শিরোনাম
Passenger Voice | ০৩:৪৫ পিএম, ২০২৬-০৭-০৬
চরম আর্থিক সংকটে আমানত ফেরত দিতে পারছে না বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক। উৎস করের টাকা এনবিআরকে না দিয়ে খরচ করে ফেলেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ধার ফেরত দিতে পারছে না। দীর্ঘদিন বিধিবদ্ধ জমা রাখতে না পারায় গুনতে হচ্ছে জরিমানা। এমন চরম সংকটাপন্ন ব্যাংকে মাত্র আড়াই শতাংশ সুদে ১০০ কোটি টাকা রেখেছে গাজীপুর সিটি করপোরেশন।
অন্য একটি ব্যাংক থেকে এই টাকা তুলে সম্প্রতি কমার্স ব্যাংকে রাখা হয়। এই আমানতে চার কোটি টাকার ‘আপ্যায়ন ব্যয়’ দেখিয়েছে কমার্স ব্যাংক। মূলত এই অর্থ ঘুষ হিসেবে সিটি করপোরেশনের প্রভাবশালীদের দিতে হয়েছে।
দেশীয় গণমাধ্যম সমকালের অনুসন্ধানে জানা গেছে, ব্যাংকের ১৩ কর্মকর্তার অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে ঘুষের চার কোটি টাকা ব্যাংক থেকে বের করা হয়েছে। এটা মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে শাস্তিযোগ্য অপরাধ। গাজীপুর সিটি করপোরেশন থেকে কম সুদে ১০০ কোটি টাকা আনতে ‘আপ্যায়ন’ খরচ হিসেবে চার কোটি টাকা ব্যয়ের বিষয়টি কমার্স ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. ওবায়দুল হক নিজেই অভ্যন্তরীণ এক প্রতিবেদনে তুলে ধরেছেন। ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ তাতে অনুমোদন দিয়েছে। প্রতিবেদনে এভাবে আমানত আনাকে সাফল্য হিসেবে বর্ণনা করা হয়।
‘আপ্যায়ন’ খরচের চার কোটি টাকা ব্যাংক থেকে বের করতে অভিনব কৌশলের আশ্রয় নেয় কমার্স ব্যাংক। ব্যাংকের ১৩ কর্মকর্তা বিভিন্ন পরিমাণের আমানত এনেছেন দেখিয়ে তাদের অ্যাকাউন্টে প্রথমে ‘প্রণোদনা’ হিসেবে অর্থ জমা করা হয়। গত ৪ জুন অফিস সময় শেষে সন্ধ্যা ৭টায় তাদের অ্যাকাউন্টে অর্থ জমা দেওয়া হয়। ৭ জুন প্রিন্সিপাল শাখা থেকে প্রত্যেকের হিসাব থেকে নগদ টাকা তুলে নেওয়া হয়। কর্মকর্তাদের অ্যাকাউন্টে টাকা দেওয়ার আগে ব্যাংকের এমডির ব্যক্তিগত কর্মকর্তা হামিদুর রহমান তাদের প্রত্যেককে অবহিত করেন। তাদের কাছ থেকে আগাম চেক নিয়ে সই করিয়ে রাখা হয়। হামিদুর রহমানের অ্যাকাউন্টেও টাকা জমা ও উত্তোলনের রেকর্ড রয়েছে।
‘ইনসেনটিভ’ হিসেবে সর্বোচ্চ ৮০ লাখ টাকা করে দিয়ে আবার তুলে নেওয়া হয় হামিদুর রহমান এবং প্রধান কার্যালয়ের আদায় বিভাগের মোহাম্মদ ইউসুফ সিদ্দিক উল্লাহর অ্যাকাউন্টে। এ ক্ষেত্রে দেখানো হয়, তারা ২০ কোটি টাকা করে আমানত এনেছেন। প্রিন্সিপাল শাখার তাসনুভা মজুমদার, আহসান হাবিব ও আদনান আশ-শফিকের হিসাবে ৪০ লাখ টাকা করে এক কোটি ২০ লাখ দেওয়া হয়। আইসিসিডি বিভাগের মনিরুল হকের অ্যাকাউন্টে দেওয়া হয় ৩২ লাখ টাকা। মার্কেটিং বিভাগের সালেহ আহমেদ ও দিলকুশা শাখার অফিসার সাইফুর রহমানের হিসাবে ২০ লাখ টাকা করে ৪০ লাখ দেওয়া হয়। প্রধান কার্যালয়ের রিফাতুল মুরসালিনের হিসাবে দেওয়া হয় ১৬ লাখ টাকা। প্রধান কার্যালয়ের এফএডির সুজন দাশ, মো. শাহিনুর রহমান, মার্কেটিং বিভাগের মো. সরোয়ার ও প্রিন্সিপাল শাখার মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেনকে আট লাখ টাকা করে ৩২ লাখ টাকা দেওয়া হয়। এই চারজনের প্রত্যেকে দুই কোটি টাকা করে আমানত এনেছেন বলে দেখানো হয়।
