অনুমোদন নেই তবু সড়কে রাজত্ব স্লিপার বাসের

Passenger Voice    |    ১২:৪৭ পিএম, ২০২৬-০৮-০৯


অনুমোদন নেই তবু সড়কে রাজত্ব স্লিপার বাসের

‘ঘর আছে দুয়ার নাই, মানুষ আছে কথা নাই’– যার মানে ‘কবর’। বহুল প্রচলিত ও দেহতত্ত্বের এই ধাঁধার মতোই যেন দেশের স্লিপার বাসগুলোর অবস্থা। বিআরটিএর নিবন্ধন নম্বর থাকলেও অনুমোদন ছাড়াই চলছে বাসগুলো। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সক্ষমতার অতিরিক্ত ভার বহন করা ‘অননুমোদিত’ এসব বাসের শৌখিন, আরামদায়ক ও বিলাসবহুল একেকটি শয্যা যেন মৃত্যুফাঁদ বা কবর।

গতকাল শুক্রবার ছুটির দিনের সকালে বগুড়া ও সিলেটে পৃথক সড়ক দুর্ঘটনায় অন্তত ১৬ জন নিহত ও ৩৩ জন আহত হয়েছেন। এর মধ্যে সিলেটের ওসমানীনগরে দুটি যাত্রীবাহী বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে ৯ জন নিহত এবং আহত হয়েছেন অন্তত ২৪ জন। সিলেটমুখী বেঙ্গল পরিবহনের একটি বাসের সঙ্গে ঢাকামুখী ইউনিক পরিবহনের বাসের এ সংঘর্ষ হয়। এতে ইউনিক পরিবহনের বাসটি সড়কের পাশের খাদে পড়ে যায়।

সড়কে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অননুমোদিত স্লিপার বাস চলাচলের ওপর স্থগিতাদেশ চেয়ে হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন করেছিলেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মুহাম্মদ হুজ্জাতুল ইসলাম খান। গত বছর ২৩ জানুয়ারি এই রিট আবেদন করেন তিনি। গতকালের দুর্ঘটনার ভাইরাল ভিডিওর উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, সিলেটের বেঙ্গল পরিবহনের স্লিপার বাসটি আরেকটি গাড়িকে পাশ কাটাতে গিয়ে হানিফ পরিবহনের সঙ্গে মুখোমুখি হয়ে যায়। এটি বোঝার জন্য এক্সপার্ট না হলেও চলে যে, ক্ষমতার অতিরিক্ত ভার বয়ে চলতে গেলে কোনো কিছুই ভারসাম্য রাখতে পারে না। স্লিপার বাসগুলোরও তাই ভারসাম্য নেই, অনুমোদনও নেই।

মামলার হালনাগাদ অবস্থা জানতে চাইলে আইনজীবী হুজ্জাতুল ইসলাম গতকাল দৈনিক বলেন, ‘রিটের ওপর প্রাথমিক শুনানি নিয়ে হাইকোর্ট রুল জারি করেছিলেন। রুলের ওপর শুনানিও হয়েছে। আমি শুনানি করেছি। বিআরটিএর পক্ষেও শুনানি হয়েছে। শুনানি নিয়ে আদালত বিআরটিএ, হাইওয়ে পুলিশ ও স্লিপার মালিক সমিতির কাছে আলাদা তিনটি প্রতিবেদন চেয়েছে। এর মধ্যে নির্দেশ অনুসারে বিআরটিএ (বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ) কমিটি গঠন করেছে বলে গত বৃহস্পতিবার আদালতকে অবহিত করেছে। তবে পুরোপুরি নির্দেশ এখনো পালন করতে পারেনি। সে জন্যে তারা আদালত থেকে আরও দুই সপ্তাহ সময় নিয়েছে।’

জানা গেছে, অননুমেদিত হলেও ঠিকই বিআরটিএর রেজিস্ট্রেশন নম্বর আছে দেশের বিভিন্ন রুটে চলাচল করা অন্তত সাড়ে ৪০০ বাসের। এমন অবস্থার জন্য বাস মালিক, চেসিস আমদানিকারক এবং বিআরটিএ একে অপরকে দোষারোপ করছে। তবে রাখ-ঢাক না করে স্লিপার বাসের মালিকরাই বলছেন, আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান চেসিস বিক্রির আগেই বিআরটিএর নম্বর ম্যানেজ করে দেয়।

