বিআরটিএর গাফিলতিতে স্মার্ট ড্রাইভিং লাইসেন্স পাননি ১৮ লাখ গ্রাহক

Passenger Voice    |    ১২:৩৩ পিএম, ২০২৬-০৮-০৯


বিআরটিএর গাফিলতিতে স্মার্ট ড্রাইভিং লাইসেন্স পাননি ১৮ লাখ গ্রাহক

দীর্ঘ ১ বছর ৪ মাস ধরে স্মার্ট ড্রাইভিং লাইসেন্স কার্ড প্রিন্টিং বন্ধ আছে। এ কারণে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) প্রায় ১৮ লাখ গ্রাহক স্মার্ট ড্রাইভিং লাইসেন্স কার্ড পাননি। জরুরি প্রয়োজনে বিআরটিএর কাছে এখন মাত্র দুই লাখ ড্রাইভিং লাইসেন্স কার্ড আছে, যা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম। তবে এতকিছুর পরও বিআরটিএর খামখেয়ালিতে এখনো স্মার্ট কার্ডের জন্য ঠিকাদার নির্ধারণ করা হয়নি।

২০২৫ সালে উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বানের পর জুলাই মাসে ভারতীয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মাদ্রাজ সিকিউরিটি প্রিন্টার্সের সঙ্গে স্মার্ট কার্ড প্রিন্টের চুক্তি করে বিআরটিএ। কিন্তু তারা যথাসময়ে সেই কার্ড সরবরাহ করেনি। গত বছরের নভেম্বর পর্যন্ত বিআরটিএতে ১০ লাখ ড্রাইভিং লাইসেন্স আটকা ছিল। ড্রাইভিং লাইসেন্স বিতরণে অনিয়মের অভিযোগে মাদ্রাজ প্রিন্টার্সের সঙ্গে চুক্তি বাতিল করে দেয় বিআরটিএ। এতে ১৮ লাখ স্মার্ট ড্রাইভিং লাইসেন্স কার্ড পাননি গ্রাহক।

এআইনির্ভর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা জোরদার হওয়ার পর সড়কে আইনশৃঙ্খলার কড়াকড়ি বেড়েছে। সে কারণে আগের তুলনায় ড্রাইভিং লাইসেন্সের চাহিদাও এখন অনেক। এখন ঢাকাসহ সারা দেশে বিআরটিএতে প্রতি মাসে এক লাখ নতুন আবেদন জমা পড়ছে। এই মুহূর্তে প্রায় ১৮ লাখ ড্রাইভিং লাইসেন্সের আবেদন বিআরটিএতে আটকা পড়ে আছে। 

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর এক জরিপ অনুযায়ী, ড্রাইভিং লাইসেন্স নিতে গিয়ে ৮৩ শতাংশের বেশি মানুষ কোনো না কোনোভাবে হয়রানি ও দুর্নীতির শিকার হন। এর মধ্যে প্রায় ৮৪ শতাংশ সেবাগ্রহীতাকে বাধ্য হয়ে দালাল বা মধ্যস্বত্বভোগীদের শরণাপন্ন হতে হয়।

ঠিকাদার বদলের মারপ্যাঁচ ও দুর্নীতির অভিযোগ
দেশে যানচালকদের লাইসেন্স দেওয়ার দায়িত্ব বিআরটিএর। ২০১৯ সাল থেকে লাইসেন্স প্রদান ও তথ্যভান্ডার সংরক্ষণের কাজ এই প্রতিষ্ঠানটি আর ঠিকঠাকভাবে করতে পারছে না। সংকট শুরু হয়েছিল মূলত ভারতের ‘মাদ্রাজ সিকিউরিটি প্রিন্টার্স’ (এমএসপি) নামের প্রতিষ্ঠানকে ২০২১ সালে কাজ পাইয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে।

২০১৯ সালের আগে ঠিকাদারের মেয়াদ শেষ হলে নতুন করে ৩৫ লাখ স্মার্ট কার্ড সরবরাহের দরপত্র আহ্বান করা হয়। সর্বনিম্ন দরদাতা হয়েছিল ফ্রান্সের ‘সেল্প কার্ডস সলিউশন’। পরিস্থিতি অনুমান করে ভারতীয় প্রতিষ্ঠান মাদ্রাজ প্রিন্টার্স প্রতিদ্বন্দ্বী সেল্প কার্ডস সলিউশনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ উত্থাপন করে। অভিযোগ রয়েছে, ‘ওপরের কর্তৃপক্ষ’কে ম্যানেজ করে এই অভিযোগ উত্থাপন করা হয়। পরে সেই দরপত্র বাতিল করে দেয় সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়। 

পরবর্তী সময়ে ২০২০ সালে পুনরায় দরপত্র আহ্বান করে কার্ডের চাহিদা বাড়িয়ে ৪০ লাখ করা হয়। দ্বিতীয় দফার এই দরপত্রে সর্বনিম্ন দরদাতা হয় সেই মাদ্রাজ প্রিন্টার্স। ২০২১ সালের জুলাইয়ে তাদের সঙ্গে চুক্তি করে বিআরটিএ। চুক্তি অনুযায়ী, কাজ পাওয়ার তিন মাসের মধ্যে কার্ড দেওয়া শুরু করার কথা থাকলেও তারা দীর্ঘ সময় ধরে গড়িমসি করে।

