শিরোনাম
Passenger Voice | ১১:০২ এএম, ২০২৬-০৭-২৭
ভুল নকশা ও ভূমি অধিগ্রহণের জটিলতায় চার দফায় মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর-আশুগঞ্জ সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পের। ৯ বছর ধরে ঢিমেতালে চলা ঠিকাদারি কার্যক্রমে ২০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের সড়কের নির্মাণকাজ আদৌ শেষ হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় উঠেছে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরে (সওজ)।
২০১৮ সালে শুরু হওয়া সেই সড়ক প্রকল্পের ভৌত অগ্রগতি ৭৮ শতাংশ; আর্থিক অগ্রগতি ৬৭ দশমিক ৯০ শতাংশ। গত আট বছরে নানা অনিয়মে এই প্রকল্পে ৪৯ কোটি টাকার আর্থিক অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে সওজ ও পরিবহন অডিটের প্রতিবেদনে।
চারবার মেয়াদ বৃদ্ধির নেপথ্যে যেসব কারণ
দুই দফায় সম্ভাব্যতা যাচাই নিরীক্ষা (ফিজিবিলিটি স্টাডি) সম্পন্ন হলেও কাজ শুরুর পর একের পর এক অসংগতি ধরা পড়ে। এমন কাণ্ডে কখনো জমি অধিগ্রহণ, প্রকল্পের নকশা পরিবর্তন, বিভিন্ন প্যাকেজে ঠিকাদারদের বিল দেওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজে জটিলতা দেখা দিয়েছে। ফিজিবিলিটি স্টাডির ভুল প্রতিবেদনের পরে প্রণীত নকশায়ও গলদ দেখা দিচ্ছে প্রতিদিন। এভাবে আট বছর ধরে ধুঁকছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর-আশুগঞ্জ সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পটি।
এ প্রকল্পটির মেয়াদ চারবার বাড়ানো হয়েছে। সর্বশেষ বর্ধিত এই মেয়াদ ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রকল্পের মূল উন্নয়ন প্রস্তাবে ডিপিপিতে এর প্রাক্কলিত ব্যয় ছিল ৪২১ কোটি টাকা, যা সংশোধিত হয়ে ৬০৪ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। প্রকল্পের জন্য নির্ধারিত ৮৬ দশমিক ৩৮২৩ একর ভূমির বিপরীতে এখন পর্যন্ত মাত্র ১৭ দশমিক ৫৯৭ একর (প্রায় ২০ শতাংশ) জমি অধিগ্রহণ করেছে সওজ।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত ৯ বছরে ভূমি অধিগ্রহণসংক্রান্ত জটিলতায় দায়ের হওয়া সাতটি মামলার মধ্যে মাত্র দুটি মামলার নিষ্পত্তি হয়েছে। ভূমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়ায় প্রশাসনিক অনুমোদন, ভূমি অধিদপ্তরে প্রস্তাব পাঠানো, নোটিশ জারি এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণে বারবার কালক্ষেপণ করেছেন প্রকল্পের কর্মকর্তারা। এসব কারণে ভূমি অধিগ্রহণ বাবদ ব্যয় ৬০ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ২৯৬ কোটি টাকায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে।
ত্রুটিপূর্ণ সম্ভাব্যতা যাচাই প্রতিবেদন দেওয়ায় ‘সয়েল অ্যান্ড ফাউন্ডেশন ইঞ্জিনিয়ার্স কনসাল্টিং ফার্ম’ থেকে ক্ষতিপূরণ চেয়ে মামলা করেছে সওজ। তবে এই মামলার অগ্রগতি নেই বলে জানান ভারপ্রাপ্ত প্রকল্প পরিচালক ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা সওজের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম। পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদন যাচাই না করে প্রকল্প প্রণয়নের দায়ে সওজের সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছিল। কিন্তু দায়ীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
