শিরোনাম
Passenger Voice | ০১:৪৫ পিএম, ২০২৬-০৭-২৮
দেশজুড়ে সাড়া জাগানো ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস ২০২৫-২৬’-এর প্রথম আসরে ম্যান অব দ্য টুর্নামেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন নাটোরের লালপুর উপজেলার কিশোরী ফুটবলার জান্নাতুল ফেরদৌস ফারিহা ওরফে ফারিহা মনি। মাঠে তার দুর্দান্ত পারফরম্যান্স নজর কেড়েছে দর্শক ও সংশ্লিষ্টদের।
জাতীয় পর্যায়ের অনূর্ধ্ব-১৪ নারী ফুটবলে রাজশাহী অঞ্চলকে ফাইনালে পরাজিত করে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে রংপুর বিভাগ। এর আগে বরিশাল অঞ্চলকে ৫-০ গোলে এবং খুলনা বিভাগকে ২-০ গোলে পরাজিত করে ফাইনালে জায়গা করে নেয় দলটি। দলের এই সাফল্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে ফারিহার অসাধারণ নৈপুণ্য। দুটি ম্যাচে দলের করা ৭ গোলের মধ্যে ৫টিই এসেছে তার পা থেকে।
সোমবার (২৭ জুলাই) প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ঢাকার আর্মি স্টেডিয়ামে ফারিহার হাতে ম্যান অব দ্য টুর্নামেন্ট পুরস্কার তুলে দেন। এ সময় মাথায় হাত বুলিয়ে আশীর্বাদ করেন তিনি।
উদীয়মান নারী ফুটবল তারকা জান্নাতুল ফেরদৌস ফারিহা ওরফে ফারিহা মনির জন্ম নাটোর জেলার লালপুর উপজেলার ওয়ালিয়া ইউনিয়নের নান্দরায়পুর গ্রামে। অভাব-অনটনে ঘেরা তার পারিবারিক জীবন। স্থানীয় নান্দরায়পুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ুয়া এই ফরোয়ার্ডের ফুটবলের আঙিনায় উঠে আসার গল্পটা একটু অন্য রকম।
পারিবারিক প্রতিকূলতাকে জয় করে আজ ফারিহা মনি এই অবস্থানে এসেছে। তার বাবা মুকুল মণ্ডল একজন বাক্প্রতিবন্ধী। তেমন কোনো কাজকর্ম করতে পারেন না। মা আজেলা বেগম স্থানীয় এলজিইডির রাস্তায় দিনমজুরের কাজ করে সংসার চালান। এক বোন ও এক ভাইসহ পাঁচজনের সংসারের টানাপোড়েনের মধ্যেও ফুটবলের স্বপ্নকে বুকে আগলে রেখে ফারিহা মনির সাফল্য সত্যিই অনুপ্রেরণাদায়ক।
প্রতিবন্ধী বাবা ও ভাইয়ের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে নিজেদের সামান্য জমিতে কাদায় ধান রোপণ কিংবা পচা পানিতে নেমে পাট ধোয়ার মতো কঠিন কায়িক পরিশ্রমও করতে হয় তাকে। ফুটবলার হওয়ার স্বপ্নে বিভোর এই অদম্য কিশোরী প্রতিদিনের ক্লান্তি উপেক্ষা করে বাড়ি থেকে দীর্ঘ আট কিলোমিটার সাইকেল চালিয়ে উপজেলার গোপালপুর পৌরসভার নর্থ বেঙ্গল ফুটবল একাডেমিতে গিয়ে নিয়মিত কঠোর অনুশীলন করেছে।
