শিরোনাম
Passenger Voice | ১১:০৫ এএম, ২০২৬-০৭-২০
বাংলাদেশ রেলওয়ের ইঞ্জিন সচল রাখার আড়ালে ব্যাপক লুটপাটের অভিযোগ পাওয়া গেছে। ট্র্যাকশন মোটর কেনা ও মেরামতে শতকোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে এবার অনুসন্ধানে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দরপত্রের শর্তে নজিরবিহীন পরিবর্তন এনে নির্দিষ্ট সিন্ডিকেটকে সুবিধা দেওয়া এবং ভ্যারিয়েশনের নামে অর্থ লোপাটের ঘটনায় এখন তোলপাড় চলছে রেল ভবনের করিডরে।
রেলের লোকোমোটিভের শক্তির মূল উৎস ট্র্যাকশন মোটর। এটি বৈদ্যুতিক শক্তিকে যান্ত্রিক শক্তিতে রূপান্তরিত করে ট্রেনের চাকা ঘোরায় এবং ট্রেনকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যায়।
রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের (সিআরবি) চিফ কন্ট্রোলার অব স্টোরস অফিসের অধীনে ২ হাজার ৩০০, ২ হাজার ৪০০, ৬ হাজার এবং ৬ হাজার ১০০ সিরিজের লোকোমোটিভের ৩৪টি ট্র্যাকশন মোটর মেরামতের জন্য ৫ কোটি ৯৫ লাখ টাকার একটি দরপত্র আহ্বান করা হয়েছিল চলতি বছরের ১ ফেব্রুয়ারি। দরপত্রের প্রাথমিক শর্ত ছিল, দরদাতাকে রেলওয়ের কোনো কার্যক্রমে ৩০ লাখ টাকা সমমূল্যের কোনো ক্রয় বা নির্মাণ-প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকতে হবে। কিন্তু রহস্যজনক কারণে সেই শর্ত রাতারাতি বাড়িয়ে তিন কোটি টাকা করা হয়।
সরকারি ক্রয় পদ্ধতি অনুযায়ী একই ধরনের কাজের পূর্ব-অভিজ্ঞতা আবশ্যক। এবার ট্র্যাকশন মোটর কেনাকাটার আগে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অভিজ্ঞতা বা যোগ্যতার শর্তটি এমনভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে, যাতে কাজের মোট মূল্যের অর্ধেক বা ৫০ শতাংশ পরিমাণের কাজের অভিজ্ঞতার প্রমাণ দেখানোর কথা বলা হয়। পছন্দের কাউকে কাজ পাইয়ে দিতে ইচ্ছাকৃতভাবে এই কঠিন শর্তটি জুড়ে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
রেলওয়ের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, উদ্দেশ্যমূলকভাবে ছোট ও মাঝারি দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রতিযোগিতা থেকে সরিয়ে নির্দিষ্ট একটি প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দেওয়াই ছিল এই কারসাজির মূল লক্ষ্য।
রেলের নথিপত্র বলছে, কারিগরি উপকমিটির মূল্যায়নে ‘শ্রীজা মেটাল ইন্ডাস্ট্রিজ’কে রেলের ট্র্যাকশন মোটর কেনার কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে। দাপ্তরিক প্রাক্কলিত মূল্যের চেয়ে ৮ দশমিক ৪৯ শতাংশ বেশি দরে অর্থাৎ ৬ কোটি ৪৫ লাখ ৫২ হাজার ৬০৪ টাকায় এই কাজ বাগিয়ে নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
‘ভ্যারিয়েশন’ বাণিজ্যের অভিযোগ
শুধু মোটর মেরামত নয়, রেলের ২০০টি মিটারগেজ লোকোমোটিভ এবং ১৫০টি যাত্রীবাহী কোচ সংগ্রহ প্রকল্পের নামেও চলছে ব্যাপক লুটপাট। প্রকল্প পরিচালক ও মহাব্যবস্থাপক (প্রকল্প) ফকির মো. মহিউদ্দিনের বিরুদ্ধে ভ্যারিয়েশনের নামে প্রকল্পের ব্যয় অযৌক্তিকভাবে বাড়িয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া অনুমোদন ছাড়া এয়ার ব্রেক ব্যবহার এবং অবাধে বদলি বাণিজ্যের সুনির্দিষ্ট অভিযোগও দুদকে জমা পড়েছে, যার পরিপ্রেক্ষিতে অনুসন্ধান শুরু হয়েছে। এই প্রকল্পের বিল-ভাউচার থেকে শুরু করে একনেকের অনুমোদন পর্যন্ত সব নথি এখন দুদক নিরীক্ষা করছে।
অনুসন্ধানে উঠে আসছে যেসব তথ্য
রেলওয়ের এই নজিরবিহীন দুর্নীতির নেপথ্যে উঠে আসছে ‘রেল মাফিয়া’ হিসেবে পরিচিত আফসার আলী বিশ্বাস ও আফজাল হোসেনের নাম। দুদকের অনুসন্ধানে জানা গেছে, পাথর সরবরাহ ও মোটর মেরামতের নামে হরিলুটের এই অবৈধ টাকা বিদেশে পাচার করা হচ্ছে। অস্ট্রেলিয়া ও সিঙ্গাপুরের ব্যাংকে তাদের সন্তানদের নামে কোটি কোটি ডলারের সম্পদ জমার তথ্যও পাওয়া গেছে, যার অনুসন্ধানে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) হস্তক্ষেপ চেয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. জাহাঙ্গীর আলমের নেতৃত্বে শুরু হয়েছে এই অনুসন্ধান। ২০১৫ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত সম্পাদিত চুক্তিসহ যাবতীয় নথিপত্র ইতোমধ্যে তলব করেছে কমিশন।
রেলওয়ের মহাপরিচালকের কাছে পাঠানো চিঠিতে দুদক স্পষ্ট করেছে, সরকারি অর্থের অপচয় এবং অসাধু চক্রের যোগসাজশ উন্মোচনে তারা কোনো ছাড় দেবে না। প্রকল্পের প্রতিটি ধাপের নোটশিট এবং দরপত্র মূল্যায়নের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে মাঠপর্যায়ে নিবিড় অনুসন্ধান চালাচ্ছে তদন্তকারী দল।
দুদকের অনুসন্ধানের বিষয়টি ‘জানেন না’ এডিজি
রেলওয়ের ট্র্যাকশন মোটর মেরামতে নানা অনিয়ম অনুসন্ধানে দুদকের নামার বিষয়টি জানেন না রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (এডিজি-রোলিং স্টক) ফকির মো. মহিউদ্দিন। তিনি বলেন, ‘আসলে কোন বিষয়ে, কী কারণে দুদক ইনভেস্টিগেট করছে, তা আমি জানি না। এখানে (রোলিং স্টক বিভাগের দায়িত্বে) আসার পর এ ধরনের কিছু হচ্ছে বলে আমি জানি না।’
বেশ কয়েক বছর আগে পার্বতীপুরের কেন্দ্রীয় লোকোমোটিভ কারখানায় (কেলোকা) যখন ভারী মেরামত শুরু হয়, বিশেষ করে ভারত থেকে আনা লোকোমোটিভের মেরামত হচ্ছিল, তখন শ্রীজা মেটাল ট্র্যাকশন মোটর মেরামতের জন্য কিছু ইক্যুইপমেন্ট (যন্ত্রপাতি) এনেছিল। সেই কাজ এই প্রতিষ্ঠান সফলভাবে সম্পন্ন করার পরে আরও কিছু মেরামতের কাজ তারা করেছে। তখন এলটিএম (সীমিত দরপত্র পদ্ধতি) টেন্ডারে কাজটি পেয়েছিল শ্রীজা। কারণ ওই ধরনের মেরামতের কাজ করার অভিজ্ঞতা অন্য কারও ছিল না।
তাই কাজগুলো সরাসরি শ্রীজা পেয়ে যেত। এখন ট্র্যাকশন মোটর মেরামতের জন্য উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতিতে কেনাকাটা ও মেরামত প্রক্রিয়া শুরু হলেও শ্রীজা মেটাল কেন এককভাবে কাজ পাচ্ছে–তার ব্যাখ্যায় রেলওয়ের এডিজি ফকির মো. মহিউদ্দিন খবরের কাগজকে বলেন, ‘এখন ওপেন টেন্ডার কল করলেও ট্র্যাকশন মোটর মেরামতে স্পেশাল কিছু ফিচার বা টেকনোলজিক্যাল সাপোর্ট লাগে। এটি সব কোম্পানি পারবে না। ওপেন টেন্ডার কল করলেও কিছু অভিজ্ঞতা চাওয়া হয়। ক্ষেত্রবিশেষে মোটর কেনা বা মেরামতের কাজের জন্য নির্ধারিত চাহিদার ৫০ থেকে ৮০ শতাংশ পূরণ করতে পারে এমন প্রতিষ্ঠানকে কাজ দিতে চায় রেলওয়ে। ধরুন, রেলের এক কোটি টাকার কোনো কাজের আগে দেখা হয় এর আগে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানটি রেলওয়ের ৫০ লাখ টাকা সমমূল্যের কোনো কাজ করেছে কি না। রেলের এই শর্ত দেখে অনেক প্রতিষ্ঠান আর আগ্রহ দেখায় না। যারা আসে, তারা রেসপনসিভ হয় না। সেই আলোকে বলা যায়, যে প্রতিষ্ঠানটি আগে মেরামতের কাজ করেছে, যাদের অভিজ্ঞতা আছে, তারাই কাজ পাবে।’
রেলওয়েতে একচ্ছত্র আধিপত্য, কে এই আফসার বিশ্বাস
বাংলাদেশ রেলওয়ের ইতিহাসে নজিরবিহীন এক দুর্নীতির চিত্র উঠে এসেছে। রেল খাতকে নিজের ব্যক্তিগত সম্পদ বানিয়ে নিয়েছেন আফসার আলী বিশ্বাস নামের এক ঠিকাদার। দীর্ঘ ১৭ বছরে চারটি কোম্পানির আড়ালে দুই শতাধিক ‘ফ্রেমওয়ার্ক কন্ট্রাক্ট’ বাগিয়ে নিয়ে হাতিয়ে নিয়েছেন কোটি কোটি টাকা। দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ফ্রেমওয়ার্ক কন্ট্রাক্ট চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এর উদ্দেশ্য হলো বারবার আলাদা করে চুক্তি না করে একটি নির্দিষ্ট কাঠামোর অধীনে পণ্য বা সেবা সরবরাহ করা।
অভিযোগ রয়েছে, ফ্রেমওয়ার্ক কন্ট্রাক্টের সুযোগ নিয়ে রেলের অসাধু কর্মকর্তাদের ‘ম্যানেজ করে’ তিনি রেলওয়েতে এক শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন।
রেলওয়ের ক্রয় নীতিমালা অনুযায়ী, ডিজি ও এডিজির অর্থ অনুমোদনের নির্দিষ্ট সীমা থাকলেও বড় কাজগুলোকে ছোট ছোট চাহিদাপত্রে ভেঙে সেই সীমার ভেতরেই কৌশলে শত শত কোটি টাকার কাজ বাগিয়ে নিচ্ছেন তিনি।
অনিয়মের এখানেই শেষ নয়, আফসার বিশ্বাসের বিরুদ্ধে অভিযোগের পাহাড় জমেছে। রেলের জন্য পাথর সরবরাহের কার্যাদেশ পেয়ে নিম্নমানের ইটের খোয়া সরবরাহ করছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এ ছাড়া রেলের অতি গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ ‘ট্রাকশন মোটর’ ও ‘আর্মেচার’ মেরামতের কাজও তার সিন্ডিকেটের বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পরবর্তী দুই বছরে তিনি ২১টি ট্রাকশন মোটর মেরামতের কাজ পেয়েছেন।
অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠান শ্রীজা মেটালের কর্ণধার আফসার বিশ্বাসের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয় গণমাধ্যম খবরের কাগজের পক্ষ থেকে। তার অফিশিয়াল ফোন ও ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হয়। হোয়াটসঅ্যাপ বার্তায় প্রশ্ন পাঠানো হয় তাকে। কিন্তু তিন দিন পেরিয়ে গেলেও তিনি প্রশ্নের উত্তর দেননি। একপর্যায়ে তিনি এই প্রতিবেদকের ফোন নম্বর ব্লক করে দেন।
পরে রাজধানীর বিজয়নগরে আকরাম টাওয়ারে প্রধান কার্যালয়ে যান এই প্রতিবেদক। সেখানে গিয়েও আফসার বিশ্বাসের দেখা পাওয়া যায়নি। সেখানে কর্তব্যরত একজন কর্মী জানান, আফসার বিশ্বাস কিছুদিন ধরে অফিসের কাজে ব্যস্ত। অফিসে নিয়মিত আসছেন না। তার পরিবর্তে অন্য কারও সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলতে চাইলে অফিসের কর্মকর্তারা বলেন, সেটি সম্ভব নয়।
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত 2019 - 2026 PassengerVoice | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Developed By Muktodhara Technology Limited.
পাবলিক মতামত