আমানত ফেরতে রোডম্যাপের দাবিতে বিক্ষোভ ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ গ্রাহকদের

Passenger Voice    |    ১০:৫৭ এএম, ২০২৬-০৭-২২


আমানত ফেরতে রোডম্যাপের দাবিতে বিক্ষোভ ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ গ্রাহকদের

ইসলামি ধারার পাঁচ ব্যাংককে একীভূত করে গঠিত রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ এখন গভীর অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে। একদিকে ব্যাংকটির কার্যক্রম কার্যত স্থবির হয়ে আছে, অন্যদিকে আমানত ফেরত না পেয়ে ভুক্তভোগী গ্রাহকরা চরম দুর্ভোগে দিন কাটাচ্ছেন। নিজেদের জমা টাকা ফেরতের দাবিতে তারা এখনো আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন।
 
এরই ধারাবাহিকতায় আমানতের ওপর ঘোষিত ‘হেয়ারকাট’ব্যবস্থা দ্রুত প্রজ্ঞাপন জারি করে বাতিল এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে তা কার্যকর করার দাবি জানিয়েছেন সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের অধীন একীভূত পাঁচটি ব্যাংকের ভুক্তভোগী আমানতকারীরা। একই সঙ্গে মেয়াদোত্তীর্ণ এফডিআর, ডিপিএস, এমটিডিআরসহ সব ধরনের আমানত মুনাফাসহ ফেরতের জন্য একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ ঘোষণারও আহ্বান জানিয়েছেন তারা।

পূর্বঘোষিত লংমার্চ কর্মসূচির অংশ হিসেবে মঙ্গলবার (২১ জুলাই) সচিবালয়মুখী লংমার্চ ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে মানববন্ধন করেছে বাংলাদেশ ভুক্তভোগী ব্যাংক আমানতকারী অ্যাসোসিয়েশন। বিক্ষোভ শেষে আমানতকারীরা মিছিল নিয়ে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে অবস্থান নেন। পরে পাঁচ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল সচিবালয়ে গিয়ে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপি জমা দেয়।

সঞ্চয়কারীরা অভিযোগ করেন, বহু বছরের কষ্টার্জিত সঞ্চয় ব্যাংকে জমা রেখেও আজ চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে তাদের। আমানতের অর্থ ফেরত না পাওয়ায় চিকিৎসা, সন্তানের পড়াশোনা, ব্যবসা ও দৈনন্দিন জীবনের ব্যয় নির্বাহ কঠিন হয়ে পড়েছে বলেও অভিযোগ সঞ্চয়কারীদের। এ অবস্থায় আমানতকারী অ্যাসোসিয়েশন সরকারের ঘোষিত আমানত ‘হেয়ারকাট’ নীতির তীব্র বিরোধিতা করে তা সম্পূর্ণ বাতিলের দাবি জানিয়েছে।

সংগঠনটির বক্তব্য, আমানতকারীদের কষ্টার্জিত সঞ্চয় থেকে কোনো ধরনের কর্তন কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। একই সঙ্গে শতভাগ আমানত দ্রুত ফেরত, দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা এবং আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।

এর আগে গত সোমবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের সঙ্গে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে পাঁচ ব্যাংক একীভূত করে গঠিত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের প্রশাসকদের একে একে তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। একই সঙ্গে জুলাইয়ের শেষ দিকে প্রশাসকদের কাছ থেকে ব্যাংকগুলোর দায়িত্ব হস্তান্তর প্রক্রিয়া শুরুর পরিকল্পনাও চূড়ান্ত করা হয়। ব্যাংকের চেয়ারম্যান কাজী শায়রুল হাসান, নতুন ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. আবেদুর রহমান সিকদার এ সময় উপস্থিত ছিলেন। 

বাংলাদেশ ব্যাংকের এক সূত্র জানায়, পুনর্গঠন কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি পর্যায়ক্রমে ব্যাংকগুলোর স্বাভাবিক কার্যক্রম জোরদার করা হবে। পরিস্থিতির উন্নতি হলে আমানতকারীদের জমা অর্থ প্রতিশ্রুত মুনাফাসহ ফেরত দেওয়া হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, পুনর্গঠন কার্যক্রমের অগ্রগতির ভিত্তিতে প্রশাসকদের কাছ থেকে ধাপে ধাপে ব্যাংকগুলোর দায়িত্ব হস্তান্তর করা হবে। একই সঙ্গে পরিচালনা পর্ষদে আরও অভিজ্ঞ সদস্যদের অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনাও রয়েছে। 

ইতোমধ্যে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকে ১০ হাজার কোটি টাকার সুকুক বন্ডের মাধ্যমে বিনিয়োগ করেছে সরকার। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আশা, পুনর্গঠন কার্যক্রম সফলভাবে শেষ হলে ব্যাংকের আর্থিক অবস্থার উন্নতি হবে এবং আমানতকারীরা তাদের অর্থ মুনাফাসহ ফেরত পাবেন। বর্তমানে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের অনুমোদিত মূলধন ৪০ হাজার কোটি টাকা এবং পরিশোধিত মূলধন ৩৫ হাজার কোটি টাকা।

এদিকে গতকাল আমানতকারীরা স্মারকলিপিতে উল্লেখ করেন, গত ৮ জুলাই জাতীয় সংসদে বাজেট আলোচনায় হেয়ারকাট বাতিলের ঘোষণা দেওয়া হলেও এখনো তা আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হয়নি। তাই দ্রুত প্রজ্ঞাপন জারি করে এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে হবে। পাশাপাশি আমানতের মুনাফা পুনর্নির্ধারণসংক্রান্ত প্রস্তাবও বাতিল করে অন্য তফসিলি ব্যাংকের মতো স্বাভাবিক ব্যাংকিং কার্যক্রম চালুর আহ্বান জানানো হয়েছে।

আমানতকারীরা দাবি করেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও নবনিযুক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালককে দ্রুত আমানত ফেরতের বিষয়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিতে হবে। একই সঙ্গে ‘হেয়ারকাট’ হিসেবে প্রভিশন করা অর্থ সম্পূর্ণভাবে আমানতকারীদের ফেরত দেওয়ারও দাবি জানান তারা।

স্মারকলিপিতে বলা হয়, তাদের দাবি বাস্তবায়ন হলে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের প্রতি গ্রাহকদের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে এবং তারা আবারও স্বাভাবিকভাবে ব্যাংকটির সঙ্গে লেনদেন করবেন।

আন্দোলনকারীদের ভাষ্য, সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের আওতাধীন প্রায় ৭৬ লাখ গ্রাহক ও তাদের প্রায় তিন কোটি পরিবারের স্বার্থসংশ্লিষ্ট এ বিষয়ে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ প্রত্যাশা করছেন তারা। অন্যথায় দাবি আদায়ে আরও কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে বলে সতর্ক করেছেন ভুক্তভোগী আমানতকারীরা।

তারা বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান এবং নবনিযুক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালকের প্রতি দ্রুত আমানত ফেরতের বিষয়ে কার্যকর নির্দেশনা দেওয়ার আহ্বান জানান। পাশাপাশি হেয়ারকাট হিসেবে সংরক্ষিত অর্থ সম্পূর্ণভাবে আমানতকারীদের ফেরত দেওয়ার দাবিও উত্থাপন করেন।