শিরোনাম
Passenger Voice | ১১:১৭ এএম, ২০২৬-০৭-০৭
গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কে পণ্য পরিবহনের উৎসমুখে ‘এক্সেল লোড নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র স্থাপন’ শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগ দেশের ৭টি বিভাগের ১৬টি জেলায় ২৫টি এক্সেল লোড কন্ট্রোল স্টেশন নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে। উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) অনুযায়ী ২০২২ সালের ৩০ জুনের মধ্যে এই প্রকল্প শেষ হওয়ার কথা ছিল। নকশা ও কারিগরি নানা পরিবর্তন এনে এই প্রকল্পের মেয়াদ তিনবার বাড়িয়ে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়। চতুর্থ দফায় মেয়াদ বাড়িয়ে প্রকল্প শেষ করার সময় নির্ধারণ করা হয় চলতি বছরের জুন পর্যন্ত। এই দফায় ২১ কোটি টাকা ব্যয় সংকোচন করা হয়। তবে আজ পর্যন্ত প্রকল্প শেষ হওয়া তো দূরের কথা, এখনো আর্থিক অগ্রগতি ৭২ শতাংশ বাকি আছে।
প্রকল্পের বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে অত্যাধুনিক ‘ওয়ে-ইন-মোশন’ স্কেল সংগ্রহ। দুবার দরপত্র আহ্বান করেও যন্ত্রগুলো সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি, এখন তৃতীয়বার দরপত্র আহ্বানের প্রস্তুতি চলছে। এ ছাড়া ভূমি অধিগ্রহণের ধীরগতি প্রকল্পের অন্যতম প্রধান ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
সম্প্রতি সরকারের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের প্রভাব মূল্যায়ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এই প্রকল্পের হালহকিকত।
পরামর্শক নিয়োগ ও ভূমি অধিগ্রহণে জটিলতা; প্রভাব পড়েছে ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রায়
সংশোধিত ডিপিপি (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব) অনুযায়ী ২০১৯-২০ থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত সাতটি অর্থবছরে প্রকল্পের অনুকূলে মোট ১ হাজার ৬০৯ কোটি টাকা ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল।
প্রথম বছরে প্রকল্প অনুমোদনে বিলম্ব এবং পরে কোভিড-১৯ পরিস্থিতির কারণে পরামর্শক নিয়োগ, ডিজাইন ও ভূমি অধিগ্রহণে জটিলতা দেখা দেয়, যার প্রভাব পড়ে ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রার ওপর। পরে ডিপিপি সংশোধনের সময় ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা পুনর্নির্ধারণ করা হয়।
বিশেষ করে ২০২২-২৩ ও ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আগের বছরের ঘাটতি মেটাতে বরাদ্দ ও অর্থ ছাড়ের পরিমাণ বাড়ানো হয়। তবে ভূমি অধিগ্রহণে প্রত্যাশিত অগ্রগতি না হওয়ায় ব্যয়ের হার অর্থ ছাড়ের তুলনায় যথাক্রমে ১৫ শতাংশ ও ৬ শতাংশ কম ছিল।
২০২৪-২৫ ও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রকল্পের ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা কমানো হলেও কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি অর্জিত হয়নি। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে অর্থছাড় হয় ৯৪ কোটি টাকা এবং ব্যয় হয়েছে মাত্র ১৮ কোটি টাকা।
