বছরের পর বছর ধরে পণ্যজট গ্রাস করেছে চট্টগ্রাম বন্দরের ৪০ শতাংশ সক্ষমতা

Passenger Voice    |    ০১:৩১ পিএম, ২০২৬-০৮-০৩


বছরের পর বছর ধরে পণ্যজট গ্রাস করেছে চট্টগ্রাম বন্দরের ৪০ শতাংশ সক্ষমতা

বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান সমুদ্রদ্বার চট্টগ্রাম বন্দরে বছরের পর বছর ধরে জমে থাকা আমদানিকৃত পণ্যের ভয়াবহ জট–- বন্দরটির পরিচালন সক্ষমতার প্রায় ৪০ শতাংশই গ্রাস করে নিচ্ছে। এতে বন্দরে জাহাজের অবস্থানকাল (টার্নঅ্যারাউন্ড টাইম) আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে, যার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাবে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেশের বাণিজ্যনির্ভর অর্থনীতি।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের (সিপিএ) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত বন্দর ইয়ার্ডে ৯,৩৩০ টিইইউ (টুয়েন্টি-ফুট ইকুইভ্যালেন্ট ইউনিট) কনটেইনার আটকা পড়েছিল, যা বন্দরের মোট ইয়ার্ডের প্রায় ২২ শতাংশ জায়গা জুড়ে রয়েছে।

বন্দর ব্যবহারকারী ও বিভিন্ন ব্যবসায়িক সংগঠনের প্রাক্কলন অনুযায়ী, প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতা ও বিলম্বিত আইনি জটিলতার কারণে ২০০ কোটি ডলারেরও বেশি মূল্যের বাণিজ্যিক পণ্য স্থবির হয়ে পড়ে আছে। এর সঙ্গে কনটেইনারের জরিমানা এবং বন্দরের রাজস্ব ক্ষতি যোগ করলে, সর্বমোট অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ ৫০০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে গেছে।

পরিস্থিতির আশঙ্কাজনক অবনতি ঘটায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) আনুষ্ঠানিক চিঠি দিয়ে সতর্ক করেছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। গত ২ জুলাই সিপিএ-এর চীফ পারসোনেল অফিসার ও সচিব (ভারপ্রাপ্ত) মো. নাসির উদ্দিন এনবিআর চেয়ারম্যানকে চিঠি দিয়ে কাস্টমসজনিত বিলম্বের কারণে, দীর্ঘদিন ধরে বন্দরে পড়ে থাকা নিলামযোগ্য পণ্য ও কনটেইনার দ্রুত খালাস বা নিষ্পত্তির জন্য দরকারি পদক্ষেপ নেওয়ার অনুরোধ জানান।

চিঠিতে নাসির উদ্দিন লেখেন, "বন্দর ইয়ার্ডে বছরের পর বছর ধরে পড়ে থাকা কনটেইনার ও পণ্যের বকেয়া স্টোরেজ মাশুল ইতোমধ্যে ৮,০০০ থেকে ১০,০০০ কোটি টাকায় (প্রায় ১০০ কোটি ডলার) পৌঁছেছে। দখল হয়ে থাকা এই জায়গা খালি করে ব্যবহারের উপযোগী করা গেলে— বন্দর বছরে আরও ১০০ কোটি ডলারের বেশি অতিরিক্ত রাজস্ব আয় করতে পারবে, যা দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রাখবে।"

চিঠিতে সিপিএ আরও উল্লেখ করে, সরকারের কোনো অতিরিক্ত বিনিয়োগ ছাড়াই কেবল এই নিলামযোগ্য পণ্য সরিয়ে ফেললে বিদ্যমান অবকাঠামোতেই প্রায় ৪০ শতাংশ বেশি পণ্য ও কনটেইনার হ্যান্ডলিং করা সম্ভব হবে। ফলে সরকারের রাজস্ব আয় বাড়ার পাশাপাশি আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম অনেক বেশি গতিশীল হবে।

বন্দর সূত্রে জানা গেছে, ইয়ার্ডগুলোতে বর্তমানে ১,২৪,৭৯৯ প্যাকেজ এলসিএল (লেস-দেন-কনটেইনার লোড) কার্গো, ৬,৭৯২ প্যাকেজ বাল্ক বা খোলা পণ্য এবং ৭৭৫ প্যাকেজ ঝুঁকিপূর্ণ রাসায়নিক পড়ে রয়েছে। এসব পণ্যের কিছু কিছু অন্তত ২৩ বছর ধরে বন্দরে পড়ে আছে, যার অধিকাংশ পচে-গলে একেবারেই ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে গেছে।

