ডাকসেবা: ১ টাকা আয়ে খরচ ১২ টাকা

Passenger Voice    |    ১১:২৪ এএম, ২০২৬-০৮-০২


ডাকসেবা: ১ টাকা আয়ে খরচ ১২ টাকা

ডিজিটাল যোগাযোগমাধ্যমের প্রসার এবং বেসরকারি কুরিয়ার সেবার বিস্তারে দেশের প্রচলিত ডাকসেবার ব্যবহার ধারাবাহিকভাবে কমে যাচ্ছে। অথচ বিশাল অবকাঠামো ও জনবল ধরে রাখার কারণে বাংলাদেশ ডাক বিভাগের উত্তরাঞ্চলীয় সার্কেলে ব্যয় বেড়েই চলেছে। ফলে গত অর্থবছরে এই সার্কেলের আয়-ব্যয়ের ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৫৯ কোটি ২৯ লাখ টাকা।

ডাক বিভাগের উত্তরাঞ্চলীয় সার্কেলের ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বার্ষিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, আলোচ্য সময়ে সার্কেলটির আয় হয়েছে ১৩ কোটি ৭২ লাখ টাকা। বিপরীতে ব্যয় হয়েছে ১৭৩ কোটি ১ লাখ টাকা। অর্থাৎ প্রতি ১ টাকা আয়ের বিপরীতে ব্যয় হয়েছে ১২ টাকারও বেশি।

রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের আওতাধীন উত্তরাঞ্চলীয় সার্কেলের অধীনে বর্তমানে ২ হাজার ১৯৯টি ডাকঘর রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আছেন ৭ হাজার ৮৬৪ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী, যার মধ্যে ৫ হাজার ৩৩৭ জন অতিরিক্ত বিভাগীয় (ইডি) কর্মচারী।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ডিজিটাল যোগাযোগের বিস্তার এবং বেসরকারি কুরিয়ার প্রতিষ্ঠানের জনপ্রিয়তায় প্রচলিত ডাকসেবার চাহিদা দ্রুত কমছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সার্কেলটি দেশি-বিদেশি মিলিয়ে মাত্র ২৭ লাখ ৯০ হাজার ডাকসামগ্রী পরিবহন করেছে। এর মধ্যে ২৭ লাখ ৬০ হাজার ছিল নিবন্ধিত দেশীয় চিঠি এবং আন্তর্জাতিক নিবন্ধিত ডাকসামগ্রীর সংখ্যা ছিল মাত্র ১৭ হাজার ৪৫২টি।

জানা গেছে, এক সময়ের জনপ্রিয় বিমাকৃত নিবন্ধিত ডাক (ইনসিউর্ড রেজিস্টার্ড পোস্ট) প্রায় বিলুপ্তির পথে। একইভাবে ভ্যালু পে-অ্যাবল (ভিপি) ডাকসেবার ব্যবহারও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। গত তিন অর্থবছরে আয় সামান্য বৃদ্ধি হলেও ব্যয়ের চাপ কমেনি। ২০২২-২৩ অর্থবছরে আয় ছিল ১৩ কোটি ৬ লাখ টাকা, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১৩ কোটি ৩৭ লাখ এবং সর্বশেষ অর্থবছরে ১৩ কোটি ৭২ লাখ টাকায় পৌঁছেছে।

ব্যয়ের বড় অংশই গেছে জনবল ও প্রশাসনিক খাতে। গত অর্থবছরে শুধু পেনশন ও অবসরজনিত সুবিধা বাবদ ব্যয় হয়েছে ৬৩ কোটি ৯০ লাখ টাকা। এ ছাড়া সরঞ্জাম ও সরবরাহ খাতে ৩৮ কোটি ১৫ লাখ, বেতন-ভাতা বাবদ ৩৬ কোটি ২৪ লাখ এবং অফিস ভাড়া বাবদ ৩৩ কোটি ২০ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে।

অন্যদিকে আয়ের সবচেয়ে বড় উৎস ছিল সেবা চার্জ ও কমিশন, যা থেকে এসেছে ৫ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। ডাকটিকিট বিক্রি থেকে আয় হয়েছে ৩ কোটি ৭৬ লাখ, ডাক মাশুল থেকে ১ কোটি ৩২ লাখ এবং অন্যান্য সেবা থেকে ১ কোটি ৮৬ লাখ টাকা।

প্রতিবেদনটিতে প্রশাসনিক দুর্বলতার চিত্রও উঠে এসেছে। উত্তরাঞ্চলীয় সার্কেলের ২ হাজার ১৯৯টি ডাকঘরের মধ্যে মাত্র ৮২৬টি ডাক বিভাগের নিজস্ব জমিতে পরিচালিত হচ্ছে। বাকিগুলো ভাড়া করা ভবন বা ব্যক্তি ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের জমিতে পরিচালিত হচ্ছে।

এ ছাড়া ডাক বিভাগের মালিকানাধীন ৩ হাজার ৮৬৫ দশমিক ৭৬ শতক জমির নামজারি এখনো সম্পন্ন হয়নি। পাশাপাশি ৩৮৩টি অডিট আপত্তি নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে। এর মধ্যে ২০টি সাধারণ, ১৩৭টি অগ্রিম এবং ২২৬টি খসড়া আপত্তি।

ডাক বিভাগের অতিরিক্ত পোস্টমাস্টার জেনারেল (উত্তরাঞ্চলীয় সার্কেল) আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘বাংলাদেশ ডাক বিভাগকে লাভজনক বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নয়, বরং জনসেবামূলক প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।’ তিনি বলেন, ‘রেলওয়ের মতোই দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত ডাকসেবা চালু রাখা আমাদের দায়িত্ব। সেবা লাভজনক হোক বা না হোক, এই কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে হয়।’

তবে চিঠিপত্র পরিবহনের পরিমাণ কমে যাওয়া এবং ব্যয় বৃদ্ধির কারণ সম্পর্কে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত মন্তব্য করতে রাজি হননি তিনি। প্রতিবেদনের বিস্তারিত পর্যালোচনা করে পরে এ বিষয়ে ব্যাখ্যা দেবেন বলে জানান তিনি।