২০২৬ সালের মে পর্যন্ত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) বরাদ্দ ও অর্থ ছাড়ের পরিমাণ যথাক্রমে ৭৩০ কোটি এবং ৬৩০ কোটি টাকায় সীমাবদ্ধ রয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মার্চ পর্যন্ত প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে মাত্র ৪৪৮ কোটি টাকা, যা সামগ্রিক লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ২৮ শতাংশ।
প্রকল্পের অঙ্গভিত্তিক ব্যয় পর্যালোচনায় দেখা যায়, রাজস্ব খাতে বরাদ্দ করা ৫৮ কোটি টাকার মধ্যে পরামর্শক সেবা খাতেই বরাদ্দ রয়েছে ৫৪ কোটি টাকা।
প্রকল্পের মূলধন খাতে ১ হাজার ৫৫০ কোটি টাকা সংস্থান থাকলেও ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে ৪১৯ কোটি টাকা।
প্রকল্পের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে বরাদ্দের সঙ্গে অর্থ ছাড়ের সামঞ্জস্য থাকলেও ব্যয়ের ক্ষেত্রে তা বজায় থাকেনি। প্রকল্পের বিভিন্ন অংশের ডিজাইন ও প্রাক্কলনে ত্রুটি থাকায় বারবার সংশোধনের প্রয়োজন হয়েছে। এ ছাড়া ভূমি অধিগ্রহণে দীর্ঘসূত্রতা প্রকল্পটির স্বাভাবিক গতি বাধাগ্রস্ত করেছে। অর্থ প্রাক্কলনে ত্রুটিপূর্ণ পরিকল্পনার কারণে সম্পদের অপচয় হয়েছে বলে আইএমইডির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রকল্পের অনুমোদিত ২৫টি স্টেশনের মধ্যে এখন পর্যন্ত মাত্র ১০টি স্টেশনের সিভিল ওয়ার্কের ৯০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। অথচ অবশিষ্ট ১৫টি স্টেশনের কাজ এখনো শুরুই করা সম্ভব হয়নি। প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি আমদানির দরপত্র পর্যন্ত এখনো আহ্বান করা হয়নি।
বরাদ্দ করা অর্থ ব্যয়েও সক্ষমতার ঘাটতি
প্রকল্পের সর্বশেষ অগ্রগতি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ভূমি অধিগ্রহণের জন্য বরাদ্দ ১৭৬ কোটি টাকার বিপরীতে ব্যয় হয়েছে ১৪৪ কোটি টাকা।
প্রকল্প কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অবশিষ্ট অর্থ দিয়ে অসমাপ্ত ভূমি অধিগ্রহণ শেষ করা সম্ভব নয়। এখন অর্থ ও সময়ের সীমাবদ্ধতার কারণে ৮টি কন্ট্রোল স্টেশন বাদ দেওয়ার প্রস্তাব এসেছে।
প্রকল্পের ইউটিলিটি স্থানান্তর কার্যক্রমের অবস্থাও নাজুক। এ খাতে ১৭ কোটি টাকা বরাদ্দের বিপরীতে খরচ হয়েছে মাত্র ৬ কোটি টাকা। অধিকাংশ ক্ষেত্রে জমি বুঝে না পাওয়ায় ইউটিলিটি স্থানান্তরের কার্যক্রম শুরুই করা সম্ভব হয়নি।
সড়ক ও মহাসড়ক নির্মাণের ক্ষেত্রে অগ্রগতি মাত্র ২৬ শতাংশ। মোট ৮০১ কোটি টাকা বরাদ্দের বিপরীতে এ পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে ২১৩ কোটি টাকা। প্রকল্পের আওতায় অ্যাপ্রোচ রোডের রিজিড ও ফ্লেক্সিবল পেভমেন্ট, রোড ব্যরিয়ার, মিডিয়ান নির্মাণ এবং আরসিসি ড্রেন নির্মাণের মতো কাজ রয়েছে, যা প্রকল্পের ২৫টি সাইটের জন্য প্রযোজ্য। তবে জমি বুঝে না পাওয়ায় ১৫টি সাইটে কাজ শুরু করা যায়নি; শুধু ১০টি সাইটে কাজ সম্পন্ন হয়েছে।
অনাবাসিক ভবন নির্মাণের চিত্রও প্রায় একই রকম। এ খাতে ২৫২ কোটি টাকা বরাদ্দের বিপরীতে ব্যয় হয়েছে ৫৫ কোটি টাকা। প্রকল্পের ২৫টি সাইটের জন্য নির্ধারিত দ্বিতল কন্ট্রোল স্টেশন ভবন, কন্ট্রোল রুম, শৌচাগার, ক্যাফেটেরিয়া, ওয়্যার হাউস এবং বাউন্ডারি ওয়াল নির্মাণের কাজও কেবল ১০টিতেই সীমিত রয়েছে। বাকি ১৫টি সাইটে ভূমি জটিলতায় কাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি।