বন্দর ব্যবহারকারীদের মতে, সার্বিক ক্ষতির হিসাবটি এমন: আটকে থাকা পণ্যের আনুমানিক মূল্য অন্তত ২০০ কোটি ডলার; শিপিং লাইন ও কনটেইনারের ক্ষতি প্রায় ১৫০ কোটি ডলার; বন্দরের বকেয়া স্টোরেজ মাশুল প্রায় ১০০ কোটি ডলার এবং কাস্টমসের সম্ভাব্য রাজস্ব ক্ষতি—যা বিপুল হলেও সুনির্দিষ্টভাবে পরিমাপ করা হয়নি বলছেন বিশেষজ্ঞরা। এভাবে মোট ক্ষতি ৫০০ কোটি ডলার ছাড়িয়েছে।

তবে বন্দর কর্তৃপক্ষ সতর্ক করে দিয়ে বলেছে, ক্ষতির প্রভাব কেবল এই আর্থিক অংকেই সীমাবদ্ধ নয়। ইয়ার্ডের জায়গা সংকীর্ণ হয়ে আসায় জাহাজে কন্টেইনার খালাস ও পণ্য বোঝাই কার্যক্রম  ব্যাহত হচ্ছে, যার ফলে গড়ে জাহাজের অবস্থানকাল (টার্নঅ্যারাউন্ড টাইম) বেড়ে যাচ্ছে। বার্থে ভেড়ার জন্য বহির্নোঙরে জাহাজগুলোকে দীর্ঘ সময় অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক শিপিং মহলে চট্টগ্রাম বন্দরের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করছে।

এমতাবস্থায়, সিপিএ জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) অবিলম্বে পণ্যের নিলাম প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা এবং আইনি বাধ্যবাধকতা থাকা পণ্যগুলো দ্রুত ধ্বংস করার আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে সিপিএ স্মরণ করিয়ে দিয়েছে যে, তারা ইতিমধ্যে নিলামযোগ্য পণ্য কাস্টমসের কাছে হস্তান্তর করেছে; ফলে এগুলো চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি বা ধ্বংস করার সম্পূর্ণ দায়ভার এখন কাস্টমসের ওপরই বর্তায়।

কেবল তা-ই নয়; দীর্ঘ সময় ধরে পণ্য পড়ে থাকার কারণে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের (সিপিএ) যে বিপুল আর্থিক ক্ষতি হয়েছে, তা পুষিয়ে দিতে এনবিআরকে প্রয়োজনীয় ক্ষতিপূরণমূলক পদক্ষেপ নেওয়ারও আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।

কেন আটকা পড়ে থাকে পণ্য?

দেশীয় গণমাধ্যম দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের সঙ্গে আলাপকালে ব্যবসায়ী, ফ্রেইট ফরওয়ার্ডার এবং সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টরা একাধিক প্রশাসনিক ব্যর্থতার কথা তুলে ধরেন। এর মধ্যে রয়েছে কাস্টমসের অদক্ষতা, পণ্য মূল্যায়নে বিরোধ বা দীর্ঘসূত্রতা, অপ্রয়োজনীয় নথিপত্রের দাবি, অ্যাসেসমেন্ট শেষ হওয়ার আগেই জরিমানা আরোপ এবং পরিত্যক্ত পণ্য নিলামে তুলতে চরম বিলম্ব।

চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (সিসিসিআই) সভাপতি আমিরুল হক বলেন, "কাস্টমসের অ্যাসেসমেন্ট (মূল্যায়ন) সম্পন্ন হতেই ৮ থেকে ১০ দিন সময় লেগে যায়, কিন্তু চার দিন পরই কাস্টমস ডেমারেজ চার্জ ধরা শুরু করে। ফলে পঞ্চম দিন থেকেই ব্যবসায়ীদের জরিমানা গুণতে হয়। বিলম্বিত খালাসের কারণে আমদানিকারকদের মূলধন আটকে যায়, কাঁচামাল ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ ব্যাহত হয় এবং বন্দর ইয়ার্ডেই মূল্যবান পণ্য নষ্ট হয়ে যায়।"

