শিরোনাম
Passenger Voice | ১০:৫৮ এএম, ২০২৬-০৮-০৫
জুলাই অভ্যুত্থানকেন্দ্রিক হত্যাকাণ্ডে ‘স্নাইপার রাইফেল’ ব্যবহার নিয়ে সৃষ্টি হওয়া রহস্যের এখনো জট খোলেনি। বিশেষ ধরনের দূরপাল্লার এই আগ্নেয়াস্ত্র আদৌ ব্যবহার হয়েছিল কি না, ব্যবহার হলে কে বা কারা ব্যবহার করেছিল, স্নাইপারের গুলিতে মৃত্যু বা হত্যার শিকার কে বা কারা–সে সম্পর্কে কোনো তথ্য-উপাত্ত নেই তদন্তসংশ্লিষ্টদের কাছে।
আগ্নেয়াস্ত্র বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, স্নাইপার রাইফেল মূলত ‘এক গুলিতে এক মৃত্যু’ নীতির মারণাস্ত্র। সাধারণত নিরাপত্তা বাহিনী এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কিছু ইউনিটে অল্প সংখ্যক সদস্যের হাতে রয়েছে, যা মূলত প্রয়োজন অনুসারেই বরাদ্দ করা হয়েছে। তা সত্ত্বেও, আন্দোলন দমনে স্নাইপার ব্যবহারের এ দাবি এখনো নানা প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে।
যেভাবে শুরু স্নাইপার বিতর্ক-আলোচনা
জুলাই অভ্যুত্থানের পর ২০২৪ সালের ১২ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকারের তৎকালীন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন আহতদের দেখতে যান ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে। সেখানে গিয়ে চিকিৎসকদের বরাত দিয়ে তিনি গণমাধ্যমের সামনে বলেছিলেন, ‘আহতদের শরীর থেকে মারাত্মক ৭.৬২ মিলিমিটার ক্যালিবারের বুলেট উদ্ধার করা হয়েছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।’ তিনি বিস্ময় প্রকাশ করে সেদিন আরও বলেন, ‘আহতদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী পুলিশের চেয়ে বেসামরিক বা সাদা পোশাকে থাকা ব্যক্তিদের ছোড়া গুলিতে বেশি মানুষ হতাহত হয়েছে।’ র্যাব বা পুলিশের জন্য বরাদ্দকৃত এই আগ্নেয়াস্ত্র ও বুলেট কীভাবে সাধারণ পোশাকধারী ব্যক্তিদের হাতে গেল, তা খুঁজে বের করতে তিনি একটি বড় ধরনের ‘ম্যাসিভ’ তদন্তের তাগিদ দিয়েছিলেন।
এরপর ২০২৬ সালের ৬ জুলাই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তৎকালীন চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম মানবতাবিরোধী অপরাধের তদন্ত প্রসঙ্গে বলেন, ‘জুলাই আন্দোলন দমনে সুনির্দিষ্টভাবে স্নাইপার রাইফেল ব্যবহার করা হয়েছিল।’ পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আওয়ামী লীগপন্থিদের কেউ কেউ প্রচার করে, ‘অজ্ঞাত স্নাইপার ব্যবহার করে লাশ ফেলে আন্দোলন চাঙ্গা করা হয়েছিল।’ তবে গত ২৮ জুলাই প্রধান উপদেষ্টার তথ্য উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান সচিবালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, ‘আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে পুলিশ ও বিজিবির টাইপ-৫৬ (চায়নিজ রাইফেল) থেকে ৭.৬২ মিলিমিটার বুলেট ছোড়ার স্পষ্ট ছবি ও ভিডিও রয়েছে। কোনো ‘অজ্ঞাত বা রহস্যময় স্নাইপার’ এসে বাইরে থেকে গুলি করেছে–এমন প্রচারণার কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই।’
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বাংলাদেশ পুলিশ সদর দপ্তরের গণমাধ্যম শাখার এআইজি এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বলেন, ‘বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন বা জুলাই অভ্যুত্থানের সময়ে যেসব হত্যাকাণ্ড ঘটেছে সেগুলোর প্রতিটি হত্যা মামলার তদন্ত করা হয়েছে বা হচ্ছে। সেখানে নিহত ব্যক্তি গুলিতে বা কীভাবে মারা গেছেন সেটা তদন্ত করা হয়। কিন্তু সুনির্দিষ্টভাবে স্নাইপারের গুলিতে মৃত্যু সংক্রান্ত কোনো তদন্ত হয়েছে–এমন কোনো তথ্য জানা নেই।
