রসিকে ঝুঁকিপূর্ণ সেতু-কালভার্ট:১০ বছর ধরে নড়বড়ে অবস্থা, ঢালাই খসে বের হয়ে আছে রড

Passenger Voice    |    ০১:১৬ পিএম, ২০২৬-০৭-১২


রসিকে ঝুঁকিপূর্ণ সেতু-কালভার্ট:১০ বছর ধরে নড়বড়ে অবস্থা, ঢালাই খসে বের হয়ে আছে রড

‘আমাদের কথা কেউ শোনে না। এলাকার মানুষ বহুবার সিটি করপোরেশনে গিয়ে লিখিত আবেদন দিয়েছে। সবাই শুধু আশ্বাস দেয় কিন্তু কাজ আর হয় না। ১০ বছর ধরে ব্রিজের অবস্থা খারাপ। দিন যত যাচ্ছে ততই ঝুঁকি বাড়ছে। ব্রিজের দুইপাশের রেলিং ভাঙা, ভারি যানবাহন চলাচলও বন্ধ। অটোরিকশা-ভ্যান এসব উঠলে ব্রিজ কাঁপতে থাকে। অবস্থা খুবই নাজুক।’

অভিযোগ আর আক্ষেপ থেকে দেশীয় গণমাধ্যম ঢাকা পোস্টের প্রতিবেদককে কথাগুলো বলছিলেন মুজাহিদুল ইসলাম। তিনি রংপুর সিটি করপোরেশনের (রসিক) ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের বৈরাগীপাড়া এলাকার বাসিন্দা। পেশায় একজন রন্ধনশিল্পী (বাবুর্চি)।

এই গ্রামের ভেতর দিয়ে বয়ে গেছে শ্যামাসুন্দরী খাল। পানি নিষ্কাশন, পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় এই খালটি এখন ‘রংপুরের ফুসফুস’ নামে পরিচিত। নগরীর সিও বাজার এলাকার ঘাঘটের উৎসমুখ থেকে শুরু হয়ে পুরো নগর চিরে প্রবাহিত হয়ে এটি খোখসা ঘাঘটের সঙ্গে মিলিত হয়েছে।

প্রায় ১৬ কিলোমিটার দীর্ঘ শ্যামাসুন্দরী খালের ওপর রয়েছে ছোট-বড় ৩৫টি সেতু ও কালভার্ট রয়েছে। এর মধ্যে বেশকিছু সেতু ও কালভার্ট চলাচলের অনুপযোগী ও ঝুঁকিপূর্ণ। বিশেষ করে ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের বৈরাগীপাড়া, ২৬ নম্বর ওয়ার্ডের নূরপুর মহাদেবপুর, তাঁতীপাড়া, ২১ নম্বর ওয়ার্ডের মুলাটোলসহ বেশ কয়েকটি পুরনো ও জরাজীর্ণ সেতু ও কালভার্ট ভেঙে পড়ে দুর্ঘটনার ঝুঁকি রয়েছে।

বৈরাগীপাড়ার স্থানীয় যুবক শাহাদাত হোসেন ও সোহাগ মিয়া ঢাকা পোস্টকে বলেন, ২৪ ও ২৬ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দারা বিশেষ করে বৈরাগীপাড়া ও নূরপুর এলাকার মানুষ প্রতিদিন ঝুঁকিপূর্ণ সেতুটি হয়ে চলাচল করে থাকেন। কয়েক বছর ধরে নড়াবড়া সেতুটির সংস্কারকাজ করা হবে বলে শুনে আসছি। কিন্তু আজ পর্যন্ত কাজ শুরু হয়নি। এখন সংস্কার না করে নতুন করে সেতুটি নির্মাণ করা প্রয়োজন বলে তারা মনে করছেন।

জানা গেছে, বৈরাগীপাড়া-নূরপুর এলাকার মানুষের চলাচলের এই সেতু হয়ে মহাদেবপুর, স্টেশন বাবুপাড়া, শাপলা চত্বর, লালবাগ, জাহাজ কোম্পানীসহ বিভিন্ন এলাকায় সহজেই যাতায়াত করা সম্ভব। প্রতিদিন ভারি যানবাহন না চললেও এই সেতু দিয়ে কয়েকশত অটোরিকশা, মোটরসাইকেল, পিকআপ ভ্যানসহ ছোট যানবাহন চলাচল করে থাকে। পুরোনো ও ঝুঁটিপূর্ণ এই সেতুটি ভেঙে একই স্থানে নতুন করে সেতু নির্মাণের দাবির কথা জানান স্থানীয়রা।

