গভীর সমুদ্রে ভাড়া জাহাজে টুনা মাছ ধরবে মৎস্য দপ্তর

Passenger Voice    |    ১০:৫০ এএম, ২০২৬-০৮-০২


গভীর সমুদ্রে ভাড়া জাহাজে টুনা মাছ ধরবে মৎস্য দপ্তর

বঙ্গোপসাগরের গভীর সমুদ্রে ও আন্তর্জাতিক জলসীমায় টুনা মাছের মজুত এবং এ জাতীয় মাছ আহরণ, প্রক্রিয়াকরণ এবং বিদেশে রপ্তানির কলাকৌশল পরীক্ষণ ও গবেষণার জন্য দুটি ভাড়া জাহাজ আনছে মৎস্য অধিদপ্তর। টুনা মাছ আহরণের জন্য দুটি জাহাজ ক্রয়ের কথা থাকলেও সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসে এবার ভাড়া করা জাহাজে জরিপ চালাবে মৎস্য অধিদপ্তর।

জানা গেছে, আগামী অক্টোবর মাসের প্রথম সপ্তাহেই জাহাজ দুটি দেশে আসছে। গত ৩১ মার্চ দরপত্র ও প্রস্তাব উন্মুক্তকরণ কমিটি তিনটি প্রতিষ্ঠানের কারিগরি প্রস্তাব উন্মুক্ত করে এবং কারিগরি মূল্যায়নে উত্তীর্ণ হয়। প্রতিষ্ঠান তিনটি হলো–বাংলাদেশের সাসটেইনেবল রিসার্চ অ্যান্ড কনসালট্যান্সি লিমিটেড (এসআরসিএল), দক্ষিণ কোরিয়ার নিউ ওয়াটার টেক কোম্পানি লিমিটেড এবং বাংলাদেশের শতাব্দী হাই বাংলাদেশ লিমিটেডের সমন্বয়ে গঠিত একটি যৌথ উদ্যোগ (জেভি) প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করবে। চলতি বছরের ১০ মে এ তিনটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের চুক্তি সম্পাদন হয়। 

পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের আর্থিক প্রস্তাবের সঙ্গে আয়কর ও ভ্যাট যুক্ত হওয়ায় মোট চুক্তিমূল্য ৩৫ কোটি ৬০ লাখ ১৯ হাজার ৭৭ টাকা। গত ২৪ জুন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে অনুষ্ঠিত ‘সরকারি ক্রয়’সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি ক্রয় প্রস্তাবটি অনুমোদন করে। 

সংশ্লিষ্টরা জানান, বাংলাদেশের জলসীমায় সেপ্টেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত টুনা মাছ বেশি থাকে এবং অন্য সময় উপকূলের কাছাকাছি এলাকায় টুনাজাতীয় মাছ পাওয়া যায়। আন্তর্জাতিক জলসীমায় মাছ ধরতে লং-লাইনার ও পার্স-সেইনার ধরনের জাহাজের প্রয়োজন হয় এবং এ ধরনের জাহাজ বাংলাদেশে একটিও নেই। বঙ্গোপসাগরে ২০০ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত বাংলাদেশের জলসীমা, এর পর থেকে আন্তর্জাতিক জলসীমা শুরু। কিন্তু দেশের জাহাজগুলো আন্তর্জাতিক জলসীমায় গিয়ে মাছ ধরে না। 

বঙ্গোপসাগরের গভীর সমুদ্রে টুনা মাছ আহরণে পাইলট প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ড. মো. জুবায়দুল আলম খবরের কাগজকে বলেন, আগে দুটি জাহাজ কেনার কথা ছিল। কিন্তু সমুদ্রে মাছ পাওয়া না গেলে জাহাজ কেনা বৃথা হবে। তাই প্রকল্পটির দ্বিতীয় সংশোধিত ডিপিপি অনুযায়ী ভাড়ায় জাহাজ আনা হচ্ছে। জাহাজ দুটি সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে দেশে আসার কথা রয়েছে চুক্তি অনুয়ায়ী। 

