কর্ণফুলী টানেল নির্মাণে নিয়ম ভেঙে লুটপাটের মহোৎসব

Passenger Voice    |    ১১:১৪ এএম, ২০২৬-০৭-০৬


কর্ণফুলী টানেল নির্মাণে নিয়ম ভেঙে লুটপাটের মহোৎসব

কর্ণফুলী টানেল নির্মাণে সরকারি অর্থের নয়ছয় ও লুটপাটের চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে মহা-হিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক কার্যালয়ের (সিএজি) নিরীক্ষা প্রতিবেদনে। প্রকল্পের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সরকারি বিধিমালা লঙ্ঘন করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অবৈধভাবে হয়েছে নানা সমঝোতা। ভেরিয়েশন অর্ডারের নামে অতিরিক্ত অর্থ প্রদান, কাজের দাম বাড়িয়ে দেখানো এবং ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে এই প্রকল্প থেকে হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রকল্পের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের স্বেচ্ছাচারিতা ও দুর্নীতির ফলে কেবল সরকারি অর্থের অপচয়ই হয়নি, বরং রাষ্ট্রের রাজস্বের বড় একটি অংশ হাতছাড়া হয়েছে। ২০১৫-১৬ থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছর পর্যন্ত সব মিলিয়ে ১ হাজার ৯০১ কোটি টাকার দুর্নীতি হয়েছে বলে সিএজির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। 

২০২৩-২৪ অর্থবছরে ঠিকাদার লুটে নিয়েছেন কোটি কোটি টাকা
২০২৩-২৪ অর্থবছরে ঠিকাদার প্রকৃতপক্ষে যতটুকু কাজ করেছেন বা খরচ করেছেন তার চেয়ে বেশি টাকা তাকে দিয়ে দেওয়া হয়েছে। এতে সরকারের ১০ কোটি ২৯ লাখ টাকা গচ্চা গেছে। ঠিকাদারের গাফিলতির কারণে সময়মতো নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়নি। অথচ জরিমানা না করে ঠিকাদারকে ছাড় দেওয়া হয়েছে। এতে সরকারের ২৮৬ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। এটি একটি বড় ধরনের আর্থিক অনিয়ম। সরকারি কেনাকাটাসংক্রান্ত আইন অমান্য করে এবং কোনো প্রতিযোগিতা (টেন্ডার) ছাড়াই ২১ কোটি ২৫ লাখ টাকা খরচ করা হয়েছে, যা সম্পূর্ণ নিয়মবহির্ভূত।

কেনাকাটায় বিস্তর অনিয়ম, দেদার লুটপাট
সিএজির প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২২-২৩ অর্থবছরে প্রকল্পের রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়কে নির্মাণকাজের ব্যয় হিসেবে দেখানোর চেষ্টাও করা হয়েছে। এতে সরকারের ৪৮ কোটি টাকা অপচয় হয়েছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সম্পূর্ণ প্রকল্পের নকশা, নির্মাণ উপাদান সংগ্রহ এবং নির্মাণকাজ সম্পন্ন করে প্রকল্প কর্মকর্তাদের বুঝিয়ে দিতে ‘টার্ন কি’ চুক্তি স্বাক্ষর করে। এই চুক্তির আওতায় ভেরিয়েশনের মাধ্যমে ঠিকাদারকে অতিরিক্ত ৫৮ কোটি টাকা দেওয়া হয়। প্রকল্প তত্ত্বাবধানে পরামর্শক থাকা সত্ত্বেও আলাদা করে নির্মাণকাজের পরামর্শক নিয়োগে ব্যয় দেখানো হয়। এতে সরকারের ৭০ কোটি টাকারও বেশি অর্থের অপচয় হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যুরো অব স্ট্যাটিস্টিকস (বিবিএস) পণ্যের যে দাম নির্ধারণ করে রেখেছিল, সরকারি কেনাকাটায় তার চেয়ে বেশি দাম দেখানো হয়েছে। অর্থাৎ বিদেশি পণ্য কেনার সময় নিয়ম লঙ্ঘন করে উচ্চমূল্য দেখানো হয়েছে। এতে ৪২ কোটি টাকা অতিরিক্ত খরচ হয়েছে। অন্যায্য মূল্য সমন্বয়ের কারণে সরকারি অর্থের অপচয় হয়েছে ২২৪ কোটি টাকা। টানেলের জন্য প্রয়োজন না হওয়া সত্ত্বেও সার্ভিস এরিয়া নির্মাণের জন্য ৫০৩ কোটি টাকার অনিয়ম হয়েছে। প্রকল্পের সাইট অফিসে বাংলো মেরামতে অস্বাভাবিক উচ্চব্যয় দেখানো হয়েছে। এতে ১০ কোটি টাকা অর্থের অপচয় হয়েছে। ডিজেল জেনারেটর কিনতেও ৬ কোটি টাকা অপচয় করা হয়েছে।

একই কাজের জন্য টাকা একবার খরচ হওয়ার কথা থাকলেও বিভিন্ন খাতে ঘুরিয়ে সেটাকে অস্বাভাবিকভাবে বড় অঙ্কের খরচ হিসেবে দেখানো হয়েছে। এতে সরকারের ২৫০ কোটি টাকা অপচয় করা হয়েছে।

প্রকল্প শেষ হওয়ার পর ব্যবহৃত যানবাহনগুলো নিয়ম অনুযায়ী মূল প্রকল্পে ফেরত বা জমা দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সেগুলো ফেরত না দিয়ে ব্যক্তিগত বা অন্য কোনো কাজে ব্যবহার করা হয়েছে, যার ফলে সরকারের ১৪ কোটি টাকা মূল্যের অর্থের অপচয় হয়েছে। ঝোপঝাড় পরিষ্কার না করে এবং আনুষঙ্গিক বৃক্ষরোপণ কাজ সম্পন্ন না করায় সরকারের ৪৯ কোটি টাকা অপচয় হয়েছে। পরামর্শকদের থাকা-খাওয়া বাবদ ৮ কোটি টাকার অনিয়ম হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

সরকারি ক্রয় বিধিমালা অনুসরণ না করে প্রকল্পের কাজের পরিধি পরিবর্তন করা হয়েছে; যাকে ‘ভেরিয়েশন অর্ডার’ বলে। এতে সরকারের ৭৩ কোটি টাকা অতিরিক্ত খরচ করা হয়েছে। পরামর্শকের পাওনা থেকে আয়কর কম কর্তন করা হয়েছে। এতে সরকারের প্রায় ৯ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। সাব-কন্ট্রাক্টরকে বিল পরিশোধ করার সময় নির্ধারিত ভ্যাট কেটে রাখা হয়নি। এতে সরকারের ২ কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে।

অর্জিত ব্যাংক সুদ জমা হয়নি কোষাগারে
২০২১-২২ অর্থবছরে প্রকল্পের অর্জিত ব্যাংক সুদ সরকারি কোষাগারে জমা না দেওয়ায় সরকার ২ কোটি টাকার রাজস্ব হারায়। তখন সরকারি ক্রয় পদ্ধতির তোয়াক্কা না করে, কাজের সঠিক দাম যাচাই না করে ঠিকাদারদের সঙ্গে চুক্তি করে ফেলেন প্রকল্প কর্মকর্তারা। এতে ৬ কোটি টাকার অনিয়ম ধরা পড়েছে। উন্নয়ন প্রকল্পে দাতা সংস্থা থেকে সরাসরি ঠিকাদার বা সরবরাহকারীর ব্যাংক অ্যাকাউন্টে অর্থ পরিশোধ প্রক্রিয়ায় ১৪ কোটি টাকা নয়ছয় করা হয়েছে।

২০১৯-২০, ২০২০-২১ এই দুই অর্থবছরে প্রকল্প কর্মকর্তারা আইএফআইসি ও মিডল্যান্ড ব্যাংকে অনিয়মিতভাবে ফিক্সড ডিপোজিট রিসিট এফডিআর (FDR) কেনাকাটা করেন। এতে সরকারের ১৫ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়। ওই দুই অর্থবছরের আর্থিক বিবরণীতে উল্লিখিত আমদানি শুল্ক ও মূল্য সংযোজন করের সমাপনী স্থিতি এবং চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের স্থিতির মধ্যে বিস্তর তফাত পাওয়া যায়। এতে ৩৩ কোটি টাকারও বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে অডিট আপত্তি এসেছে। ভূমি অধিগ্রহণের জন্য চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনকে অগ্রিম অর্থ দেওয়া হলেও কর্মকর্তারা প্রকল্প কার্যালয়ে কাঙ্ক্ষিত জমি হস্তান্তর করেনি। এতে ১০৫ কোটি টাকার অনিয়ম হয়েছে।

