শিরোনাম
Passenger Voice | ০২:০৪ পিএম, ২০২৬-০৮-০২
দেশের কনটেইনার আমদানি ও রপ্তানির মধ্যে ব্যবধান ক্রমেই বাড়ছে। ফলে ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপোগুলো (আইসিডি) খালি কনটেইনারে উপচে পড়ছে। এতে রপ্তানি পণ্যের জন্য জায়গার সংকট দেখা দিচ্ছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে নীতিমালায় পরিবর্তনের জন্য নতুন করে উদ্যোগ নিয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ (সিপিএ)।
শিপিং এজেন্ট ও মেইনলাইন অপারেটররা (এমএলও) যেন বন্ডেড ওয়্যারহাউস লাইসেন্স ছাড়াই উপযুক্ত নন-বন্ডেড স্থানে খালি কনটেইনার রাখতে পারে, সেজন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কাছে অনুমোদন চেয়েছে সিপিএ। তারা বলছে, বর্তমান নিয়মের কারণে বন্দর ও বেসরকারি ডিপো—উভয় জায়গাতেই কনটেইনার জট আরও প্রকট হচ্ছে।
২৬ জুলাই দেওয়া এক চিঠিতে বন্দর কর্তৃপক্ষ তাদের একটি পুরোনো প্রস্তাব পুনরায় উত্থাপন করেছে। ২০২৫ সালের অক্টোবরে দেওয়া ওই প্রস্তাব এখনও অনুমোদন পায়নি।
আমদানি-রপ্তানির ব্যবধানে রেকর্ড
সিপিএর তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে আমদানি ও রপ্তানি কনটেইনারের ব্যবধান প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে এই ব্যবধান ছিল ১ লাখ ৭৭ হাজার ৮৩২ টিইইউএস (টুয়েন্টি ফুট ইকুইভ্যালেন্ট ইউনিট))। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা বেড়ে রেকর্ড ৩ লাখ ২৯ হাজার ৯৯৬ টিইইউএসে দাঁড়িয়েছে।
২০২১-২২ অর্থবছরে দেশে ১৭ লাখ ২০ হাজার টিইইউএস কনটেইনার আমদানি ও ১৫ লাখ ৪০ হাজার টিইইউএস রপ্তানি হয়। ব্যবধান ছিল ১ লাখ ৭৭ হাজার ৮৩২ টিইইউএস।
২০২২-২৩ অর্থবছরে আমদানি কিছুটা কমে ১৬ লাখ ২০ হাজার ও রপ্তানি কমে ১৩ লাখ ৮০ হাজার টিইইউএস হয়। তারপরও এই ব্যবধান বেড়ে দাঁড়ায় ২ লাখ ৩৭ হাজার ৬০৯ টিইইউএসে।
২০২৩-২৪ অর্থবছরে আমদানি আবার বেড়ে ১৭ লাখ ২০ হাজার টিইইউএসে পৌঁছায়। অন্যদিকে রপ্তানি দাঁড়ায় ১৪ লাখ ৫০ হাজার টিইইউএস। এতে কনটেইনারের ভারসাম্যহীনতা আরও বেড়ে ২ লাখ ৭৮ হাজার ৫০০ টিইইউএস হয়।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে এই ব্যবধান সামান্য কমে ২ লাখ ৭৬ হাজার ৩৫৭ টিইইউএস হলেও, রপ্তানির চেয়ে আমদানি বেশি ছিল। এ সময় ১৭ লাখ ৯০ হাজার টিইইউএস আমদানির বিপরীতে রপ্তানি হয় ১৫ লাখ ১০ হাজার টিইইউএস।
সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আমদানি বেড়ে ১৯ লাখ ৩০ হাজার টিইইউএস ও রপ্তানি বেড়ে ১৬ লাখ টিইইউএসে উন্নীত হয়।