জুবায়দুল আলম জানান, ২০২১ সালের ডিসেম্বরে ইউনি মেরিন সার্ভিসেস পিটিই লিমিটেড, সিঙ্গাপুরের সঙ্গে চুক্তি করা হয় দুটি জাহাজ ক্রয়ের জন্য। ২০২৩ সালের আগস্টে ১৯ লাখ ২৪ হাজার মার্কিন ডলারের ঋণপত্র (এলসি) খোলা হয়। কিন্তু পরবর্তী সময়ে চুক্তি বাতিল করে জাহাজ কেনা থেকে সরে আসে সরকার।

বাংলাদেশের সাসটেইনেবল রিসার্চ অ্যান্ড কনসালট্যান্সি লিমিটেডের (এসআরসিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবু জুবায়ের খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমাদের সঙ্গে মৎস্য অধিদপ্তরের চুক্তি হয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ে কাজ শুরু করা হবে।’ 

মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মোহাম্মদ খালেদ কনক বলেন, ‘টুনা মাছ আছে কি না জরিপ চালানোর জন্য জাহাজ দুটি ভাড়া করা হয়েছে। টেন্ডারের মাধ্যমে এ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। জাহাজ দুটির অক্টোবর থেকে কাজ শুরু করার কথা রয়েছে। বঙ্গোপসাগরে বিশাল এলাকার একান্ত অর্থনৈতিক অঞ্চলের (ইইজেড) জলসম্পদের মালিক হলেও আমাদের এই জলসীমায় টুনা মাছের উপস্থিতি কী পরিমাণ আছে তা খতিয়ে দেখা হবে। যদিও টুনা নিয়ে পূর্ণাঙ্গ জরিপ পৃথিবীর কোনো দেশে নেই, তবে দু-একটি দেশের কাছে টুনা কোন কোন আঞ্চলে পাওয়া যায় তার তথ্য রয়েছে।’

সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, ২০১৮ সালে ইন্ডিয়ান ওশান টুনা কমিশনের (আইওটিসি) সদস্যপদ পায় বাংলাদেশ। আইওটিসির সদস্য হওয়ায় বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক জলসীমায় (বঙ্গোপসাগর ও ভারত মহাসাগরের আন্তর্জাতিক জলসীমা) মাছ ধরার অধিকার পেয়েছে। তবে আইওটিসির সদস্য দেশ হিসেবে সংস্থাটিকে প্রতিবছর বাংলাদেশকে প্রায় ৭০ হাজার মার্কিন ডলার (প্রায় ৮৬ লাখ টাকা) চাঁদা দিতে হয়। আইওটিসির সদস্যপদ পাওয়ার পর থেকে আন্তর্জাতিক জলসীমায় কোন দেশ কত মাছ ধরছে, কোন প্রযুক্তি ব্যবহার করছে এ ধরনের তথ্য-উপাত্ত পেয়ে থাকে বাংলাদেশ।

মৎস্য অধিদপ্তর জানায়, বঙ্গোপসাগরে সামুদ্রিক সম্পদের অনুসন্ধান পরিচালনাসংক্রান্ত জরিপকাজের জন্য ইসলামী ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক ও মালয়েশিয়া সরকারের অর্থায়নে বাংলাদেশ মেরিন ফিশারিজ ক্যাপাসিটি বিল্ডিং প্রকল্পের আওতায় গবেষণা জাহাজ আরভি মিন সন্ধানী মালয়েশিয়া থেকে সংগ্রহ করা হয়। পরবর্তী সময়ে ২০১৬ সালের ১৯ নভেম্বর জরিপ জাহাজটি কমিশনিং লাভ করে। দেশে বর্তমানে বিভিন্ন কোম্পানির ২৬৩টি ফিশিং ভ্যাসেল (মাছ ধরার জাহাজ) রয়েছে। এর বাইরে ৭০ হাজারের মতো ট্রলার ও নৌকাও বঙ্গোপসাগরের ২৪ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকায় মাছ শিকার করে। এসব জাহাজ ও নৌকা বছরে ৬ লাখ টনেরও বেশি মাছ শিকার করে। বঙ্গোপসাগরের এই অঞ্চলে ৪৭৬ প্রজাতির মাছ ও ৩৯ প্রজাতির চিংড়ি রয়েছে বলে মৎস্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে।