শিরোনাম
Passenger Voice | ১০:৪৮ এএম, ২০২৬-০৭-২৪
দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের সংকট মূলত বড় ঋণগ্রহীতাদের ঘিরে কেন্দ্রীভূত। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ৫০ কোটি টাকার বেশি অঙ্কের ঋণের ৪২ দশমিক ৫ শতাংশই এখন খেলাপি। বিপরীতে ১ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণের ক্ষেত্রে খেলাপির হার তুলনায় বেশ কম—১৫ শতাংশ।
অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, বড় ঋণের ক্ষেত্রে খেলাপির এই প্রবণতা শুধু ব্যবসায়ীদের ব্যর্থতা নয়; এটি দীর্ঘদিনের দুর্বল ঋণ ব্যবস্থাপনা, রাজনৈতিক প্রভাব, জবাবদিহির অভাব এবং ব্যাংকিং খাতের সুশাসন সংকটের ফল।
ব্যাংক খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তারা তুলনামূলকভাবে বেশি সুদে ঋণ নিলেও তা পরিশোধে বেশি সচেষ্ট থাকেন। ব্যবসা টিকিয়ে রাখার স্বার্থেই ঋণ পরিশোধকে গুরুত্ব দেন তাঁরা। অন্যদিকে বড় ঋণের ক্ষেত্রে সুদহার কম হলেও অনেক গ্রাহক ঋণ পরিশোধে গড়িমসি করেন। অনেক ক্ষেত্রেই তাঁরা পুনঃ তফসিল, ছাড় বা বিশেষ সুবিধা পান।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে মুজেরী বলেন, বড় ঋণের প্রতি ব্যাংকগুলোর আগ্রহের অন্যতম কারণ হলো এর ব্যবস্থাপনা ব্যয় কম। অনেক ছোট গ্রাহকের পরিবর্তে একজন বড় গ্রাহককে বড় অঙ্কের ঋণ দেওয়া ব্যাংকের জন্য তুলনামূলক সহজ ও সাশ্রয়ী। তবে বড় ঋণগ্রহীতাদের মধ্যে খেলাপির প্রবণতা বাড়ছে, যা একটি ক্ষতিকর ঋণ সংস্কৃতি তৈরি করছে।
মুস্তফা মুজেরী বলেন, প্রভাবশালী ঋণগ্রহীতারা অনেক সময় নানা উপায়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার সুযোগ নেন। ফলে ব্যাংকগুলোকে আরও পেশাদার হতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকিও আরও কঠোর করতে হবে। তাঁর মতে, খেলাপি ঋণ আদায়ের পরিবর্তে রাইট অফ ও পুনঃ তফসিলের ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, যা সমস্যার স্থায়ী সমাধান নয়। প্রকৃত খেলাপিদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।
এক বছরেই যে বৃদ্ধি
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মার্চে ৫০ কোটি টাকার বেশি ঋণের মধ্যে খেলাপির হার ছিল ৩৫ দশমিক ২ শতাংশ। এক বছরের ব্যবধানে তা বেড়ে ২০২৬ সালের মার্চে দাঁড়িয়েছে ৪২ দশমিক ৫ শতাংশে। এই সময়ে বড় ঋণের পরিমাণও বেড়েছে। ২০২৫ সালের মার্চে ৫০ কোটি টাকার বেশি ঋণের স্থিতি ছিল ৫ লাখ ২০ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। ২০২৬ সালের মার্চে তা বেড়ে হয়েছে ৫ লাখ ৭৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। অর্থাৎ ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধির পাশাপাশি এর মানেরও দ্রুত অবনতি হয়েছে। অন্যদিকে ১ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণের পরিমাণ ৪ লাখ ৯ হাজার ৯০০ কোটি টাকা হলেও খেলাপির হার মাত্র ১৫ শতাংশ।
ঋণের অঙ্ক বাড়লে বাড়ে ঝুঁকি
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ঋণের পরিমাণ যত বাড়ছে, খেলাপির হারও তত বাড়ছে। ১০ থেকে ২০ কোটি টাকার ঋণে এর হার সর্বোচ্চ ৪৫ দশমিক ১ শতাংশ। এ ছাড়া ১ থেকে ১০ কোটি টাকা ঋণে খেলাপির হার ২৬ দশমিক ৬ শতাংশ; ২০ থেকে ৩০ কোটি টাকায় ৩৫ দশমিক ৭ শতাংশ; ৩০ থেকে ৪০ কোটি টাকায় ৩৮ দশমিক ৯ শতাংশ এবং ৪০ থেকে ৫০ কোটি টাকায় ৪৪ দশমিক ৭ শতাংশ।
সংশ্লিষ্টদের মতে, বড় ঋণ অনুমোদনের ক্ষেত্রে অনেক সময় যথাযথ যাচাই-বাছাই হয়নি। রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্বল ঝুঁকি বিশ্লেষণ এবং অপর্যাপ্ত তদারকির কারণে বড় অঙ্কের অনেক ঋণ বিতরণ করা হলেও পরে তা আদায় করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মাসরুর রিয়াজ বলেন, অনেক ব্যাংকের বর্তমান আর্থিক পরিস্থিতি থেকেই বোঝা যায়, বড় ঋণ দেওয়ার আগে গ্রাহকের প্রকৃত পরিশোধ সক্ষমতা যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হয়নি। ভবিষ্যতে বড় ঋণ অনুমোদনের ক্ষেত্রে ব্যবসার নগদ প্রবাহ, প্রকল্পের সম্ভাবনা ও ঝুঁকি মূল্যায়নকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।
ছোট ঋণে কঠোর হলেও বড় ঋণে শিথিল
মুস্তফা কে মুজেরীর মতে, ছোট ঋণগ্রহীতাদের ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলো কঠোর হলেও বড় ঋণগ্রহীতাদের ক্ষেত্রে অনেক সময়ই শৈথিল্য দেখানো হয়। ছোট উদ্যোক্তাদের সামান্য কিস্তি বকেয়া থাকলেও দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হয়, কিন্তু বড় গ্রাহকদের ক্ষেত্রে সাধারণত প্রভাব ও যোগাযোগের কারণে আদায় প্রক্রিয়া দীর্ঘ হয়। এর প্রভাব পুরো ব্যাংকিং খাতেই পড়ে। ২০২৫ সালের মার্চে মোট খেলাপি ঋণের হার ছিল ২৪ দশমিক ৬ শতাংশ, যা একই বছরের ডিসেম্বরে বেড়ে ৩১ দশমিক ২ শতাংশ এবং ২০২৬ সালের মার্চে ৩২ দশমিক ৭ শতাংশে পৌঁছেছে।
অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক চেয়ারম্যান ও মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তারা ব্যবসার ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় ঋণ পরিশোধে বেশি আগ্রহী। তাঁরাই অর্থনীতি সচল রাখছেন ও কর্মসংস্থান তৈরি করছেন। অন্যদিকে বড় গ্রাহকদের অনেকের মধ্যে ঋণ ফেরত না দেওয়ার মানসিকতা তৈরি হয়েছে, যা এখন দেশের আর্থিক খাতের বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে অধিকাংশ ব্যাংকই বড় ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে আরও কঠোর হয়েছে। এর পরিবর্তে তারা ছোট ছোট ঋণ বিতরণে বেশি আগ্রহী হচ্ছে।
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত 2019 - 2026 PassengerVoice | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Developed By Muktodhara Technology Limited.
পাবলিক মতামত