তারা জানান, বিশেষ করে করোনা অতিমারির পর থেকে তুলনামূলক কম দামে এমনকি কিস্তিতে ভারতের অশোক লেল্যান্ড বাসের চেসিস হাতের কাছে পেয়ে যান মালিকরা। মূলত এরপরই দেশের পরিবহন খাতে স্লিপার বাসের সংখ্যা বাড়তে থাকে। আয়েশের তুলনায় দূর গন্তব্যে কম ভাড়ায় ভ্রমণ করতে পারায় যাত্রীদের পছন্দের তালিকায়ও জায়গা করে নিচ্ছে এসব বাস। যদিও যেসব চেসিসের ওপর স্লিপার বাস বানানো হচ্ছে তার মান নিয়ে শুরু থেকেই আছে প্রশ্ন। সাধারণ যাত্রীদের এত কিছু জানার কথা না। আর যাদের এটা দেখার দায়িত্ব, তারা না দেখার ভান করছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, দেশে সবচেয়ে বেশি স্লিপার বাস বানানো হয়েছে অশোক লেল্যান্ড ১২ এমএফই এবং ১২ মিটার চেসিসের ওপর। ১২ এমএফইর ক্যাটালগে আসন ধারণক্ষমতার বিষয়ে লেখা রয়েছে: ইকোনমি ক্লাস ফরমেশনে ৪৫টি আসন বা দুই-এক ফরমেশনে ৩০টি ‘স্লিপার সিট’ করা যাবে। দোতলা বাস বানানোর বিষয়ে কিছু বলা হয়নি। আর ১২ মিটার বা তার নিচের চেসিসের বাসের ক্যাটালগে সব একতলা হিসেবে সিট বসানো অবস্থায় দেখানো হয়েছে।

যদিও বাস মালিকরা এসবের কোনো নিয়ম না মেনে অতি মুনাফার আশায় ও যাত্রীদের কাছে আকর্ষণীয় করতে দোতলা বাস পর্যন্ত বানিয়ে ফেলেছেন। এসবের নিচতলায় দুই-এক ফরমেশনে ‘বিজনেস ক্লাস সিট’ আর ওপরে শয্যা ‘স্লিপার’ বানানো হয়েছে। এতে সাধারণ স্লিপার বাসের তুলনায় এসব দোতলা বাসের উচ্চতা অনেক বেশি, যা ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে দেখছেন সবাই। তারা বলছেন, ‘আমাদের দেশে বড় ক্ষতিতে না পড়লে বড় ঝুঁকি গুরুত্ব পায় না। অথচ এসব বাসের অধিকাংশ তৈরি হচ্ছে রাজধানীতেই। গাবতলী, মিরপুর এবং আমিনবাজার এলাকার বিভিন্ন গ্যারেজে, চোখের সামনে।’

বিআরটিএ বিভিন্ন সময় গণমাধ্যমকে বলেছে, দেশে এ ধরনের স্লিপার বাস চলার অনুমতি নেই। যেসব চেসিসের ওপর স্লিপারগুলো তৈরি হচ্ছে সেটিও অবৈধ। মালিকপক্ষ সিঙ্গেল ডেকার (একতলা) সিটের বাস হিসেবে অনুমোদন নিয়ে পরে স্লিপার-দোতলা বানিয়ে নিচ্ছে যে যার মতো।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতিও বিভিন্ন সময় গণমাধ্যমকে বলেছে, স্লিপার বাসগুলো ঝুঁকিপূর্ণ। চেসিসের ধারণক্ষমতার বাইরে গিয়ে স্লিপার বাসগুলো বানানো। রাস্তায় চলার সময় বাসগুলো দুলতে থাকে। যেকোনো সময় এসব বাস দুর্ঘটনায় পড়তে পারে।

অনিয়মের প্রক্রিয়া তুলে ধরে তারা বলেন, যেকোনো চেসিস দেশে আসার পর প্রথমে চেসিসের টাইপ অ্যাপ্রুভাল নিতে হয়। এরপর বডি হওয়ার পর আবার বডির অ্যাপ্রুভাল নিতে হয়। অর্থাৎ চেসিসের সঙ্গে বডি সামঞ্জস্য আছে কি না, তার একটা অনুমোদন নিতে হয়। এটা নেওয়া বাধ্যতামূলক। যদিও বডির সামঞ্জস্য না থাকলেও এগুলো সব কর্তৃপক্ষের চোখের সামনে দিয়ে দিব্যি চলছে।

আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান চেসিস বিক্রির আগেই বিআরটিএর নম্বর ম্যানেজ করে। মালিকরা পরে চেসিস কিনে নিজেদের মতো স্লিপার বাস বানিয়ে নেন। এসব চেসিসের বাস এলেই তার অনুমোদন দিয়ে দিতে আমদানিকারকরা আগেই বিআরটিএকে টাকা দিয়ে রাখে বলেও জানা গেছে। সূত্র খবেরর কাগজ