এ খাতের অপারেটরদের তথ্যমতে, দেশের ২৪টি বেসরকারি আইসিডির মোট ধারণক্ষমতা প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার টিইইউএস। সেগুলোতে এখন ৫৬ হাজার ৫৬৫ টিইইউএস খালি কনটেইনার পড়ে আছে।
বাংলাদেশ ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপো অ্যাসোসিয়েশনের (বিকডা) মহাসচিব রুহুল আমিন শিকদার বলেন, অফিশিয়াল পরিসংখ্যানে পণ্যভর্তি ও খালি উভয় ধরনের কনটেইনারের হিসাবই অন্তর্ভুক্ত থাকে। তাই বাস্তবে বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণ আনুষ্ঠানিক পরিসংখ্যানের চেয়েও অনেক বেশি।
তিনি বলেন, 'দেশের প্রকৃত রপ্তানির পরিমাণ আমদানির প্রায় অর্ধেক।'
রুহুল আমিন আরও বলেন, 'জাহাজ আসা-যাওয়ার সময় পণ্যবোঝাই ও খালি—সব কনটেইনারই বন্দরের পরিসংখ্যানে হিসাব করা হয়। ফলে প্রকাশিত এই পরিসংখ্যানে রপ্তানি পণ্যের প্রকৃত পরিমাণ উঠে আসে না।'
২০২৩ পঞ্জিকাবর্ষের বিস্তারিত তথ্য অনুসাড়ে, ওই বছর ৯৪ হাজার ৯১৫টি খালি কনটেইনারসহ মোট ১৩ লাখ ৩৭ হাজার ৬১৩ টিইইউএস কনটেইনার আমদানি করেছে বন্দর। একই সময়ে মোট রপ্তানি হয়েছে ১৩ লাখ ১৫ হাজার ৩৩৭ টিইইউএস কনটেইনার। তবে এর মধ্যে বিদেশে পাঠানো ৫ লাখ ৮৪ হাজার ৮৯১ টিইইউএস কনটেইনারই খালি ছিল।
খালি কনটেইনারের হিসাব বাদ দিলে, পণ্যভর্তি কনটেইনার আমদানির পরিমাণ ছিল ১২ লাখ ৪২ হাজার ৬৯৮ টিইইউএস। বিপরীতে পণ্যভর্তি কনটেইনার রপ্তানির পরিমাণ ছিল মাত্র ৭ লাখ ৩০ হাজার ৪৪৬ টিইইউএস। ফলে কনটেইনারভিত্তিক বাণিজ্যে প্রকৃত ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়ায় ৫ লাখ ১২ হাজার ২৫২ টিইইউএস।
তিনি বলেন, অলস পড়ে থাকা কনটেইনারের স্তূপ বাড়তে থাকায় রপ্তানি পণ্যের জন্য জায়গার সংকট দেখা দিচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, 'শিপিং লাইনগুলোকে যদি নন-বন্ডেড স্থানে খালি কনটেইনার রাখার অনুমতি দেওয়া হয়, তাহলে আইসিডি অপারেটর ও শিপিং লাইন উভয়ই বেশ স্বস্তি পাবে।'
নীতিমালায় পরিবর্তনের আহ্বান বন্দরের
এনবিআরকে দেওয়া চিঠিতে সিপিএ বলেছে, আমদানি করা সব লেস-দ্যান-কনটেইনার-লোড (এলসিএল) কার্গো বন্দরের খালাস করা হয়। এছাড়া ফুল কনটেইনার লোড (এফসিএল) আমদানির প্রায় ৭০ শতাংশ পণ্য খালাসের জন্য বন্দরের ভেতরেই খোলা হয়। আমদানিকারকরা তাদের পণ্য নিয়ে যাওয়াত প্রতিদিন কয়েক হাজার কনটেইনার খালি হয়।
কিন্তু প্রতিদিন যে হারে কনটেইনার খালি হয়, সেই তুলনায় সেগুলো সরিয়ে নেওয়ার গতি অনেক ধীর। ফলে বন্দর ও বেসরকারি ডিপো দুই জায়গাতেই খালি কনটেইনারের স্তূপ বেড়েই চলেছে।
