তু বাইরের পর্যটকদের বেশির ভাগই রিপ কারেন্ট বা লাল পতাকার অর্থ বোঝেন না। আবার সৈকতে মানুষের তুলনায় লাইফগার্ডও খুব কম। বড় দুর্ঘটনা ঘটলে সবাইকে দ্রুত উদ্ধার করা সম্ভব হয় না।’

জলবায়ু পরিবর্তনে বদলে যাচ্ছে সাগর, বাড়ছে ঝুঁকি
বাংলাদেশ সমুদ্র গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বোরি) সাবেক মহাপরিচালক ও সমুদ্রবিজ্ঞানী সাঈদ মাহমুদ বেলাল হায়দার বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বৈরী আবহাওয়া, উঁচু ঢেউ এবং সমুদ্রতলের পরিবর্তনের কারণে কক্সবাজার সৈকতে রিপ কারেন্ট বা গুপ্ত খালের ঝুঁকি বেড়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সৈকতে ডুবে মৃত্যুর অধিকাংশ ঘটনাই এ স্রোতের সঙ্গে সম্পর্কিত।

তিনি আরও বলেন, গুপ্ত খালে আটকা পড়লে আতঙ্কিত হয়ে তীরের দিকে জোর করে সাঁতার কাটা উচিত নয়। বরং শান্ত থেকে পানিতে ভেসে থাকার চেষ্টা করতে হবে এবং স্রোতের বিপরীতে নয়, তীরের সমান্তরালে বাঁ বা ডান দিকে সরে গিয়ে রিপ কারেন্টের বাইরে বের হওয়ার চেষ্টা করতে হবে।

আগাম সতর্কবার্তা হতে পারে জীবন বাঁচানোর উপায়
কক্সবাজারে ভ্রমণের আগে আবহাওয়ার পূর্বাভাস, সমুদ্রবন্দরের সতর্কসংকেত, সৈকতের লাল পতাকা এবং লাইফগার্ডের নির্দেশনা সম্পর্কে জানা থাকলে অনেক দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ মো. আব্দুল হান্নান বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বর্ষা মৌসুমে বঙ্গোপসাগরের আবহাওয়া দ্রুত বদলে যায়। অনেক সময় আকাশ পরিষ্কার থাকলেও সমুদ্রের ভেতরে পরিস্থিতি বিপজ্জনক হতে পারে। তাই চোখে দেখে নয়, সর্বশেষ আবহাওয়ার পূর্বাভাস ও সতর্কসংকেত অনুসরণ করে সমুদ্রে নামা উচিত। বিশেষ করে ৩ নম্বর বা এর বেশি সতর্কসংকেত জারি থাকলে গোসল থেকে বিরত থাকাই নিরাপদ, কারণ এ সময় গুপ্ত খালে পড়ার ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়।

কক্সবাজার হোটেল অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক করিম উল্লাহ কলিম বলেন, পর্যটকদের কাছে সহজ ভাষায় আবহাওয়ার তথ্য, গুপ্ত খালের অবস্থান এবং নিরাপদ-অনিরাপদ এলাকা সম্পর্কে নিয়মিত তথ্য পৌঁছে দিতে পারলে দুর্ঘটনা আরও কমানো সম্ভব।

১২ বছরে ১ হাজার ৪৩ জন উদ্ধার
সমুদ্রসৈকতে দীর্ঘ এক যুগের বেশি সময় ধরে উদ্ধারকাজ পরিচালনা করছে সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ, বাংলাদেশ (সিআইপিআরবি)। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, গত ১২ বছরে লাইফগার্ডের কর্মীরা ১ হাজার ৪৩ জন পর্যটক ও স্থানীয় মানুষকে জীবিত উদ্ধার করেছেন। একই সঙ্গে প্রায় ৫০ লাখ পর্যটকের কাছে নিরাপত্তাবিষয়ক বার্তা পৌঁছে দেওয়া হয়েছে এবং প্রায় ৯ হাজার শিশুকে সাঁতার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, শিশুদের সাঁতার শেখানো এবং দুর্ঘটনার পর দ্রুত সিপিআর দিতে পারলে প্রাণহানির ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।

কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে ডুবে যাওয়া ও উদ্ধার হওয়া পর্যটকদের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০২৪ সালে ডুবে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে ১২টি এবং উদ্ধার করা হয়েছে ১৪৩ জনকে। ২০২৫ সালে ডুবে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ২০ জনে, একই সময়ে উদ্ধার করা হয় ২১০ জনকে। আর ২০২৬ সালে এখন পর্যন্ত ডুবে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে ৫টি, উদ্ধার করা হয়েছে ৯৯ জনকে।

সিআইপিআরবির ফিল্ড টিম ম্যানেজার ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, ‘আমরা সহস্রাধিক মানুষের জীবন বাঁচাতে সক্ষম হয়েছি। তবে বছরে কয়েক লাখ পর্যটকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বর্তমান জনবল মোটেও যথেষ্ট নয়। সরকারি-বেসরকারি যৌথ উদ্যোগে লাইফগার্ডের সংখ্যা, উদ্ধার সরঞ্জাম এবং নিরাপত্তা অবকাঠামো বাড়াতে হবে। এতে প্রাণহানি যেমন কমবে, তেমনি নিরাপদ পর্যটনও নিশ্চিত হবে।’

তিনি জানান, সংস্থাটি এ পর্যন্ত প্রায় ৯ হাজার শিশুকে বিনামূল্যে সাঁতার প্রশিক্ষণ দিয়েছে এবং প্রায় ৫০ লাখ পর্যটককে পানিতে নামার আগে নিরাপত্তা ও সচেতনতামূলক বার্তা দিয়েছে।

তিনি আরও বলেন, ‘গবেষণায় দেখা গেছে, ৬ থেকে ১০ বছর বয়সী শিশুদের সঠিকভাবে সাঁতার শেখানো গেলে ৯৬ শতাংশ ক্ষেত্রে পানিতে ডুবে যাওয়ার ঘটনা প্রতিরোধ করা সম্ভব। একই সঙ্গে দুর্ঘটনার পরপরই প্রশিক্ষিত ব্যক্তি সিপিআর দিতে পারলে প্রাণহানির ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো যায়।’

সীমিত লাইফগার্ড, বাড়ছে শঙ্কা
সৈকতে দায়িত্বরত লাইফগার্ডের সুপারভাইজার ওসমান গনি বলেন, বর্ষায় ঢেউ ও স্রোতের প্রভাবে সৈকতের তলদেশের গঠন পরিবর্তিত হয়ে কোথাও কোথাও গভীরতা ও স্রোতের ঝুঁকি বাড়তে পারে। কিন্তু অনেক পর্যটক লাল পতাকা উপেক্ষা করে পানিতে নামেন। তা ছাড়া মাত্র ২৭ জন গার্ড দিয়ে শত শত মানুষকে একসঙ্গে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। তাই উদ্ধারকাজের পাশাপাশি সচেতনতাই সবচেয়ে কার্যকর উপায়। 

ট্যুরিস্ট পুলিশ কক্সবাজার রিজিয়নের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. আজমল হোসেন বলেন, সমুদ্রে নামার আগে আবহাওয়ার সতর্কবার্তা, লাল পতাকা এবং লাইফগার্ডের নির্দেশনা মেনে চলা জরুরি। জরুরি প্রয়োজনে ট্যুরিস্ট পুলিশের হটলাইন ৩২০-১৬০০০ এবং জেলা প্রশাসনের তথ্যকেন্দ্রের ০১৮৯৩-৩৯৮৯৮৮ নম্বরে যোগাযোগ করা যাবে। সূত্র খবরের কাগজ