শিরোনাম
Passenger Voice | ০৪:২৭ পিএম, ২০২৬-০৭-২৬
সাইরেন বাজছে। জীবন বাঁচানোর তাগিদে ছুটতে চাওয়া অ্যাম্বুলেন্সটি দাঁড়িয়ে আছে স্থির হয়ে। ভেতরে একজন রোগী, বাইরে উদ্বিগ্ন স্বজন। সামনে শত শত যানবাহনের দীর্ঘ সারি। রেলগেট বন্ধ। রাস্তার এক পাশে সারি সারি সিএনজিচালিত অটোরিকশা, অন্য পাশে ফুটপাত দখল করে দোকান। মাঝখানে আটকে আছে পুরো শহর। এটি কোনো নাটকের দৃশ্য নয়, ময়মনসিংহ নগরীর প্রতিদিনের সকালের চিত্র।
একসময়ে শান্ত, স্বস্তির শহর হিসেবে পরিচিত ময়মনসিংহ আজ পরিচিত অন্য এক নামে–যানজটের শহর। ২০১৫ সালে বিভাগীয় শহরের মর্যাদা পাওয়ার পর প্রশাসনিক, শিক্ষাব্যবস্থা, স্বাস্থ্যসেবা ও বাণিজ্যের কেন্দ্র হিসেবে শহরটির গুরুত্ব যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে মানুষের চাপ। কিন্তু নগর পরিকল্পনা যেন সেই গতির সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনি। ফলে প্রতিদিন হাজারও মানুষ আটকে যাচ্ছেন একই যন্ত্রণার চক্রে।
যানবাহনের স্রোত, কিন্তু রাস্তা সেই পুরোনো
ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশন হওয়ার পর নগরীর আয়তন বেড়েছে, জনসংখ্যা বেড়েছে, নতুন নতুন আবাসিক এলাকা গড়ে উঠেছে। কিন্তু শহরের অধিকাংশ সড়ক আজও বহু বছর আগের মতোই সরু। সিটি করপোরেশনের তথ্য বলছে, নগরীতে নিবন্ধিত ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা প্রায় ছয় হাজার। রয়েছে সাড়ে পাঁচ হাজারের বেশি মিশুক এবং প্রায় ৫ হাজার ৪০০ চিকন চাকার ব্যাটারিচালিত রিকশা। নিয়ম অনুযায়ী প্রতিদিন অর্ধেক অটোরিকশা চলার কথা থাকলেও বাস্তবে প্রায় সবই রাস্তায় নামে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অসংখ্য অনুমোদনহীন যানবাহন।
ফলে যে সড়ক কয়েক হাজার যানবাহনের জন্য তৈরি হয়েছিল, সেখানে এখন চলাচল করছে কয়েক গুণ বেশি যান। ২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ব্যুরো অব ইকোনমিক রিসার্চের এক গবেষণায় বিশ্বের সবচেয়ে ধীরগতির শহরগুলোর মধ্যে ঢাকার পর নবম স্থানে উঠে আসে ময়মনসিংহ। এই অবস্থান শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়, এটি নগরবাসীর প্রতিদিনের বাস্তব জীবনের প্রতিচ্ছবি।
১০টি রেলক্রসিং, দিনে ৪৮ বার থেমে যায় শহর
ময়মনসিংহের যানজটের সবচেয়ে বড় কারণগুলোর একটি শহরের ভেতরের রেলক্রসিং। সকাল ৭টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত ২৪টি ট্রেন চলাচল করে। প্রতিটি ট্রেন পার হওয়ার সময় রেলগেট বন্ধ হয়। অর্থাৎ দিনে প্রায় ৪৮ বার থেমে যায় সড়ক যোগাযোগ। মাত্র কয়েক মিনিটের জন্য গেট বন্ধ থাকলেও সেই প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে কয়েক কিলোমিটার পর্যন্ত। ট্রেন চলে যাওয়ার পরও অনেক সময় লেগে যায় যান চলাচল স্বাভাবিক হতে।
পাটগুদাম মোড়: যেখানে এসে থেমে যায় গতি
পাটগুদাম ব্রিজ মোড় যেন ময়মনসিংহের যানজটের প্রতীক। উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলার যানবাহন এই পথ ব্যবহার করে। একই জায়গায় রয়েছে আন্তজেলা বাস টার্মিনাল, সিএনজি স্ট্যান্ড এবং স্থানীয় যানবাহনের চাপ। সড়কের বড় একটি অংশ দখল করে দাঁড়িয়ে থাকে অটোরিকশা। ফলে সামান্য চাপেই পুরো এলাকা অচল হয়ে পড়ে।
ফুটপাত আছে, পথচারীর জায়গা নেই
নগরীর অধিকাংশ ফুটপাত এখন আর পথচারীদের নয়। কোথাও দোকান, কোথাও হকার, কোথাও মোটরসাইকেলের পার্কিং। বাধ্য হয়ে মানুষ নেমে আসছেন মূল সড়কে। এতে যানবাহনের গতি আরও কমে যাচ্ছে, বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও।