বাংলাদেশ ফ্রেইট ফরওয়ার্ডার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সহ-সভাপতি খায়রুল আলম সুজন বলেন, "কষ্টে অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রা খরচ করে আমদানিকৃত পণ্যগুলো এভাবে অবহেলায় পড়ে থাকে। সাধারণত অনুযায়ী, পচনশীল পণ্য থেকে শুরু করে যন্ত্রপাতি—যেকোনো কিছুই পাঁচ বছর পর কার্যকারিতা হারায়। অথচ এখানে অনেক পণ্য বহু বছর ধরে পড়ে আছে।"

অন্যদিকে কাস্টমস কর্মকর্তাদের দাবি, ৬০০টিরও বেশি মামলা আদালতে বিচারাধীন থাকায় হাজার হাজার কনটেইনার খালাস বা ধ্বংস করা সম্ভব হচ্ছে না। তবে বন্দর কর্তৃপক্ষ কাস্টমসকে বারবার চিঠি দিয়েও নিলামযোগ্য কার্গো, বিপজ্জনক কেমিক্যাল ও পরিত্যক্ত পণ্য অপসারণ করাতে পারেনি বলে অভিযোগ বন্দর কর্মকর্তাদের। অনেক অনুরোধে নিষ্পত্তি করা হয়নি বছরের পর বছর ধরে।

ব্যবসায়ীদের প্রতিক্রিয়া

চট্টগ্রাম চেম্বার, বিকেএমইএ, এফবিসিসিআই এবং বিজিএমইএ-সহ প্রধান বাণিজ্য সংগঠনগুলো এ পরিস্থিতি নিয়ে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। আটকে থাকা পণ্যের মূল্য অন্তত ২০০ কোটি ডলার বলে তারাও একমত।

সিসিসিআই সভাপতি আমিরুল হক দ্রুত কাঠামোগত পরিবর্তনের দাবি জানিয়ে বলেন, "কর্তৃপক্ষ জরিমানা, ব্যাংক গ্যারান্টি কিংবা মুচলেকার বিনিময়ে এসব পণ্য খালাস করতে পারে। সময়মতো খালাস হলে তা বাজার, অর্থনীতি এবং বন্দরের সক্ষমতা—সবকিছুর জন্যই ইতিবাচক হতো।"

ব্যবসায়ী নেতারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সংসদ সদস্যদের জন্য আনা বিলাসবহুল গাড়ি যখন দ্রুত নিষ্পত্তির প্রয়োজন হয়েছিল, তখন কাস্টমস ঠিকই তৎপরতা দেখিয়েছিল। দেশের হাজার হাজার কোটি টাকার বাণিজ্যিক পণ্য রক্ষায় কেন সেই একই জরুরি অগ্রাধিকার দেখানো হচ্ছে না?

বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নিবন্ধিত স্টার্টআপ কোম্পানি 'ওয়ার্দা অ্যান্ড জুবায়ের ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড' তাদের হিমায়িত খাদ্য কারখানার কাঁচামাল হিসেবে চলতি বছরের ৪ মে এক কনটেইনার রক সল্ট (বিট লবণ) আমদানি করে, এই চালানের মূল্য ছিল ৬,৪৪০ মার্কিন ডলার।

কাস্টমস সময়মতো পণ্য খালাস না করায় ২৩ মে কোম্পানিটি চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসকে চিঠি দিয়ে ব্যাখ্যা জানতে চায়। কাস্টমস থেকে জানানো হয়, এর জন্য শিল্প মন্ত্রণালয়ের অনাপত্তিপত্র (এনওসি) লাগবে। তবে এই শর্তের বিরোধিতা করে আমদানিকারক। তাদের নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা)—এই যুক্তি দেখিয়ে তারা হাইকোর্টে একটি রিট পিটিশন দায়ের করে।