সরেজমিনে দেখা গেছে, সেতুর ওপর ও নিচে সিমেন্টের ঢালাই খসে ভেতরের লোহার রড বের হয়ে গেছে। মূল পিলারগুলোর অবস্থাও নড়বড়ে। ভেঙে পড়েছে দু’পাশের রেলিং। ছোট যানবাহন উঠলে কাঁপতে থাকে সেতুটি। শ্যামাসুন্দরী খালের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা সরু এই সেতুর নিচে গৃহস্থালি ও প্লাস্টিক বর্জ্য ফেলা হয়েছে।

একই চিত্র রংপুর সিটি করপোরেশনের ২১ নম্বর ওয়ার্ডের সেনপাড়া-মুলাটোল এলাকার সংযোগ সেতুটির। এ সেতুটিও দীর্ঘদিন সংস্কার করা হয়নি। সেতুর দু’পাশের রেলিংয়ের কিছু অংশ ভেঙে গেছে। নতুন ও স্থায়ী সেতু নির্মাণের দাবি স্থানীয়দের।

সেতুর কোল ঘেষে থাকা সেনপাড়া এলাকার বাসিন্দা মেজবাহুল হিমেল বলেন, এভাবে আর কয়েক বছর পার হলে সেতুটি আপনাআপনি ভেঙে পড়বে। এখনতো ভারি কোনো যানবাহন গেলে মনে হয় জরাজীর্ণ সেতুটি এই বুঝি ভেঙে পড়ে। শ্যামাসুন্দরী খালের মতো সেতুর অবস্থাও ভালো নেই।

নগরীর ২৬ নম্বরের তাঁতীপাড়া যেতে চোখে পড়ে আরেকটি সেতু। দুই বছর ধরে সেতুটির নির্মাণকাজ অসম্পূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। চলাচল উপযোগী হলেও সেতুর দুইপাশে এখনো রেলিং নির্মাণ করা হয়নি। দিনের বেলা দেখে শুনে যানবাহন ও পথচারীরা চলাচল করলেও রাতে আলো স্বল্পতা ও রেলিং না থাকার কারণে প্রায়ই ঘটে দুর্ঘটনা। আমরা সিটির বাসিন্দা কিন্তু ইউনিয়নের চেয়েও সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছি।  

সেখানকার স্থানীয় বাসিন্দা আসাদুল ইসলাম বলেন, ঠিকাদারের খোঁজ নেই। চব্বিশের আন্দোলনের পর থেকে সেতুর আর বাকি কাজ হয়নি। সিটি করপোরেশনের লোকজন জানে কিন্তু এখনো কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। এখন তো মেয়র-কাউন্সিলর কেউ নেই। সিটির প্রশাসক উদ্যোগ নিলে এতদিনে বাকি কাজও শেষ হতো।

রসিকের প্রকৌশল বিভাগ জানিয়েছে, ২০১২ সালের ২৮ জুনে প্রতিষ্ঠিত হয় রংপুর সিটি করপোরেশন। ২০৫ দশমিক ৭০ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের এই নগরীতে প্রায় দশ লাখ মানুষের বসবাস। এখানকার ৩৩টি ওয়ার্ডের নতুন ও পুরাতন মিলে রাস্তা প্রায় ১ হাজার ৬৫৪ দশমিক ১৪ কিলোমিটার। এর মধ্যে  পাকা রাস্তা এক হাজার ২২১ দশমিক ৯২ কিলোমিটার, আরসিসি ৮১ কিলোমিটার এবং কাঁচা রাস্তা রয়েছে ৩৫১ দশমিক ২২ কিলোমিটার। শ্যামাসুন্দরী, কেডি, চিকলী, নাছনিয়া, কুকরুল, ঘাঘট, খোখসাসহ বিভিন্ন খাল, বিল, জলাশয় ও নদ-নদী ঘিরে এই নগরীতে ১৮২টি সেতু ও এক হাজার ১৮৪টি কালভার্ট রয়েছে। আর ড্রেন রয়েছে ৪৪১ দশমিক ১৮ কিলোমিটার।

রংপুর সিটি করপোরেশনের (রসিক) তত্বাবধায়ক প্রকোশলী মো. আজম আলী ঢাকা পোস্টকে বলেন, নগরীর ঝুঁকিপূর্ণ সেতু ও কালভার্টগুলো সংস্কার এবং পুনর্নির্মাণ করার ব্যাপারে উদ্যোগ নেওয়া হবে। আমরা বিভিন্ন ওয়ার্ডে সরেজমিনে ঝুঁকিপূর্ণ ও চলাচল অনুপযোগী সেতু-কালভার্ট দেখেছি। বৈরাগীপাড়া, তাঁতীপাড়া, সেনপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকার ২২টি সেতু ও কালভার্ট নির্মাণে প্রকল্প প্রস্তাবনা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। এসব প্রকল্পের জন্য এখনো বরাদ্দ পাওয়া যায়নি। অর্থ বরাদ্দ হলে দ্রুত নির্মাণ ও সংস্কারকাজ শুরু করা সম্ভব হবে বলে তিনি জানান।