২০১৯-২০, ২০২০-২১ অর্থবছরের চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না কমিউনিকেশন কনস্ট্রাকশন কমিউনিকেশনকে ট্যাগ বোট ক্রয়ের জন্য অতিরিক্ত ১ কোটি টাকা দেওয়া হয়। প্রকল্পের ক্রয় প্রস্তাবনায় না থাকলেও ম্যানেজমেন্ট সফটওয়্যার তৈরির জন্য এই প্রতিষ্ঠানকে ৪৯ লাখ টাকা বিল দেওয়া হয়।

শুরু থেকেই ঠিকাদারদের সঙ্গে যোগসাজশ
২০১৫-১৬ অর্থবছরে প্রকল্প কার্যালয় থেকে ঠিকাদারদের অগ্রিম বিল প্রদান করা হয়েছিল। কিন্তু সেই অর্থবছরে প্রকল্প ব্যয়ের চূড়ান্ত হিসেবে ২০১ কোটি টাকার অনিয়ম ধরা পড়েছে। একই অর্থবছরে সরকারি আদেশ অমান্য করে প্রকল্পের আনুষঙ্গিক ব্যয় বাবদ চট্টগ্রামের তৎকালীন জেলা প্রশাসককে ৪ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছিল। পরের ২০১৬-১৭ অর্থবছরেও একই অনিয়ম হয়েছে। সরকারের আদেশ অবজ্ঞা করে জেলা প্রশাসককে আরও ১ কোটি ৪২ লাখ টাকা দেওয়া হয়। তখন ভূমি অধিগ্রহণে নানা অনিয়মে ১৪৩ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষয়ক্ষতি হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে আরও বলা হয়, বিদেশি পরামর্শকের বিল থেকে আয়কর কম কাটা হয়েছে। এতে সরকার ১ কোটি ৮৬ লাখ টাকা রাজস্ব হারায়। পরামর্শক প্রতিষ্ঠান বিমা কাভারেজ দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছিল সে বছরই; কিন্তু তা করেনি প্রকল্প কর্তৃপক্ষ। 

কর্ণফুলী টানেলে দিনে ১০ লাখ টাকা লোকসান
ট্রাফিক পূর্বাভাসের সঙ্গে বাস্তবতার আকাশ-পাতাল পার্থক্যের কারণে বর্তমানে টানেলটি পরিচালনায় প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১০ লাখ টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে বলে জানিয়েছে বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি)। আইএমইডির প্রভাব মূল্যায়ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, প্রকল্পের অব্যবস্থাপনা এবং অদূরদর্শী পরিকল্পনার ফলে এটি এখন জাতীয় অর্থনীতির ওপর বড় ধরনের বোঝার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের সময় দাবি করা হয়েছিল, উদ্বোধনের পর প্রতিদিন ১৭ হাজার যানবাহন চলবে এবং ২০২৬ সাল নাগাদ এই সংখ্যা বেড়ে ২৮ হাজার ৩০৫টিতে দাঁড়াবে। অথচ বর্তমানে টানেল ব্যবহার করছে প্রাক্কলিত লক্ষ্যের মাত্র ১৪ শতাংশ, অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে মাত্র ৪ হাজার থেকে ৪ হাজার ৫০০টি যানবাহন।

এই ভরাডুবির ফলে ২০২৪-এর নভেম্বর থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত প্রাপ্ত উপাত্ত অনুযায়ী, প্রতিদিন প্রায় ১০ লাখ টাকা লোকসান হচ্ছে। বর্তমানে টোলের মাধ্যমে যে আয় হচ্ছে, তা টানেলটির মোট পরিচালন ব্যয়ের মাত্র ৫৪ থেকে ৫৫ শতাংশ মেটাতে সক্ষম।

আইএমইডির পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, কেবল টানেল নির্মাণ করলেই হয় না, এর সঙ্গে সংযোগকারী শিল্পাঞ্চল ও পরিকল্পিত নগরায়ণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন ছিল। দক্ষ জনবলের অভাব ও দুর্বল সংযোগ সড়কের কারণে টানেলটির সুফল পাওয়া যাচ্ছে না।