আর্থিক অসচ্ছলতা থাকলেও পরিবারের সমর্থন ফারিহা মনির ফুটবলার হওয়ার পথে অন্তরায় হতে পারেনি। মেয়ের ফুটবল খেলার প্রতি বাবা-মায়ের সমর্থন থাকলেও সমাজের রক্ষণশীল দৃষ্টিভঙ্গি বাধা হয়ে দাঁড়ায়। প্রতিনিয়ত কটূক্তি, লোকলজ্জা আর সমাজের বাঁকা চোখকে উপেক্ষা করে ফারিহা মনি তার লক্ষ্য স্থির রেখে এগিয়ে চলেছে।
ফারিহা মনি জানায়, এই লড়াইয়ে তার পাশে ঢাল হয়ে সব সময় দাঁড়িয়েছিলেন তার কোচ মোহাম্মদ জুয়েল। অনুশীলনে যাওয়ার মতো যাতায়াত ভাড়া কিংবা ভালো বুট কেনার টাকা পরিবারের ছিল না। কোচ জুয়েল নিজের সন্তানের মতো সব ব্যবস্থা করেছেন। এমনকি দরকারি হাত খরচও দিয়েছেন।
তৃণমূল থেকে জাতীয় পর্যায়ে উঠে আসার এই জার্নিটা ফারিহা মনির জন্য যেমন ছিল কষ্টের, তেমনি আনন্দের। তৃতীয় শ্রেণি থেকে ফুটবলের আঙিনায় পা রাখা ফারিহা উপজেলা পর্যায়ে ইনজুরির কারণে খেলতে না পারলেও, চোট সারিয়ে জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে দুর্দান্ত পারফর্ম করে জাতীয় আসরে নিজের যোগ্যতার জানান দিয়েছে।
প্রিয় ফুটবলার জাতীয় দলের তারকা ফরোয়ার্ড ঋতুপর্ণা চাকমার প্রতি ভালোবাসা থেকেই ফারিহা মনি নিজের জার্সির নম্বরও বেছে নিয়েছে ১৭। বরিশাল বিভাগের বিরুদ্ধে রাজশাহী বিভাগের করা পাঁচটি গোলের মধ্যে চারটি এবং সেমিফাইনালে খুলনা বিভাগের বিরুদ্ধে করা দুটি গোলের মধ্যে একটি সর্বাধিক ৫টি গোল করে ‘ম্যান অব দ্য টুর্নামেন্ট’ হলেও দলের অন্য সহখেলোয়াড়দের দারুণ পাসের কারণেই সম্ভব হয়েছে বলে কৃতজ্ঞতা জানিয়েছে সে।
নর্থ বেঙ্গল ফুটবল একাডেমির কোচ মোহাম্মদ জুয়েল বলেন, ‘কোনো ক্লান্তি, অভাব কিংবা সামাজিক প্রতিবন্ধকতা ফারিহাকে থামাতে পারেনি। গ্রামের মেঠোপথ থেকে শুরু হওয়া তার এই যাত্রা একদিন আন্তর্জাতিক ফুটবলের বড় মঞ্চে পৌঁছাবে—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।’
ওয়ালিয়া উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক (ভারপ্রাপ্ত) মো. আব্দুস সাত্তার বলেন, ‘গ্রামের ধুলিমাখা মাটির সঙ্গে মিশে থাকা ফারিহা মনির কৃতিত্ব আমাদের গর্বিত করেছে। তার পরিচয়ে আমাদের এই বিদ্যালয় পরিচিত হবে। সে একদিন দেশের মুখ উজ্জ্বল করবে ইনশা আল্লাহ।’
নাটোর-১ (লালপুর-বাগাতিপাড়া) আসনের নির্বাচিত সংসদ সদস্য ও সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার ফারজানা শারমীন পুতুল নিজের ফেসবুক পেজে তাকে শুভেচ্ছা জানিয়ে লিখেছেন, ‘বাংলার প্রতিটি ঘরে ঘরে এমন ফারিহার জন্ম হোক—এটাই প্রত্যাশা।’
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত 2019 - 2026 PassengerVoice | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Developed By Muktodhara Technology Limited.
পাবলিক মতামত