সমকালের পক্ষ থেকে জানতে চাইলে হামিদুর রহমান এ বিষয়ে কমার্স ব্যাংকের এমডির সঙ্গে কথা বলার অনুরোধ জানান। যাদের অ্যাকাউন্টে টাকা ঢুকেছে– এমন তিনজনের সঙ্গে এ প্রতিবেদক কথা বলেছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তারা জানান, টাকা দেওয়ার আগেই তাদের কাছ থেকে চেক সই করিয়ে নেওয়া হয়। এভাবে অ্যাকাউন্টে টাকা নিতে তাদের বাধ্য করা হয়। বিএফআইইউ, দুদক বা এনবিআরের দিক থেকে কোনো সমস্যা হলে ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ দেখবে বলে আশ্বাস দেওয়া হয়। এ নিয়ে নিজেদের মধ্যে অস্বস্তি থাকলেও চাকরির ভয়ে কিছু বলেননি বলে জানান তারা।
কমার্স ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে ওবায়দুল হক গত ৯ এপ্রিল যোগদান করেন। এর আগে তিনি বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক থেকে অবসরে ছিলেন।চার কোটি টাকা ব্যয়ের বিষয়ে বক্তব্য চাইলে ওবায়দুল হক বলেন, ‘এ বিষয়ে টেলিফোনে কিছু বলা যাবে না। সামনাসামনি এলে বুঝিয়ে বলব।’
গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা (চলতি দায়িত্বে) মো. গোলাম কিবরিয়াকে টেলিফোন করলে তিনি বলেন, আয়-ব্যয় কর্মকর্তা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক এবং সিইও। এ বিষয়ে তারাই ভালো বলতে পারবেন।
আমানত রাখার সময় গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার দায়িত্বে থাকা মুহাম্মদ সোহেল হাসান (বর্তমানে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের যুগ্ম সচিব) সমকালকে বলেন, একটি ব্যাংকে অনেক টাকা রাখা ছিল। তারল্য সংকটের কারণে যেহেতু বিভিন্ন ব্যাংক আমানতকারীদের ঠিকমতো টাকা দিতে পারে না, এ কারণে টাকাটা ভাগ করে রাখা হয়।
আমানত আনতে কমার্স ব্যাংকের চার কোটি টাকার আপ্যায়ন খরচের বিষয়ে জানতে চাইলে সোহেল হাসান বলেন, ‘এটা ব্যাংকের হিসাব। এ বিষয়ে আমি কিছু বলতে পারব না।’ ভালো ব্যাংকে টাকা না রেখে চরম সংকটাপন্ন কমার্স ব্যাংকে রাখার কারণ জানতে চাইলে বলেন, ‘যুক্তি একটাই, ঝুঁকি কমাতে এক ব্যাংকে অনেক টাকা না রেখে আরেক ব্যাংকে রাখা হয়েছে। ঝুঁকিমুক্ত করার জন্যই এটা করা হয়েছে।’ অবশ্য তাঁর এই বক্তব্যের সত্যতা পাওয়া যায়নি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আর্থিকভাবে তুলনামূলক ভালো অবস্থানে থাকা সাউথ বাংলা ব্যাংকের গাজীপুর শাখা থেকে ১০০ কোটি টাকা নিয়ে কমার্স ব্যাংকে রাখা হয়। এই ব্যাংকেই গাজীপুর সিটির আরও অনেক টাকা রয়েছে।
সার্বিক বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান সমকালকে বলেন, ঘুষ দেওয়া বা নেওয়া দুটিই অপরাধ। সেখানে ব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবসা উন্নয়ন বা আপ্যায়নের নামে ঘুষ দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেলে অবশ্যই তদন্ত করা হবে। এর সঙ্গে যেই জড়িত থাকুক, ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ব্যাংকগুলোর আমানতের সুদহারের ওপর বাংলাদেশ ব্যাংকের জুনভিত্তিক প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে। সেখানে দেখা যাচ্ছে, এসএনডি হিসেবে ১০০ কোটি বা এর বেশি রাখলে সরকারি মালিকানার জনতা, বিডিবিএল ও বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে এখন ৬ শতাংশ সুদ দিচ্ছে। আর্থিক ভিত্তি ভালো থাকা বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলো ৫ থেকে ৭ শতাংশ সুদে স্পেশাল নোটিশ ডিপোজিট (এসএনডি) নিচ্ছে।
উল্লেখ্য, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের আগ পর্যন্ত অন্য ছয়টি ব্যাংকের সঙ্গে কমার্স ব্যাংকেরও নিয়ন্ত্রণ ছিল চট্টগ্রামের এস আলম গ্রুপের হাতে।
কমার্স ব্যাংকের সংকটের চিত্র
ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক পর্ষদের চেয়ারম্যান বরাবর দেওয়া অভ্যন্তরীণ এক প্রতিবেদনে সংকটের চিত্র তুলে ধরেছেন। এতে বলা হয়, আস্থাহীনতার কারণে আশঙ্কাজনকভাবে আমানত কমে যাওয়ায় এখন আর আমানতকারীর টাকা ফেরত দেওয়া যাচ্ছে না। আন্তঃব্যাংক সব ধরনের লেনদেন বন্ধ। সংকট এতটাই প্রকট যে আমানতের মুনাফার বিপরীতে গত দুই অর্থবছরে উৎসে কাটা কর ও ভ্যাটের ৫৭ কোটি ১৫ লাখ টাকাও সরকারকে পরিশোধ না করে নিজেরা খরচ করে ফেলেছে। কলমানি থেকে অর্থ সংগ্রহের চেষ্টা করলেও অন্য ব্যাংক দিতে রাজি হয়নি।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে নেওয়া ৯১৪ কোটি টাকা আর ফেরত দিতে পারছে না তারা। এ কারণে এরই মধ্যে তাদের ওপর দণ্ড সুদ আরোপ হয়েছে ১০০ কোটি ৩৪ লাখ টাকা। এর বাইরে দীর্ঘদিন ধরে ১৪৮ কোটি টাকার সিআরআর ঘাটতি এবং ৪২৭ কোটি টাকার এসএলআর ঘাটতির কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ৮১ কোটি টাকার দণ্ড সুদ আরোপ করেছে। ২০২৪ সালের আগস্ট-পরবর্তী বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে দুই দফা এক হাজার ৭৫০ কোটি টাকা চাইলেও দিয়েছিল মাত্র ২০০ কোটি টাকা। গত ৫ মে দুই হাজার ২৫০ কোটি টাকা চেয়েও ইতিবাচক সাড়া মেলেনি।
প্রতিবেদনে বলা হয়, দুর্বল কয়েকটি ব্যাংকে রাখা এক হাজার ৫৩৮ কোটি টাকা দীর্ঘদিন ধরে অনাদায়ী রয়েছে। এর মধ্যে সমস্যাগ্রস্ত সাত আর্থিক প্রতিষ্ঠানে আটকে আছে এক হাজার ১৬৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে আভিভা ফাইন্যান্সে ৪০৮ কোটি, পিপলস লিজিংয়ে ২৮৩ কোটি, ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ে ২৬৫ কোটি, বিআইএফসিতে ১৪৭ কোটি, ফার্স্ট ফাইন্যান্সে ১৬ কোটি এবং প্রিমিয়ার লিজিংয়ে ১২ কোটি টাকা আটকে আছে। আর ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকে ২১২ কোটি, ইউনিয়ন ব্যাংকে ১৬৮ কোটি, সোশ্যাল ইসলামী ৩৩ কোটি এবং আইসিবি ইসলামী ব্যাংকে ৪১৫ কোটি টাকা আটকে আছে।
এমডি তাঁর প্রতিবেদনে বলেছেন, তারল্য সংকট কাটাতে আমানত সংগ্রহ ক্যাম্পেইনের আওতায় গাজীপুর সিটি করপোরেশন থেকে মাত্র আড়াই শতাংশ সুদে ১০০ কোটি টাকার স্পেশাল নোটিশ ডিপোজিট আনা হয়েছে। আমানতটি এক বছরের জন্য শাখায় থাকবে। তবে আমানতটি বন্দোবস্ত করতে ব্যবসা উন্নয়ন ও আপ্যায়ন বাবদ অতিরিক্ত অর্থ খরচ করতে হয়েছে। ফলে ওই আমানতের জন্য খরচ দাঁড়াচ্ছে সাড়ে ৬ শতাংশ। এক বছর মেয়াদি আমানতে যেখানে এফডিআরের সুদের হার সাড়ে ১১ শতাংশ বলে এতে উল্লেখ করা হয়েছে।
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত 2019 - 2026 PassengerVoice | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Developed By Muktodhara Technology Limited.
পাবলিক মতামত