শিরোনাম
Passenger Voice | ০২:৫৬ পিএম, ২০২৬-০৭-২২
চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলায় প্রায় দুই সপ্তাহ পর বন্যা পরিস্থিতি উন্নতি হচ্ছে। তবে পানি নেমে গেলে ভেসে উঠছে ক্ষতচিহ্ন। দেখলে মনে হবে যেন যুদ্ধবিদ্ধস্ত জনপদ। টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে শঙ্খ নদের পানির উচ্চতা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাওয়ায় এখানকার ১১টি ইউনিয়নের প্রায় লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি ছিল। অনেক এলাকায় ভেঙে গেছে সড়ক। কোথাও পচে গন্ধ ছড়াচ্ছে স্বপ্নের ফসল ও ঘরের মূল্যবান জিনিসপত্র। ভেসে গেছে অসংখ্য পুকুর ও মৎস্য ঘের। এখন টিকে থাকার লড়াইয়ে নেমেছে মানুষ।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে এ উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হয়। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, উপজেলার পরৈকোড়া,হাইলধর, চাতরী, রায়পুর, জুঁইদন্ডী, বারখাইন, বটতলী ও বরুমচড়ায় বেশি জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। বন্যার পানিতে ডুবে বরুমচড়া ও চাতরী ইউনিয়নে দুই শিশুর মৃত্যুও হয়েছে। বন্যাকবলিত এসব এলাকা থেকে পানি নামার সঙ্গে সঙ্গে বেরিয়ে আসছে ব্যাপক ক্ষতির চিত্র। অনেক এলাকায় পানি পুরোপুরি নামেনি।
মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে গত ৫ জুলাই শুরু হওয়া টানা ভারী বর্ষণে এ উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় বন্যাকবলিত হয়ে পড়ে। এরই মধ্যে আবারও তৈরি হয়েছে একটি লঘুচাপ। আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী,এটি আরও ঘনীভূত হতে পারে। এর প্রভাবে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকবে এবং উপকূলীয় এলাকায় কিছুটা বাড়তে পারে বৃষ্টির পরিমাণ।
চট্টগ্রাম দক্ষিণ সড়ক বিভাগ সূত্র জানায়, এ উপজেলায় সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের ৬৮ কিলোমিটার সড়ক রয়েছে। তারমধ্যে ১৪ কিলোমিটার সড়ক বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে উপজেলার ছত্তারহাট-মালঘর সড়ক ও শাহ মোহছেন আউলিয়া সড়ক। এসব সড়ক জরুরি ভিত্তিতে মেরামতে আড়াই কোটি টাকা প্রয়োজন। আর দীর্ঘমেয়াদী ও টেকসই পুনর্নির্মাণে ৮ কোটি ৩০ লাখ টাকা লাগতে পারে বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রাম দক্ষিণ সড়ক বিভাগের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী আবদুল্লাহ আল নোমান পারভেজ। সম্প্রতি জরুরি ভিত্তিতে কিছু কাজ শুরু হয়েছে বলেও যোগ করেন তিনি।
গ্রামীণ সড়কের দেখভাল করে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। আনোয়ারায় বন্যার পানি নামার পর থেকে তারা বিভিন্ন এলাকা ঘুরে ক্ষয়ক্ষতির হিসাব নিচ্ছেন। এ পর্যন্ত ৫৩টি সড়ক ভেঙে যাওয়ার তথ্য তাদের কাছে এসেছে। এসব সড়কের মোট ২৮ কিলোমিটার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কোনোটির কার্পেটিং উঠে গেছে,কোনোটি মাঝখানে ভেঙে গেছে। আবার কোনোটির পিচঢালাই তলিয়ে গেছে। এ ছাড়া কোনো কোনো কাঁচা সড়ক একেবারে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। মাঝে মাঝে ভেঙেছে বেশিরভাগ সড়ক।
আনোয়ারার উপজেলা প্রকৌশলী জাহেদুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, গত কয়েকদিনের টানা বৃষ্টিতে সৃষ্ট জলাবদ্ধতা ও বন্যায় উপজেলার বিভিন্ন গ্রামীণ ও প্রধান সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক স্থানে সড়ক ভেঙে দুই ভাগ হয়ে গেছে। আবার কোথাও কোথাও অতিবৃষ্টির কারণে সড়কের মাঝখানে ছোটবড় খানাখন্দ সৃষ্টি হয়েছে। এসব সড়ক সংস্কার করতে প্রায় ২৫ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রয়োজন হবে। আপাতত জরুরি ভিত্তিতে কিছু কাজ করার প্রক্রিয়া চলছে। অর্থাৎ, সওজ ও এলজিইডি উভয় বিভাগে মিলে প্রায় ৩৬ কোটি টাকা লাগতে পারে।
এদিকে উপজেলা কৃষি কার্যালয়ের প্রাথমিক তথ্য মতে, উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে গত কয়েকদিনের প্রবল বৃষ্টিতে কৃষি খাতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। প্রায় ৪৭ লাখ টাকা মূল্যের ২ হাজার ১৯২ হেক্টর জমির আউশ ধান, প্রায় ২১ লাখ টাকা মূল্যের ৮০ হেক্টর জমির আমন বীজতলা, প্রায় ৩ কোটি টাকা মূল্যের ৩৫৯ হেক্টর জমির সবজি ও ৮ লাখ টাকা মূল্যের ১৩ হেক্টর জমির ফল বাগান নষ্ট হয়ে গেছে। সবচেয়ে বেশি সবজি খেতের ক্ষতি হয়েছে জানিয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শামীম আহম্মদ সরকার বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সার, বীজ প্রণোদনা দিয়ে সহায়তা করা হবে।
উপজেলা মৎস্য দপ্তরের প্রাথমিক তথ্যে জানা যায়, বন্যায় উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে বিশেষ করে নিচু এলাকায় ১ হাজার ১০০ পুকুর ও ১৫টি মৎস্য ঘের পানিতে তলিয়ে যায়। এতে মৎস্য খামারি ও সাধারণ মানুষের প্রায় সাড়ে ৭ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। চূড়ান্ত তথ্য সংগ্রহে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরো বাড়তে পারে বলে জানিয়েছেন জ্যেষ্ঠ উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো.রাশিদুল হক।
আইনজীবী ও সমাজকর্মী নুরুল কবির রানা বলেছেন, তাৎক্ষণিক ত্রাণ কার্যক্রম জরুরি হলেও দীর্ঘমেয়াদী সমাধান ছাড়া কাটবে না এ সংকট। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসন, কৃষকদের সার ও বীজ, মাছচাষীদের পোনা ও খাদ্য, স্বল্প সুদে ঋণ, ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক সংস্কার, নদী-খাল পুনঃখনন এবং পাহাড় সংরক্ষণে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো.মহিন উদ্দিন বলেন, টানা বৃষ্টির কারণে আনোয়ারা উপজেলায় সড়ক যোগাযোগ,মৎস্য ও কৃষি খাতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। অনেক বাড়িঘর বিধ্বস্ত হয়েছে। পানি নেমে যাওয়ার পর ক্ষতচিহ্ন ভেসে উঠছে। আমরা ক্ষয়ক্ষতির সবকিছু তালিকা করে প্রতিবেদন পাঠাচ্ছি। সরকার বরাদ্দ দিলে ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত 2019 - 2026 PassengerVoice | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Developed By Muktodhara Technology Limited.
পাবলিক মতামত