প্রতিদিনের দুর্ভোগের মানচিত্র
স্টেশন রোড, গাঙ্গিনার পাড়, সি কে ঘোষ রোড, চরপাড়া, পাটগুদাম ব্রিজ, নতুন বাজার, জিলা স্কুল মোড়, সানকিপাড়া ও কেওয়াটখালী বাইপাস–এসব এলাকায় দিনের অধিকাংশ সময়ই যানজট স্থায়ী চিত্র। অফিস শুরু ও ছুটির সময়, স্কুল-কলেজ খোলা ও বন্ধের সময় কিংবা ট্রেন চলাচলের সময় পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেয়।
যানজট শুধু ভোগান্তি নয়, অর্থনীতিরও ক্ষতি
শহরের বাসিন্দারা জানান, যানজট এখন শুধু সময় নষ্ট করছে না। প্রতিদিন অপচয় হচ্ছে কর্মঘণ্টা, জ্বালানি ও অর্থ। শিক্ষার্থীরা সময়মতো ক্লাসে পৌঁছাতে পারছে না, রোগীরা সময়মতো হাসপাতালে পৌঁছাতে পারছেন না, ব্যবসায়ীদের বাড়ছে পরিবহন ব্যয়। নগরীর ভাটিকাশর এলাকার বাসিন্দা আনোয়ার হোসেন বলেন, জনপ্রতিনিধি বদলেছে, প্রশাসনের নেতৃত্ব বদলেছে, নানা পরিকল্পনার ঘোষণাও এসেছে; কিন্তু আজও যানজটের সমাধান হয়নি। চরপাড়া এলাকার বাসিন্দা মনিরুল ইসলাম বলেন, যানজট এখন কেবল মানুষের সময় নষ্ট করছে না; এটি অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে, স্বাস্থ্যসেবা ব্যাহত করছে, শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি বাড়াচ্ছে এবং নগরবাসীর জীবনকে প্রতিদিন আরও দুর্বিষহ করে তুলছে।
স্থানীয় সংগঠন নাগরিক সমাজের সদস্যসচিব সামসুদ্দোহা মাসুম বলেন, প্রতিদিন মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকে থাকে। এতে সময়, জ্বালানি ও অর্থের অপচয় হচ্ছে। প্রশাসনের সব দপ্তরের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।
ময়মনসিংহ ট্রাফিক পুলিশের পরিদর্শক (প্রশাসন) আবু নাসের মোহাম্মদ জহির বলেন, গত চার দশকে শহরের একটি সড়কও প্রশস্ত হয়নি। অথচ যানবাহনের সংখ্যা কয়েক গুণ বেড়েছে। রাস্তা সম্প্রসারণ, অবৈধ যান নিয়ন্ত্রণ, ফুটপাত দখলমুক্ত করা এবং রেলক্রসিং স্থানান্তর ছাড়া স্থায়ী সমাধান মিলবে না।
সিটি করপোরেশনের বক্তব্য
ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সুমনা আল মজীদ বলেন, পুরোনো শহরের সড়ক সম্প্রসারণের সুযোগ সীমিত। তবে যান চলাচলে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে এবং ফুটপাত দখলমুক্ত রাখতে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।
এদিকে সড়ক ও জনপথ বিভাগও আশা করছে, নির্মাণাধীন কেওয়াটখালী আর্চ স্টিল সেতু চালু হলে পাটগুদাম ব্রিজের ওপর চাপ কমবে এবং নগরীর যান চলাচলে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।
সড়ক ও জনপথ বিভাগ ময়মনসিংহের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শরীফুল আলম জানান, ৩ হাজার ২৬৩ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন কেওয়াটখালী আর্চ স্টিল সেতুর কাজ শেষ হলে পাটগুদাম ব্রিজের ওপর চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে। এতে নগরীর অন্যতম প্রধান যানজটের কেন্দ্র পাটগুদাম মোড় অনেকটাই স্বাভাবিক হবে।
যানজট সমস্যাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছেন উল্লেখ করে ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসক মো. সাইফুর রহমান বলেন, যানজট এক দিনে সমাধানযোগ্য নয়। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার সমন্বয়ে কাজ করা হবে।
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত 2019 - 2026 PassengerVoice | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Developed By Muktodhara Technology Limited.
পাবলিক মতামত