আইএমইডির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পরে সওজের কর্মকর্তারা একটি সম্ভাব্যতা যাচাই করলেও সেটি ছিল ত্রুটিপূর্ণ। পরে তৃতীয় আরেকটি পক্ষের মাধ্যমে আইএমইডি সেই নিরীক্ষা করতে বলে। তবে সেই নির্দেশ মানেনি সওজ।
প্রকল্পে ৪৯ কোটি টাকার অনিয়ম
ইউটিলিটি শিফটিংয়ের জন্য প্রদান করা অগ্রিম বিল থেকে ভ্যাট ও আয়কর কর্তন না করায় ৩ কোটি ৭২ লাখ ৩৭ হাজার ৩৫১ টাকা আর্থিক ক্ষতির অভিযোগ উঠেছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরের অডিট প্রতিবেদনে এই অনিয়মটি চিহ্নিত করা হয়েছে। সওজের অভ্যন্তরীণ অডিট প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, নবীনগর-আশুগঞ্জ সড়ক উন্নয়ন (জেড-২০৩১) প্রকল্পের আওতায় বৈদ্যুতিক খুঁটি স্থানান্তর ও অপসারণের জন্য ব্রাহ্মণবাড়িয়া পল্লি বিদ্যুৎ সমিতির চাহিদার বিপরীতে অগ্রিম অর্থ পরিশোধ করা হয়। কিন্তু এ সময় প্রযোজ্য ভ্যাট ও আয়কর কর্তন করা হয়নি।
২০২৩-২৪ অর্থবছরের পরিবহন অডিট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একটি প্রকল্পে উপযুক্ত মাটিকে অনুপযুক্ত হিসেবে দেখিয়ে প্রাক্কলনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এই ভুল তথ্যের ওপর ভিত্তি করে চুক্তি সম্পাদন করায় সরকারের মোট ১২ লাখ ৬১ হাজার ৪০৪ টাকা আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।
আরেকটি গুরুতর অনিয়ম পাওয়া গেছে ৪৯ কোটি ৯ লাখ ৮১ হাজার ৪২৭ দশমিক ৪২৭ টাকা মূল্যের একটি কার্যাদেশ সম্পাদনের ক্ষেত্রে। অডিট অনুযায়ী, যথাযথ ফিজিবিলিটি স্টাডি (সম্ভাব্যতা যাচাই) ও ভূমি অধিগ্রহণ সম্পন্ন না করেই এই কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছিল।
একটি দরপত্রের আওতায় ৫৪০ দিন সময় দিয়ে চুক্তিটি সম্পাদন করা হলেও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অত্যন্ত ধীরগতিতে কাজটি চালিয়েছে। প্রকল্পের বিশাল বাজেটের বিপরীতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি মাত্র ১ কোটি ৫ লাখ ৩৬ দশমিক ৪৬ টাকার কাজ সম্পন্ন করেই বাকি কাজ বন্ধ করে দেয়। মাঠপর্যায়ে কাজ করার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও ঠিকাদার কাজটির সিংহভাগ ফেলে রেখেছেন এবং কাজ সম্পাদনের জন্য অতিরিক্ত সময়ের কোনো আবেদনও করেননি।
ঠিকাদারকে তার সম্পাদিত কাজের বিপরীতে ১ কোটি টাকা প্রদান করা হয়। ঠিকাদার যথাসময়ে কাজ সম্পাদন না করা এবং পুনরায় সময় বাড়ানোর আবেদন না করায় বিধি মোতাবেক তার চুক্তি বাতিল করা হয়।
প্রকল্পে ব্রিজ-কালভার্ট নির্মাণে গুরুতর আর্থিক অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে। হিসাব করার সময় রডের আয়তনটুকু কনক্রিট থেকে বাদ দেওয়া হয়নি। এতে কনক্রিটের পরিমাণ বেশি দেখানো হয়েছে এবং ঠিকাদারকে বাড়তি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। এতে সরকারি কোষাগার থেকে ৫৪ লাখ ১ হাজার ৬৪৮ টাকা বেশি খরচ হয়েছে।
ভারপ্রাপ্ত প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম বলেন, ‘আগামী বছরের জুন পর্যন্ত প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। তবে কিছু জমি অধিগ্রহণ করতে হবে। সেখানে একটু জটিলতা আছে। আমরা চেষ্টা করছি, সব কাজ দ্রুত শেষ করতে।’ সূত্র খবরের কাগজ
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত 2019 - 2026 PassengerVoice | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Developed By Muktodhara Technology Limited.
পাবলিক মতামত