বন্দর কর্তৃপক্ষ বলেছে, শিপিং এজেন্ট ও এমএলওগুলো এসব কনটেইনারের জন্য দায়বদ্ধ। তবে এনবিআরের বর্তমান নিয়মের কারণে তারা বন্ডেড স্থাপনার বাইরে খালি কনটেইনার রাখতে পারে না।
সিপিএ আরও জানায়, বাংলাদেশের প্রতিবেশী দেশগুলোসহ বিশ্বের অনেক দেশেই শিপিং লাইনগুলোকে বন্ডেড ওয়্যারহাউসের লাইসেন্স ছাড়াই উপযুক্ত স্থানে খালি কনটেইনার রাখার অনুমতি দেওয়া হয়।
বাংলাদেশেও একই ধরনের ব্যবস্থা চালু করা হলে ইয়ার্ডের ব্যবহার আরও কার্যকর হবে, কনটেইনার জট কমবে ও কনটেইনার ব্যবস্থাপনায় গতি আসবে বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়।
খালি কনটেইনার সরাতে বাণিজ্যিক অনাগ্রহ
বাংলাদেশ ফ্রেইট ফরোয়ার্ডার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সহসভাপতি ও বাংলাদেশ শিপিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক পরিচালক খায়রুল আলম সুজন বলেন, খালি কনটেইনার রাখার চেয়ে পণ্যভর্তি আমদানি-রপ্তানি কনটেইনার হ্যান্ডলিং করে ডিপো অপারেটররা অনেক বেশি আয় করেন।
আবার খালি কনটেইনার পরিবহনে শিপিং লাইনগুলোকেও লোকসান গুনতে হয়।
তিনি বলেন, 'একটি পণ্যভর্তি কনটেইনার থেকে প্রায় ৩০০ ডলার ফ্রেইট চার্জ পাওয়া যায়। কিন্তু জাহাজে একই পরিমাণ জায়গা দখল করা এবং সমান হ্যান্ডলিং খরচ হওয়ার পরও একটি খালি কনটেইনার থেকে আয় হয় মাত্র ১০০ ডলারের মতো।
'এর ফলে শিপিং লাইনগুলো অনেক সময় খালি কনটেইনার সরিয়ে নিতে দেরি করে। এতে কনটেইনারগুলো দীর্ঘসময় বাংলাদেশে পড়ে থাকে এবং পুরো লজিস্টিকস ব্যবস্থায় জট আরও প্রকট আকার ধারণ করে।'
দীর্ঘমেয়াদি সমাধান প্রয়োজন
খাতসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খালি কনটেইনারের এই ক্রমবর্ধমান স্তূপ কেবল জায়গার অভাবের পাশাপাশি দেশের কাঠামোগত বাণিজ্য ঘাটতিরই প্রতিফলন।
নন-বন্ডেড স্থানে কনটেইনার রাখার অনুমতি দেওয়ার পাশাপাশি দীর্ঘস্থায়ী বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে রপ্তানি বৃদ্ধির ওপর জোর দেন তারা। একইসঙ্গে খালি কনটেইনার স্থানান্তরের তথ্যের মানোন্নয়ন এবং সিপিএ, কাস্টমস, এনবিআর, শিপিং লাইন ও ডিপো অপারেটরদের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর পরামর্শ দেন।
তারা বলেন, এসব পদক্ষেপ না নিলে কনটেইনারের চাপ বাড়ার সাথে সাথে বন্দর ও দেশের লজিস্টিকস নেটওয়ার্কের ওপর চাপ আরও তীব্র হবে। সৌজন্যে টিবিএস বাংলা
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত 2019 - 2026 PassengerVoice | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Developed By Muktodhara Technology Limited.
পাবলিক মতামত