এদিকে ‘প্রকৌশল এবং অন্যান্য সরঞ্জামাদি’ খাতে বরাদ্দ ২৭৫ কোটি টাকা থাকলেও এখন পর্যন্ত কোনো অগ্রগতি হয়নি। সরঞ্জাম সরবরাহের জন্য দুবার দরপত্র আহ্বান করা হলেও তা সফল হয়নি। প্রথমবার প্রয়োজনীয় যোগ্যতাসম্পন্ন কোনো দরদাতা পাওয়া যায়নি। দ্বিতীয়বার মূল্যায়ন শেষ হওয়ার পর মন্ত্রণালয় তা বাতিল করে দেয়। তৃতীয়বারের মতো দরপত্র আহ্বানের প্রস্তুতি চলছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতি এবং বারবার সময় বৃদ্ধির ঘটনায় প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দক্ষতার অভাব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে বলে পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে।
কেনাকাটাসংক্রান্ত একটি দরপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, ডিপিপিতে নির্ধারিত তারিখের ২ মাস ৩ দিন আগে দরপত্র আহ্বান করে প্রকল্প অফিস।
কেনাকাটায় দীর্ঘসূত্রতা
এই প্রকল্পের কেনাকাটায় সরকারি ক্রয় নীতিমালা (পিপিআর) মানা হলেও তা বাস্তবায়নে অনেক বেশি সময় ব্যয় হয়েছে বলে আইএমইডির পর্যালোচনায় উঠে এসেছে। প্রকল্পের একটি প্যাকেজে কেনাকাটাসংক্রান্ত দরপত্র আহ্বান করা হয় ২০১৯ সালে। ঠিকাদারের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় ২০২১ সালের জুলাইয়ে। শুধু কাজ শুরু করার আগ পর্যন্ত সময় লেগেছে ১ বছর ৮ মাস। প্রকল্পের জন্য ‘ওয়ে-ইন-মোশন’ এবং ‘অটোমেটিক ভেহিকেল আইডেন্টিফিকেশন’ যন্ত্র সংগ্রহের জন্য বারবার দরপত্র আহ্বান করায় প্রকল্পের কাজে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হয়েছে।
প্রকল্প সংশোধন
প্রকল্প কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের মতামতের ভিত্তিতে পুরোনো প্রযুক্তির ৩১টি স্ট্যাটিক ওয়ে স্কেল ব্রিজ স্থাপন ও কমিশনিংয়ের কাজ বাদ দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে বৈশ্বিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে ডলারের বিনিময় মূল্য বিবেচনায় ওয়ে-ইন-মোশন স্কেল স্থাপন ও কমিশনিং খাতে ২৭৫ কোটি টাকা বরাদ্দের সংস্থান রাখা হয়েছে।
প্রকল্পের সংশোধনীতে ২৮টি কন্ট্রোল স্টেশনের মধ্যে ৩টি স্টেশন বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। সাধারণত রাস্তার ওপরের স্তরে ইটের সলিং (এইচবিবি) ব্যবহার করা হয়। কিন্তু এই রাস্তায় প্রচুর ভারী ট্রাক চলাচল করবে, যা সাধারণ রাস্তার তুলনায় অনেক বেশি চাপ সৃষ্টি করবে। তাই রাস্তার স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে এবং ট্রাকের ভার সহ্য করার জন্য এইচবিবি পদ্ধতিটি বাদ দেওয়া হয়েছে। এর বদলে রিজিড পেভমেন্ট বা ঢালাই করা কংক্রিটের রাস্তা তৈরির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। স্টেশনে আসা ভঙ্গুর ও সংবেদনশীল মালামাল বহনে লরি বা উচ্চতাসম্পন্ন ট্রাকের সুবিধার্থে ওয়্যার হাউস বিল্ডিংয়ের উচ্চতা বাড়ানো হয়েছে, যাতে লোডিং ও আনলোডিংয়ের জন্য র্যাম্প ব্যবহার করা যায়।
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত 2019 - 2026 PassengerVoice | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Developed By Muktodhara Technology Limited.
পাবলিক মতামত