চুক্তি অনুযায়ী ২০২৬ সালের জুলাইয়ের মধ্যে ৪০ লাখ কার্ড সরবরাহ করার কথা থাকলেও তারা দিয়েছে মাত্র ২০ লাখের মতো। সোয়া ছয় লাখ গ্রাহকের তথ্য জমা থাকলেও এখনো তাদের কার্ড প্রিন্ট করা হয়নি। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, বিআরটিএ সময়মতো বিল পরিশোধ না করায় কার্ড আমদানি ব্যাহত হচ্ছে। ইতোমধ্যে মাদ্রাজ সিকিউরিটি প্রিন্টার্সের সঙ্গে ড্রাইভিং লাইসেন্সসংক্রান্ত চুক্তি বাতিল করেছে বিআরটিএ। 

এই জটিলতায় স্মার্ট কার্ড যথাসময়ে সরবরাহ করতে না পেরে বিআরটিএ গ্রাহকদের সাময়িকভাবে একটি কাগুজে লাইসেন্স বা ই-পেপার দিয়েছিল। বিআরটিএর এ ধরনের সিদ্ধান্তে বিপদে পড়েছেন ড্রাইভিং লাইসেন্স নিয়ে বিদেশে কর্মী হিসেবে যেতে ইচ্ছুক চালকরা। কারণ স্মার্ট কার্ড ছাড়া তারা বিদেশ যেতে পারছেন না। 

টেন্ডার ঘিরে নানা তদবির
বিআরটিএ সূত্রে জানা গেছে, ড্রাইভিং লাইসেন্স সরবরাহসংক্রান্ত আরও তিনটি উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। প্রথমে সরাসরি দরপত্র (ডিটিএম) জমা দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়। সে সময় মাত্র চারটি কোম্পানি টেন্ডারে অংশগ্রহণ করে। পরে নানা সমালোচনার মুখে সেই প্রক্রিয়া বাতিল করতে বাধ্য হয় বিআরটিএ। আবার ই-দরপত্র আহ্বান করে বিআরটিএ। তবে সেই দরপত্রের শর্ত নিয়ে আপত্তি ওঠে নানা মহলে। সব শেষে তৃতীয়বার ই-দরপত্র আহ্বান করতে যাচ্ছে বিআরটিএ। 

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিআরটিএর একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটের জন্য টেন্ডার প্রক্রিয়ায় ধীরগতি চলছে। এই টেন্ডার ঘিরে ওপর মহল থেকে নানা তদবির চলছে।’

একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করা মো. ফয়েজ চলতি বছরের মার্চ মাসে ঢাকা মেট্রো-২ সার্কেল ইকুরিয়া থেকে ড্রাইভিং লাইসেন্স আবেদন করেছেন। তিনি বলেন, ‘আবেদন প্রক্রিয়ার সব কাজ শেষে পরীক্ষায় পাস করলেও স্মার্ট কার্ড এখনো পাওয়া যায়নি। গত দুই বছরে দেশের কত কিছুরই তো পরিবর্তন হলো, কিন্তু সামান্য কার্ড সমস্যার সমাধান হচ্ছে না।’ 

উন্নত জীবনের আশায় পাড়ি জমাতে বিদেশ যাচ্ছেন বরিশালের বাসিন্দা মো. নাইম। তিনি বলেন, ‘সৌদি আরবে ড্রাইভিং পেশায় ভিসা এসেছে। কাগজপত্র হাতে পাওয়ার পর বছরের পর বছর পার হয়, ড্রাইভিং লাইসেন্স আর পাওয়া হয় না। এখন জরুরি ভিত্তিতে ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রয়োজন। তাই মিরপুর বিআরটিএতে এলাম। কিন্তু এখানে ভোগান্তির যেন শেষ নেই।’ 

সার্বিক বিষয়ে বিআরটিএ চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হাবীবুর রহমান বলেন, ‘আমরা সমস্যা সমাধানের জন্য কাজ করছি। তা ছাড়া ই-ড্রাইভিং লাইসেন্স দিয়ে সড়কে গাড়ি চালানো যায়। জরুরি ভিত্তিতে বিদেশগামী কারও ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রয়োজন হলে সেটির জন্য ব্যবস্থা করা আছে।’

বিআরটিএ নানাভাবে গ্রাহকদের হয়রানি করছে জানিয়ে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, ‘বিআরটিএ চাইলে তাদের নিজস্ব সক্ষমতা ব্যবহার করে ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রিন্ট করতে পারে। কিন্তু সেটা তারা করছে না। কারণ এটা শুরু করলে লুটপাট বন্ধ হয়ে যাবে।’

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক এবং বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক ড. এম শামছুল হক বলেন, ‘একটা সামান্য কার্ড পেতে এতদিন অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে! এতে বোঝা যায় বিআরটিএতে দক্ষতার কতটা অভাব রয়েছে। বাংলাদেশে অনেক কোম্পানি আছে, যারা খুব সহজ শর্তে এসব কার্ড প্রিন্ট করে দিতে পারবে। বিআরটিএ দরপত্রে এমন সব শর্ত আরোপ করে রাখে, যেন বাংলাদেশি কোম্পানি কাজ না পায়।’ সৌজন্যে খবরের কাগজ