হাইকোর্ট সাত দিনের মধ্যে পণ্যটি খালাসের জন্য কাস্টমসকে নির্দেশ দেন। কিন্তু আদালতের আদেশ সত্ত্বেও কনটেইনারটি ইয়ার্ডেই আটকে থাকে। পরবর্তীতে বিষয়টিতে আদালত অবমাননার আইনি প্রক্রিয়া শুরু হয়। এই প্রতিবেদনটি লেখার সময় পর্যন্ত ওই চালানের বিপরীতে ডেমারেজ বা বিলম্ব মাশুল ও অন্যান্য চার্জ জমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২২,০০০ মার্কিন ডলারে—যা পণ্যের মূল্যের চেয়ে তিন গুণেরও বেশি! আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের অভিযোগ, ঘুষ দিতে রাজি না হওয়ায় কাস্টমস কর্মকর্তারা ইচ্ছাকৃতভাবে এই বিলম্ব করেছেন। যদিও কাস্টমস কর্তৃপক্ষ এ অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করেছে।

উল্লেখ্য, একটি ২০ ফুটের কনটেইনারের ক্ষেত্রে প্রথম সাত দিন দৈনিক ৬.৯০ ডলার, পরবর্তী সাত দিন ১৩.৮০ ডলার এবং এর পর থেকে প্রতিদিন ১১০.০৪ ডলার পর্যন্ত স্টোরেজ চার্জ গুনতে হয়— এ ব্যয় কাঠামোর কারণে অনেক চালানোই অর্থনৈতিকভাবে আর লাভজনক থাকে না।

১,৭৬৪ দিন ধরে বন্দরে আটকে এক কনটেইনার প্লাস্টার অব প্যারিস

২০২১ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর 'সান আলফনসো' নামের জাহাজে করে প্লাস্টার অব প্যারিস বোঝাই 'টিজিএইচইউ ২৩৫৫০২৮' নম্বরের একটি কনটেইনার চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছে। ২০২৬ সালের ২৮ জুলাই পর্যন্ত এটি টানা ১,৭৬৪ দিন (প্রায় পাঁচ বছর) বন্দরে আটকে ছিল। এতে কেবল বন্দর মাশুলই জমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১,৯৩,০৭২ ডলারে।

শিপিং লাইনটি এত দীর্ঘ সময় ধরে কনটেইনারটি অন্য কোথাও ব্যবহার করতে না পারায় এটি বাণিজ্যিক সম্পদের বদলে একটি দায়ে পরিণত হয়েছে। খায়রুল আলম সুজন বলেন, "এই একটি কনটেইনারের পরিণতিই পুরো সংকটের গভীরতা প্রমাণের জন্য যথেষ্ট।"

শিপিং লাইনের ক্ষতি ও কাস্টমসের ব্যাখ্যা

কনটেইনার দীর্ঘদিন আটকে থাকায় আন্তর্জাতিক শিপিং লাইনগুলো চরম ক্ষতির মুখে পড়েছে। তাদের কনটেইনারগুলো দীর্ঘ মেয়াদে বন্দরে আটকে থাকায় বৈশ্বিক নৌ-রুটে সেগুলোকে পুনরায় নিয়োজিত করা সম্ভব হচ্ছে না। এর ফলে একদিকে শিপিং লাইনগুলো কনটেইনারের সম্ভাব্য ভাড়া থেকে আয় হারাচ্ছে, অন্যদিকে দীর্ঘকাল অলস পড়ে থাকায় কনটেইনারগুলোর কার্যক্ষমতা ও আর্থিক মূল্য দুই-ই কমে যাচ্ছে। রিফার (রেফ্রিজারেটেড) কনটেইনার চালানোর জন্য বাড়তি বিদ্যুৎ বিল গুনতে হচ্ছে।

সুজনের মতে, অলস পড়ে থাকা এসব কনটেইনারের অর্থমূল্য প্রায় ৫০ কোটি ডলার এবং এর মাধ্যমে শিপিং লাইনগুলোর সম্ভাব্য চক্রাকার আয়ের ক্ষতি আরও কয়েকশ কোটি ডলার।

এর ফলে দ্বিমুখী ক্ষতি হচ্ছে: একসূত্রে বন্দর তার রাজস্ব হারাচ্ছে, অন্যদিকে শিপিং লাইনগুলো আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এই কনটেইনার জট পণ্য ওঠানো-নামানোর গতি ধীর করে দিচ্ছে, কনটেইনার চলাচল সীমিত করছে, বন্দরের সামগ্রিক উৎপাদনশীলতা কমিয়ে দিচ্ছে। আর এর ফলে তৈরি হওয়া স্টোরেজ চার্জ, ডেমারেজ (বিলম্ব মাশুল) ও প্রশাসনিক ব্যয়ের মতো অতিরিক্ত খরচ শেষ পর্যন্ত পণ্যের দাম বাড়িয়ে সাধারণ ভোক্তার ওপরই চাপিয়ে দিচ্ছেন ব্যবসায়ীরা।

