বেহাল দশায় দেশের শিল্প খাত

Passenger Voice    |    ১১:০৬ এএম, ২০২৬-০৭-২৭


বেহাল দশায় দেশের শিল্প খাত

দেশের শিল্প খাতের বেহাল দশা। দুই বছরে উৎপাদন খরচ বেড়েছে কয়েক গুণ। গত অর্থবছরের প্রায় সারা সময়জুড়ে রপ্তানি আয়ে নেতিবাচক ধারা ছিল। সদ্য প্রকাশিত বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যানুসারে জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে শিল্প খাতে ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি দেখা দিয়েছে। 

এমন পরিস্থিতিতে জোরপূর্বক শ্রমে (ফোর্সড লেবার) উৎপাদিত পণ্যের আমদানি প্রতিরোধে যথাযথ ব্যবস্থা না নেওয়ার অভিযোগে বাংলাদেশসহ ৬০টি বাণিজ্য অংশীদার দেশের পণ্যের ওপর নতুন করে অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র, যা ২৪ জুলাই থেকে কার্যকর হয়েছে। প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর তুলনায় এই শুল্ক কম হলেও বাংলাদেশের রপ্তানি প্রতিযোগিতায় বড় ধরনের চাপ তৈরি হবে বলে জানিয়েছেন শিল্প খাতের সংশ্লিষ্টরা।

অর্থনীতির বিশ্লেষকরা বলেন, কাঁচামালের দাম আগের চেয়ে বেশি। জ্বালানিসংকট কমছে না। এমন পরিস্থিতিতে যেকোনো ধরনের বাড়তি খরচ গোটা শিল্প খাতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। শিল্প খাতে গতি আনতে হলে সরকারকে নগদ প্রণোদনা বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে শুল্ক-করে ছাড় দিতে হবে। 

ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, ‘বাংলাদেশের শিল্প খাত সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। উৎপাদন খরচ আগের চেয়ে বেড়েছে। অন্য প্রতিযোগী দেশের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক কম আরোপ হয়েছে, এটি ভালো খবর। তবে দেশের শিল্প খাতের যে সংকট, তাতে এই শুল্ক আরোপও আমাদের জন্য চাপ হয়ে যাবে।’ 

ব্যবসায়ী এই নেতা বলেন, জ্বালানি খাতের সমস্যা সমাধান ও নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে স্থানীয় গ্যাস অনুসন্ধান বৃদ্ধি করা জরুরি। পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার উৎসাহিত করতে নীতিমালা সংস্কার করতে হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পুনঃঅর্থায়ন স্কিমকে সিএমএসএমইদের জন্য সহজ করতে হবে এবং সুদের হার যৌক্তিক পর্যায়ে কমাতে হবে। সর্বোপরি রপ্তানি বহুমুখীকরণ ও উচ্চমূল্য সংযোজিত পণ্য উৎপাদনে জোর দিতে হবে। 

তিনি আরও বলেন, ‘সম্প্রতি সরকারের তরফ থেকে রাষ্ট্রায়ত্ত ৪৪টি কারখানা বন্ধ ও লোকসানি শিল্পপ্রতিষ্ঠানে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আহ্বানের সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত বলে মনে করি। এতে শিল্প-সংকট কিছুটা হলেও কমবে। শিল্প-সংকট কাটিয়ে উঠতে হলে এই ধরনের আরও উদ্যোগ প্রত্যাশা করছি।’

যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্ক আরোপের ফলে বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্য নতুন করে চাপে পড়বে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম।তিনি বলেন, ‘চীন, ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ডের মতো প্রতিযোগী দেশগুলোকে ১২ দশমিক ৫ শতাংশ শুল্ক দিতে হবে। সেখানে বাংলাদেশ সর্বনিম্ন ১০ শতাংশ শুল্কের তালিকায় রয়েছে। ২ দশমিক ৫ শতাংশ শুল্ক ব্যবধানের কারণে মার্কিন বাজারে বাংলাদেশের পোশাক খাতের প্রতিযোগিতা দেশগুলোর তুলনায় কিছুটা এগিয়ে থাকার কথা। কিন্তু মনে রাখতে হবে, ওই সব দেশের শিল্প খাতে আমাদের চেয়ে সক্ষম। তাই এ বাড়তি শুল্কের ফলে আমরা চাপে পড়ব। এখন আমাদের দেশের সরকারের দিকে চেয়ে আছি। আমাদের শিল্পের সক্ষমতা বাড়াতে সরকারি সহযোগিতা প্রয়োজন।’ 