বাংলাদেশে স্নাইপার ব্যবহার করেন কারা
পুলিশ সদর দপ্তরের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে গতকাল বলেন, ‘জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে ব্যবহারের জন্য ২০২২ বা ২০২৩ সালে পুলিশ সদর দপ্তর স্নাইপার রাইফেল কেনার জন্য টেন্ডার জারি করেছিল। পরে সেসব অস্ত্র পুলিশ সরবরাহ পেয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে। অর্থাৎ এই কর্মকর্তার দাবি অনুসারে, স্নাইপার রাইফেল চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানকেন্দ্রিক আন্দোলনের সময়ে পুলিশের হাতে ছিলই না।
অন্যদিকে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নে (র্যাব) প্রেষণে দায়িত্ব পালন করা সাবেক একজন সামরিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানের ওই আন্দোলনকালীন সময়ে র্যাব সদর দপ্তরের অধীনে কোনো স্নাইপার রাইফেল ছিল না। তাছাড়া অন্য সব বাহিনীর কাছেই কমবেশি স্নাইপার ছিল বা রয়েছে বলে জানান তিনি।
তিনি আরও বলেন, অনেক সময় ব্রাজিলিয়ান এক ধরনের অস্ত্র (অনেকটা স্নাইপারের মতো) দেখে কেউ কেউ সেগুলোকে অজ্ঞতায় স্নাইপার হিসেবে চিহ্নিত করে থাকেন। বাংলাদেশে যেসব রাইফেল ব্যবহার হয়, সেগুলোর রেঞ্জ সাধারণত ৩০০ মিটারের মধ্যে। কিন্তু স্নাইপার রাইফেলের রেঞ্জ ২ হাজার বা ৩ হাজার মিটার (দুই থেকে তিন কিলোমিটার) পর্যন্ত হয়ে থাকে।
অন্যদিকে ৭.৬২ মিলিমিটার ক্যালিবারের বুলেট স্নাইপারের বলে যে দাবি করা হয় সেগুলো মূলত চায়নিজ রাইফেলের গুলি বলেও জানিয়েছেন একাধিক কর্মকর্তা। তারা বলেন, শুধু গুলির আকার বা ধরন দিয়েই স্নাইপার হিসেবে চিহ্নিত করার সুযোগ নেই। স্নাইপারের বেশকিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এর উচ্চমাত্রার গতি বা শক্তি, লম্বা ব্যারেল, টেলিস্কোপ যন্ত্রাংশ, বহু দূর থেকে নিখুঁত নিশানায় আঘাতসহ বেশকিছু বিষয় রয়েছে।
স্নাইপার রাইফেল কী
স্নাইপার রাইফেল হলো অত্যন্ত নিখুঁত দূরপাল্লার এক বিশেষ ধরনের আগ্নেয়াস্ত্র, যা দিয়ে মূলত অনেক দূর থেকে শত্রুকে বা একক লক্ষ্যবস্তুতে নিখুঁতভাবে আঘাত করা যায়। এটি সাধারণ সামরিক রাইফেলের মতো দ্রুত একাধিক গুলি করার জন্য নয়, বরং ‘ওয়ান শুট, ওয়ান কিল’ নীতিতে কাজ করে। এর মূল বৈশিষ্ট্য হলো–এ রাইফেলে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন দূরবীক্ষণ যন্ত্র বা টেলিস্কোপিক স্কোপ যুক্ত থাকে। এর সাহায্যে স্নাইপাররা কয়েক শ থেকে হাজার মিটার দূরের লক্ষ্যবস্তুও পরিষ্কার দেখতে পান। এ মারণাস্ত্রে ‘লং অ্যান্ড হেভি ব্যারেল’ বা ভেতরের নল সাধারণ রাইফেলের চেয়ে দীর্ঘ এবং ভারী হয়। এটি বুলেটের গতি বাড়াতে এবং লক্ষ্যভ্রষ্ট হওয়া রোধ করতে সাহায্য করে। সাধারণভাবে, স্নাইপার রাইফেল সাধারণ যুদ্ধক্ষেত্রের মুখোমুখি লড়াইয়ের অস্ত্র নয়, বরং অত্যন্ত ঠাণ্ডা মাথায়, হিসাব-নিকাশ করে বহুদূর থেকে নিখুঁতভাবে লক্ষ্যভেদে আঘাত করার এক অত্যাধুনিক বৈজ্ঞানিক হাতিয়ার।
সূত্র খবরের কাগজ
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত 2019 - 2026 PassengerVoice | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Developed By Muktodhara Technology Limited.
পাবলিক মতামত