সুজন সতর্ক করে বলেন, বিপজ্জনক রাসায়নিক ও দাহ্য পণ্য দীর্ঘদিন এভাবে ফেলে রাখার ফলে অগ্নিকাণ্ড, বিস্ফোরণ ও পরিবেশগত দুর্ঘটনার ঝুঁকি মারাত্মকভাবে বাড়ছে; পাশাপাশি এটি চুরি ও সংগঠিত চোরাচালানেরও সুযোগ তৈরি করছে।

কাস্টমসের প্রতিক্রিয়া

তবে দীর্ঘদিন ধরে বন্দরে আটকে থাকা সব কনটেইনার চাইলেই ঢালাওভাবে নিলামে তোলা বা খালাস করা সম্ভব—এমন ধারণা নাকচ করে দিয়েছেন চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের মুখপাত্র শরীফ আল আমিন। তিনি জানান, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ৫,৬৩০টি কনটেইনার আইনিভাবে নিলামযোগ্য ছিল। এর মধ্যে ২০২৫ সাল থেকে ২০২৬ সালের ১৫ জুলাই পর্যন্ত ১,০৯৮টি কনটেইনার নিলামের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা হয়েছে। একই সময়ে আইন অনুযায়ী ৫৪টি কনটেইনারের পণ্য ধ্বংস করা হয়েছে এবং বর্তমানে আরও ১৩২টি কনটেইনার ধ্বংসের প্রক্রিয়ায় রয়েছে।

"বন্দরে পড়ে থাকা প্রতিটি কনটেইনারই আইনিভাবে নিলামযোগ্য নয়," উল্লেখ করে আল আমিন বলেন, "অনেক চালানই মামলা, রিট পিটিশন, তদন্ত, মূল্য নির্ধারণ সংক্রান্ত (ভ্যালুয়েশন) বিরোধ এবং অন্যান্য আইনি প্রক্রিয়ায় আটকে আছে। আদালত এসব মামলার নিষ্পত্তি না করা পর্যন্ত আমরা ওইসব কনটেইনার নিলামে তুলতে পারি না।"

তিনি জানান, পণ্য চূড়ান্ত নিষ্পত্তির আগে কাস্টমসকে বেশ কিছু সংবিধিবদ্ধ আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হয়—যেমন নোটিশ জারি করা, পণ্যের তালিকা (ইনভেন্টরি) প্রস্তুত করা, মূল্য নির্ধারণ করা, সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সংস্থার ছাড়পত্র সংগ্রহ এবং ই-নিলাম প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা।

এদিকে বিট লবণ (রক সল্ট) আমদানির ক্ষেত্রে ওঠা ঘুষ দাবির অভিযোগ প্রসঙ্গে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি আল আমিন। তবে তিনি বলেন, আমদানিকারকের কাছে এ সংক্রান্ত কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ থাকলে তাদের উচিত কাস্টমস কমিশনারের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে লিখিত অভিযোগ দায়ের করা।

বিশেষজ্ঞদের মতে সমাধান

দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা সব নিলামযোগ্য পণ্য নিষ্পত্তিতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস এবং চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের (সিপিএ) যৌথ উদ্যোগে একটি সময়াবদ্ধ ও সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করাই হবে সবচেয়ে দ্রুত ও সাশ্রয়ী সমাধান বলে মনে করেন খায়রুল আলম সুজন।

দ্রুত বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য বিশেষায়িত 'বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি' (এডিআর) টিম গঠনের পাশাপাশি কাস্টমস সংক্রান্ত মামলাগুলোর ক্ষেত্রে দ্রুত বিচার প্রক্রিয়ার (ফাস্ট-ট্র্যাক) ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তাব দেন তিনি। তিনি বলেন, "কেবল একটি দক্ষ ও গতিশীল বন্দরই বিশ্ববাণিজ্যে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বাড়াতে পারবে।"