ব্যবসায়ী এই নেতা বলেন, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় একক রপ্তানি বাজার যুক্তরাষ্ট্র। প্রতিবছর কয়েক বিলিয়ন ডলারের তৈরি পোশাক, চামড়াজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, প্লাস্টিক, কৃষিপণ্যসহ বিভিন্ন পণ্য দেশটিতে রপ্তানি হয়। এমন বাস্তবতায় যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্কনীতি বাংলাদেশের রপ্তানি খাতের জন্য নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।

বিকেএমইএ সূত্র জানায়, বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮০ শতাংশ আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। আর যুক্তরাষ্ট্র এই খাতের সবচেয়ে বড় একক বাজার। প্রতিবছর কয়েক বিলিয়ন ডলারের পোশাক যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি হয়। নতুন শুল্ক কার্যকর হওয়ার ফলে বাংলাদেশি পণ্য আমদানিতে মার্কিন ক্রেতাদের খরচ বেড়ে যাবে। বাস্তবে শুল্ক পরিশোধ করেন আমদানিকারকরা। কিন্তু অতিরিক্ত ব্যয় তারা অনেক ক্ষেত্রে সরবরাহকারীদের ওপর চাপিয়ে দেন। ফলে রপ্তানিকারকদের কম দামে পণ্য বিক্রি করতে হতে পারে অথবা ক্রেতারা বিকল্প উৎসের দিকে ঝুঁকতে পারেন। ফলে বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের মুনাফা কমে যাওয়ার পাশাপাশি নতুন ক্রয়াদেশ পাওয়াও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে মুজেরী বলেন, জোরপূর্বক শ্রম রোধে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ও কমপ্লায়েন্স বজায় না রাখতে পারলে ভবিষ্যতে কারখানায় বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে। অর্ডার পুনর্বিন্যাস হয়ে ক্রেতা কমে যেতে পারে। এতে রপ্তানিমুখী শিল্পে ধস নামবে। 

অর্থনীতির এই বিশ্লেষক বলেন, বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থায় মার্কিন ব্র্যান্ডগুলো নতুন করে হিসাব-নিকাশ করায় সতর্ক অবস্থানে থাকতে হবে স্থানীয় শিল্পমালিকদের।

বিবিএসের তথ্যানুসারে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি ছিল ৬ দশমিক ৮২ শতাংশ। দ্বিতীয় প্রান্তিকে তা কমে ১ দশমিক ২৭ শতাংশে নামে। তৃতীয় প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধি নেমে যায় ঋণাত্মক শূন্য দশমিক ২৮ শতাংশে। এক বছর আগে একই সময়ে শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি ছিল ৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ। 

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বিবিএসের সর্বশেষ ত্রৈমাসিক হিসাব স্পষ্ট করে দিয়েছে, অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি টেকসইভাবে বাড়াতে হলে শিল্প খাতে গতি বাড়াতে হবে। সরকারি-বেসরকারি দুই খাতেই বিনিয়োগে গতি আনতে হবে। অভ্যন্তরীণ চাহিদা বাড়ানো সম্ভব হলে শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি বাড়বে। তবে অভ্যন্তরীণ চাহিদার পাশপাশি রপ্তানিও বাড়াতে হবে। বর্তমানে শিল্পের অন্যতম চ্যালেঞ্জ উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়া। উৎপাদন ব্যয় কমাতে হলে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক করতে হবে। সৌজন্যে  খবরের কাগজ