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সাবেক সদস্য (প্রশাসন ও পরিকল্পনা) জাফর আলম কাঠামোগত সংস্কারের প্রস্তাব তুলে ধরেন। তিনি বলেন, চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস—যাদের বার্ষিক রাজস্ব আয়ের পরিমাণ প্রায় ৭০০ কোটি ডলার—তাদের নিলামযোগ্য কার্গো এবং আইনি জটিলতায় আটকে থাকা পণ্যের জন্য নিজস্ব 'ডেডিকেটেড' কনটেইনার ইয়ার্ড গড়ে তোলার মতো পর্যাপ্ত আর্থিক সক্ষমতা রয়েছে।

পাঁচ দিনের বেশি খালাস না হওয়া কনটেইনারগুলোকে বন্দরের ইয়ার্ড থেকে কাস্টমসের ওই নির্ধারিত ইয়ার্ডে স্থানান্তরের জন্য একটি বাধ্যবাধকতামূলক বিধিবিধান প্রণয়নেরও প্রস্তাব দেন তিনি। জাফর আলম বলেন, "এর ফলে বন্দরের মূল্যবান ইয়ার্ডের জায়গা খালি হবে, পরিচালন সক্ষমতা বাড়বে এবং কনটেইনার জট অনেকটাই কমে আসবে।"

আইনি সংস্কারের প্রস্তাব

আইনজীবী ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, আমদানিকারকদের হয়রানি কিংবা পণ্য খালাসে বিলম্ব ঘটানোর ক্ষেত্রে কাস্টমস কর্মকর্তাদের কোনো ধরনের জবাবদিহিতার মুখোমুখি হতে হয় না। অহেতুক পণ্য আটকে রাখা কর্মকর্তাদের শাস্তি দেওয়ার কোনো নির্দিষ্ট বিধান নেই; যার ফলে দীর্ঘায়িত আদালতের বিচার প্রক্রিয়ার যাবতীয় খেসারত শেষ পর্যন্ত ব্যবসায়ী সম্প্রদায় ও দেশের ওপরই এসে পড়ে।

কাস্টমস সংক্রান্ত বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তির লক্ষ্যে দেশে একটি 'স্বাধীন রিভিউ প্যানেল' গঠনের প্রস্তাব করেছেন সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক) চট্টগ্রাম নগর শাখার সভাপতি অ্যাডভোকেট আখতার কবীর চৌধুরী।

তাঁর প্রস্তাব অনুযায়ী, কাস্টমস কোনো পণ্যের খালাস স্থগিত বা প্রত্যাখ্যান করলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সেই মামলাটি এক দিনের মধ্যে উক্ত প্যানেলে পাঠাতে হবে এবং পরবর্তী দুই দিনের মধ্যে সেটির শুনানি অনুষ্ঠিত হবে। এই প্যানেলে সুশীল সমাজ, সরকার, এনবিআর, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ও একজন স্বাধীন আইনি বিশেষজ্ঞ প্রতিনিধি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত থাকবেন।

প্যানেলের সিদ্ধান্তে অসন্তুষ্ট পক্ষের আপিল শুনানির জন্য তিনি চট্টগ্রামে একটি এবং ঢাকায় একটি—মোট দুটি বিশেষায়িত 'কাস্টমস বেঞ্চ' গঠনের প্রস্তাবও দেন।

আখতার কবীর বলেন, "আমদানিকৃত পণ্য বন্দরে আটকে রেখে কারও কোনো লাভ হয় না। এসব পণ্য আমদানিতে দেশ আগেই মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা খরচ করেছে; তাই দীর্ঘ বিলম্ব কেবল লোকসানের পরিমাণই বাড়ায়।"

এই ধরনের একটি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে বার্ষিক খরচ ১ কোটি মার্কিন ডলারের অনেকটাই নিচে থাকবে বলে ধারণা করেন তিনি। এই আইনজীবী আরও বলেন, "সরকার প্রতি বছর কাস্টমস রাজস্ব থেকে যেখানে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার আয় করে, সেখানে একটি দ্রুত ও স্বচ্ছ বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যবস্থায় বিনিয়োগ করা হলে—তা দ্রুত পণ্য খালাস নিশ্চিত করবে, বাজারে সরবরাহ পরিস্থিতি উন্নত করবে এবং জাতীয় অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষা করবে।"

সূত্র: টিবিসি বাংলা